


বিশেষ নিবন্ধ, সমৃদ্ধ দত্ত: ইংরাজিতে একটি আপ্তবাক্য আছে: ফাইটিং দ্য লাস্ট ওয়ার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই বাক্যটি বহুল প্রচলিত ছিল। এই কথাটির তখনই ব্যবহার করা হয়, যখন কোনো একটি পক্ষ মনে করে শেষ একাধিক যুদ্ধে জয়ী হয়েছি, এখন যে যুদ্ধে যাচ্ছি, সেটাও বুঝি সেই একই ধাঁচের এবং ওরকমই সহজে জয়ী হব। সোজা কথায় অতি আত্মবিশ্বাস। যাকে পরিভাষায় বলা হয় উইনিং বায়াস। ক্ষমতার দম্ভে এবং একের পর এক জয়ের অহংকারে মনে থাকে না যে, প্রতিটি যুদ্ধ আসলে নতুন যুদ্ধ। আগের যুদ্ধের কৌশল এখানে নিতে গেলে বোকা হতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থা দেখে বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে জোরদার চর্চা চলছে যে, ট্রাম্প ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রমণ করার সময় এবং তারপরও ভেবেছিলেন এটা হল ফাইটিং দ্য লাস্ট ওয়ার। ইজি টার্গেট। বস্তুত আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণে ইরানের ৪৮ ঘণ্টাও টিকে থাকার কথা ছিল না। অথচ যুদ্ধের শুরুতেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে হারিয়ে মনোবলের দিক থেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইরান যে এরকম আশ্চর্য স্ট্র্যাটেজি নিয়ে যুদ্ধকে ১৫ দিন ধরে টেনে নিয়ে চলেছে এটা সবথেকে বেশি বিস্মিত করছে খোদ আমেরিকাকেই। আর তাই এখন মুখে আমেরিকা যতই গালভরা দাবি করুক, যুদ্ধ বিরতিতে সবথেকে উৎসুক এখন ওয়াশিংটনই। সেই আভাস প্রকট।
ট্রাম্প মুখরক্ষার ফরমুলা চাইছেন। যে কোনো সময় ‘আমরা জিতেছি এবং যুদ্ধ শেষ’ ঘোষণা করে দেবেন তিনি। ইরানের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। ইরান সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। সেনাবাহিনী বলে কিছু নেই। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ইরানও পালটা প্রভূত ক্ষতি করেছে। পশ্চিম এশিয়ার কোনো দেশ এক মাস আগে ভাবেনি যে তাদের তৈল শোধনাগার কিংবা এয়ারপোর্টে মিসাইল পড়তে পারে। তাও আবার ইরানের মাধ্যমে! সবকটা দেশ ক্ষতিগ্রস্ত এবং আতঙ্কিত! মনে মনে ইজরায়েল এবং আমেরিকাকেই তারা অভিশাপ দিচ্ছে!
আর তাই আমেরিকা এবং পশ্চিমি দেশগুলিতে এখন জল্পনা শুরু হয়েছে যে, এই যে দুই সপ্তাহেও আমেরিকা ইরান যুদ্ধ সমাপ্ত করতে পারল না, সেটাই তো একপ্রকার পরাজয়! আমেরিকার কাছে বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট অস্ত্র। ইরানের কাছে সেই তুলনায় কিছুই নেই। কিন্তু ইরান যে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে আমেরিকার বন্ধু দেশগুলিকে এভাবে নির্বিচারে মিসাাইল ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ব্যতিব্যস্ত করবে এবং বিশ্বজুড়ে তার জেরে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হবে, এতটা কল্পনাই করেননি ট্রাম্প। ইরানের সহজ কৌশল হল বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের জন্য অপরাধী যে আমেরিকাই, এই বার্তা প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া। আর সেটাই হচ্ছে। আর তাই ১৪ দিন যুদ্ধের পর ট্রাম্পের প্রধান পরামর্শদাতা এবং ইরান ও আমেরিকার প্রধান মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে একটা যুদ্ধবিরতি চুক্তি হতেই পারে। কিন্তু সবটাই নির্ভর করছে প্রেসিডেন্টের উপর।
তাই সবথেকে বড়ো বিস্ময় হল, ইরান এতদিন ধরে লড়াই করছে, পালটা প্রত্যাঘাত করছে, লাগাতার মিসাইল ড্রোন আক্রমণ চালাচ্ছে, এসব কীসের জোরে? এককভাবে ইসলামিক রিভলিউশনারি গার্ড বাহিনীর কি এই ক্ষমতা থাকতে পারে? ঠিক এই পরিস্থিতিতেই কূট একটি প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়েছে। সেটি হল, রাশিয়া ও চীন আড়ালে রয়েছে নাকি? প্রত্যক্ষভাবে তারা কেউ যুদ্ধে নেই। কিন্তু ইতিমধ্যেই সিআইএ জানতে পেরেছে, যেখানেই ইরানের মিসাইল আর ড্রোন আছড়ে পড়ছে, সেই লোকেশনের ইনটেলিজেন্স বার্তা ইরানকে দিয়েছে রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থা। এখনও ইরানের মিসাইল আর ড্রোন আসছে কোথা থেকে? গোপন ভাণ্ডারে এত অস্ত্র কে দিয়েছে? তাহলে কি আমেরিকা এবং ইজরায়েল মনে করছে আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছি, আসলে কি প্রক্সি ওয়ারে আছে আড়াল থেকে চীন ও রাশিয়াও?
কোনো সন্দেহ নেই আজ অথবা কাল আমেরিকা ইরানে যে তারা জয়ী হয়েছে, এই ঘোষণা করবে। কিন্তু বিশ্বের সামরিক বিশেষজ্ঞ মহল এবং আমেরিকার কংগ্রেস তথা সংসদ জানতে চাইছে ট্রাম্প ক্রমাগত কেন তাঁর লক্ষ্য বদলে ফেলেছেন? তিনি প্রথমে বলেছিলেন, ইরানের পরমাণু প্রোগ্রাম ধ্বংস করা হবে। তারপর বলা হল, এই শাসন ব্যবস্থা উপড়ে ফেলতেই তিনি আক্রমণ করেছেন। এখন আর শাসক বদলের কথা ট্রাম্পের মুখে শোনা যাচ্ছে না। ইরানকে তাহলে কোন অবস্থায় রেখে যাওয়াকে তিনি জয় মনে করবেন? ট্রাম্পের সবথেকে বড়ো সমস্যা হবে ইরানে বিরোধী দল, বিরোধী নেতা বলে কিছু নেই। তাহলে আলোচনা কার সঙ্গে হবে? নির্বাসিত শাহ রাজবংশের প্রতিনিধিকে আবার ফেরানো হবে? সেটা ইরান মানবে কেন?
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সবথেকে বড়ো যে অস্বস্তি, সেটি হল, আমেরিকাবাসীর সমর্থন নেই তাঁর কাছে এই যুদ্ধে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুধবার যে সমীক্ষা প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, ইরানকে আক্রমণ করা কি আপনি সমর্থন করেন? এই প্রশ্নে ৪১ শতাংশ আমেরিকান বলেছে, হ্যাঁ। বাকিরা বলেছে , না, আমাদের সমর্থন নেই। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে।
‘ফাইটিং দ্য লাস্ট ওয়ার’ সিনড্রোমে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছেন, আমেরিকা যেভাবে ভেনেজুয়েলা দখল করেছে, সেভাবেই অনায়াসে হাতে আসবে ইরানও। কিন্তু ইরান বিগত পাঁচ বছর ধরে আমেরিকার দফায় দফায় নানাবিধ হুমকি হুঁশিয়ারিতে নিজের গোপন শক্তি ও স্ট্র্যাটেজি দেখায়নি। আমেরিকার স্পাই এজেন্সির সেটা ব্যর্থতাও বটে। সিআইএ কিংবা মোসাদ এই তথ্য ঘুণাক্ষরে জানতে পারেনি যে, ইরানের অন্যতম কৌশল হবে পড়ে পড়ে মার খাওয়া নয়, তাবৎ আরব দুনিয়াকে অস্থির এবং আতঙ্কগ্রস্ত করে দেওয়া।
বিশ্বের কূটনৈতিক মহল মনে করছে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সবথেকে বড়ো ভুল হল, তাঁরা ভেবেছেন খামেনেই মানেই হল ইরান। আদতে সেটা নয়। খামেনেই ধর্মীয় সর্বোচ্চ নেতা। কিন্তু তার বাইরেও এক অন্য ইরান আছে। বরাবরই ছিল। খামেনেইয়ের বিরুদ্ধেও তো অন্তহীন বিক্ষোভ বিদ্রোহ ক্রোধ পুঞ্জীভূত ছিল ইরানবাসীর। কিন্তু তারা যখন দেখল খামেনেইকে হত্যার পরও ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার খেলায় নেমেছে আমেরিকা, তখনই ইরানের জাতীয়তাবাদী বিবেক জেগে উঠেছে। অর্থাৎ যে আতঙ্ক ইরানকে বহুকাল ধরে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে, সেটাই আবার গ্রাস করছে। অর্থাৎ আমেরিকার এই আক্রমণ ইরানকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দেবে, আর তার জেরে কুর্দিশ, বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইরানকে ভেঙে টুকরো করে দেবে। কারণ ইরানে ৬০ শতাংশ ইরানি, বাকি আজহেরি, কুর্দিশ, আরব, বালুচ, লুর। ১০০ বছরে অসংখ্যবার সরকার বদল হয়েছে। ইরান কিন্তু ভেঙে যায়নি। এবার ইরানবাসী আশঙ্কা করবে দেশ ভেঙে যাওয়ার। মনে রাখতে হবে, ফারসি ভাষা এবং শিয়া সম্প্রদায়ের অস্মিতা, এই দুই হল ইরানের একটি আইডেন্টিটি অস্মিতা। ট্রাম্প যদি ইরানের নারী শিশু বৃদ্ধদের টোমাহক মিসাইল ফেলে গণহত্যা না করতেন, বরং যুদ্ধের বদলে ইরানে খামেনেই বিরোধী গণবিদ্রোহের ইন্ধন দিতেন, ধর্মীয় শাসন থেকে বের করে এনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে মদত দিতেন, সেটা বরং আজ নয় কাল সাফল্য উপহার দিত। কারণ ইরানের চরিত্রে অনেক বেশি সেকুলার, উগ্র ধর্মবিহীন, উদার আধুনিক এক বহমানতা রয়েছে। সেই অংশটি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে তিতিবিরক্ত ছিল। তাই গণবিদ্রোহ স্বাভাবিক ছিল। যা অতীতেও হয়েছে একাধিক দেশে। কিন্তু ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অবিবেচক এবং স্ট্র্যাটেজিহীন ইগো আমেরিকাকে আর একটি ভিয়েতনাম ও ইরাকের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। কারণ এই দুই রাষ্ট্রনায়ক খামেনেইকে হত্যা করে শান্ত নয়। তাঁরা ইরানের আইডেন্টিটি ধ্বংস করতে উদ্যত।
ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, আমি ঠিক করব শাসক কে হবে। এটা ট্রাম্পের দ্বিতীয় ভুল। কারণ, ইরান ভেনেজুয়েলা নয়। আত্মসম্মানে প্রাণ দিয়েছে ইরান অসংখ্যবার। অতএব এখন ইরানবাসী অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। সেই সুযোগ নিচ্ছে ইসলামিক গার্ড বাহিনী। খামেনেইয়ের সঙ্গে ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার হানায় মৃত্যু হয়েছে খামেনেইয়ের ১৪ মাসের নাতনি জাহরার। সেই শিশুকন্যার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবলভাবে ভাইরাল করে সহানুভূতির প্রচার শুরু হয়েছে।
ইতিমধ্যে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিপুল আর্থিক এবং সামরিক ক্ষয় হয়েছে। ট্রাম্পের সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ হল, লক্ষ্যহীনতা। ঠিক কী হলে তিনি যুদ্ধ শেষ ঘোষণা করবেন সেটা নিজেই জানেন না। খামেনেইয়ের পুত্র নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতেবা খামেনেইকেও হত্যা করা? তারপর ইরান দখল? পছন্দমতো নেতা গদিতে বসানো? ইরানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম খুঁজে বের করা? ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ থেকে কী চাইছেন? আমেরিকা জানে না। বিশ্ব জানে না। তিনি নিজেও জানেন ন। আর তাই, এখন ট্রাম্প চাইছেন, যুদ্ধ শেষ হোক! কিন্তু ইরান সারেন্ডারের ইঙ্গিত না দিলে সেটা কীভাবে হবে?