


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও সংবাদদাতা, কান্দি: এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতিতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা চাকরি বিক্রির ব্যবসা খুলেছিল পাঁচ জেলায়। চাকরি বিক্রির ‘প্রস্তাব’ দেওয়া এবং সে বাবদ মোটা টাকা ‘সংগ্রহ’ করার জন্য মুর্শিদাবাদের বড়ঞার বিধায়ক নিয়োগ করেছিলেন কমপক্ষে ১৫ জন এজেন্ট। ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘করিৎকর্মা’ ওই এজেন্টরা আবার ‘কারবার’ আরও বাড়ানোর জন্য কাজে নিয়েছিল সাব-এজেন্টদের। সেই সংখ্যাও প্রায় ৫০। ওই সূত্রটি জানিয়েছে, জীবনকৃষ্ণ চাকরি বিক্রির দোকান খুলেছিলেন নিজের জেলা মুর্শিদাবাদের পাশাপাশি দুই দিনাজপুর, মালদহ এবং বীরভূমেও।
চাকরি বিক্রির এই কারবার যে বিধায়ক হওয়ার আগে থেকেই খুলেছিলেন তিনি, তাঁর স্ত্রী’র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হিসেবপত্র সামনে এনে দাবি করছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। তারা বলছে, ২০১৯ থেকে ২১ পর্যন্ত তাঁর স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে যে ৫০ লক্ষ টাকা ঢুকেছিল, তা চাকরি বিক্রির মাধ্যমে জোগাড় করা। বিধায়ক হওয়ার পর সম্পদ আর সম্পত্তির বহর আরও বেড়েছে বিধায়কের। ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ আর্থিক বছর পর্যন্ত বেনামে প্রচুর সম্পত্তি কেনা হয়েছিল। সেই সব সম্পত্তির হালহকিকত জানতে গিয়ে বিধায়ক ঘনিষ্ঠ ছ’জনের নাম পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এদের নামেই কেনা হয়েছে সম্পত্তিগুলি। কিন্তু এরা কেউই তেমন কিছু করেন না। এই পর্বে জীবনকৃষ্ণের বাবা বিশ্বনাথবাবুর বক্তব্য অন্যতম হাতিয়ার বলে ধরছে ইডি। ছেলে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই বিশ্বনাথবাবু বলছেন, এমএলএ হওয়ার পরই বিপুল সম্পত্তি করেছে সে।
এদিকে, জীবনকৃষ্ণ সাহার দ্বিতীয়বারের গ্রেপ্তারি পর্বে তাঁর গাড়ির চালক বছর ২৭’এর রাজেশ ঘোষ এখন ইডি’র স্ক্যানারে। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর বড়ঞার বিধায়কের আন্দি গ্রামের বাড়ির আর্থিক লেনদেন থেকে সবকিছুর ‘হর্তাকর্তা’ হয়ে উঠেছিলেন বিধায়কের গাড়ির এই চালক। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাজেশকে কলকাতার ইডি দপ্তরে হাজিরা দিতেও বলা হয়েছে। সোমবার ইডি আধিকারিকরা রাজেশের মহিষগ্রামের বাড়িতে পরপর দু’বার তল্লাশি চালিয়েছেন। বাজেয়াপ্ত করা হয় নথিপত্র ও মোবাইল ফোন। মঙ্গলবার সকাল থেকে বাড়িতেও খোঁজ মেলেনি রাজেশের। প্রতিবেশীরা জানান, বাড়িতে কেউ নেই। প্রসঙ্গত, রাজেশের বাবা বিশ্বনাথ ঘোষও একসময়ে জীবনকৃষ্ণ সাহার গাড়ি চালাতেন। ২০২২ সাল থেকে বড়ঞার বিধায়কের গাড়ি চালাচ্ছেন রাজেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে প্রথমবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঘনিষ্ঠবৃত্তের অধিকাংশই জীবনকৃষ্ণের পাশ থেকে সরে যায়। কিন্তু থেকে গিয়েছিলেন রাজেশ। তাই জামিনে বেরিয়ে আসার পর জীবনকৃষ্ণের সবচেয়ে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। কার্যত বিধায়কের আন্দির বাড়ির ‘নিয়ন্ত্রক’ হয়ে ওঠেন রাজেশ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ওই বাড়িতেই থাকতেন। কেউ বাড়িতে গিয়ে বিধায়কের সঙ্গে দেখা করত চাইলে, কারণ জানিয়ে প্রথমে রাজেশের অনুমতি নিতে হতো। এমনকী দেখা করার অনুমতি পেলেও, মোবাইল ফোন রাজেশের কাছে জমা রেখে যেতে হতো। ইডি জেনেছে, বিধায়কের আর্থিক লেনদেন সম্পর্কিত যাবতীয় কাজের দেখভাল করতেন রাজেশ। এহেন গাড়ির চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেই চাকরি বিক্রি কারবারের শিকড় পর্যন্ত যেতে চাইছেন তদন্তকারীরা।