


সৌরভ ভট্টাচার্য, তেহট্ট: তখন নিঝুম রাত। ঘড়ির কাঁটা ১১টা ৪০ মিনিটের ঘরে। পাঁচটি গাড়ির একটা কনভয় থামল করিমপুর থানার কিশোরপুরে। রাতের নিঃস্তব্ধতা খান খান করে নামলেন ২৮ জন খাঁকি উর্দিধারী। তাঁদের মধ্যে সাতজন পুলিশ আধিকারিক। বাকি ২১ জন সাধারণ পুলিশকর্মী।
কিশোরপুরের প্রধান রাস্তার পাশেই কাঞ্চন ভৌমিকের বাড়ি। কাঞ্চনবাবু তৃণমূল নেত্রী তথা নদীয়া জেলা পরিষদ সদস্যা টিনা সাহা ভৌমিকের বাবা। কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুললেন বাড়ির লোকজন। এত রাতে পুলিশ দেখে সকলেই তাজ্জব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তল্লাশি শুরু করে দেন তদন্তকারীরা। বাড়ি ঘিরে থাকেন কয়েকজন পুলিশকর্মী। রাত ১২টা ৩৫ মিনিট নাগাদ একটি লাল স্করপিও এসে থামে বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নামেন রাজ্য-রাজনীতিতে এই মুহূর্তে তোলপাড় ফেলে দেওয়া স্বর্ণ-বিতর্কের ‘নায়ক’ সব্যসাচী দত্ত। টিনার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বলে রাজনৈতিক মহলে সমধিক চর্চিত। তোলাবাজি সহ নানা কুর্কীর্তির অভিযোগে ধৃত সব্যসাচী এখন পুলিশ হেপাজতে। তদন্তে নেমে তাঁর বাড়িতে মিলেছিল স্বর্ণভাণ্ডারের হদিশ ও প্রচুর পরিমাণ সোনা কেনার কাগজপত্র। সেই সূত্রে টিনার বাপের বাড়িতে হানা বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের। সঙ্গী করিমপুর থানাও। সব্যসাচীকে নিয়ে চলে জোরদার তল্লাশি। বাজেয়াপ্ত করা হয় বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না।
এখানেই শেষ নয়। কাঞ্চনবাবুর বাড়িতে প্রায় আড়াই ঘণ্টার অপারেশন শেষে পুলিশের কনভয় রওনা দেয় তেহট্ট থানার নাজিরপুর। সঙ্গে সব্যসাচীও। এখানে টিনার শ্বশুরবাড়ি। ভোর পাঁচটা পর্যন্ত তল্লাশি চলে। পুলিশের দাবি, সব্যসাচী ঘনিষ্ঠ জেলা পরিষদ সদস্যার বাপের বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ি থেকে প্রায় তিন কেজি সোনার হদিশ মিলেছে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ নথিও সোনার গয়নার কোনো বৈধ কাগজ তাঁরা দেখাতে পারেননি বলেই সেগুলি বাজেয়াপ্ত করেছেন তদন্তকারীরা।
টিনার বাবা কাঞ্চন ভৌমিকের নাজিরপুর বাজারে একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। সাদামাটা মধ্যবিত্ত পরিবার। তাঁর বাড়ি থেকে এত বিপুল পরিমাণ সোনা বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনায় হতবাক স্থানীয়রা। কাঞ্চনবাবু বলছিলেন, ‘এগুলি আমাদের পরিবারের ব্যবহারিক গয়না। এর মধ্যে মেয়ের কিছু গয়না থাকলেও থাকতে পারে। সেটা ওর মা ভালো বলতে পারবে।’ স্থানীয় বিজেপি নেতা সৌমেন সরকার বলেন, ‘সব্যসাচীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এই তৃণমূল নেত্রী। শুধুমাত্র সোনা নয়, নাজিরপুর এলাকাজুড়ে ওঁদের বিপুল সম্পত্তি। কলকাতায় চারটি ফ্ল্যাট রয়েছে। সবকিছু তদন্তের আওতায় এনে খতিয়ে দেখা হোক।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তেহট্ট বা করিমপুর থানা এলাকায় বেশ কয়েকবার টিনা আমন্ত্রণে সব্যসাচী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সেই তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে জল্পনার বুঁদবুঁদ উঠতে শুরু করে। স্বর্ণ ভাণ্ডারের হদিশ মিলতেই সেই জল্পনা বাস্তবের চর্চায় গতি পেয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সব্যসাচীর সান্নিধ্য লাভের দৌলতে তৃণমূল নেত্রী টিনার বৈভব বাড়তে থাকে রকেট গতিতে। জানা গিয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে টিনার উত্থান। এলাকার মানুষের অভিযোগ, আগে পরিবারটি মধ্যবিত্ত ছিল। রাজনীতির হাত ধরে ওঁরা এখন বিলাসবহুল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত।
পুলিশ সুত্রে জানা গিয়েছে, সব্যসাচী সংক্রান্ত একটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হয় টিনাকে। এর মধ্যেই পুলিশি অভিযানে এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণভাণ্ডারের হদিশ মিলল তাঁর শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ি থেকে। মঙ্গলবার সকালে কিশোরপুর ও নাজিরপুরে গিয়ে দেখা যায় কৌতূহলী মানুষের ভিড়। দু’টি বাড়ি যেন রাতারাতি দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে এলাকার বাসিন্দাদের কাছে। সবার চর্চায় উঠে আসছে তৃণমূল জমানার লাগামহীন দুর্নীতির প্রসঙ্গ।