


বিশেষ নিবন্ধ, প্রীতম দাশগুপ্ত: ‘মেরা নাম মহম্মদ দীপক’। বিদ্বেষ আর ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে এভাবেই দীপ জ্বালিয়েছেন উত্তরাখণ্ডের জিম ব্যবসায়ী দীপক কুমার। কবির ভাষায়, যাঁহা রহেগা, ওহি রোশনি লুটায়েগা/ কিসি চিরাগ কা আপনা মকান নেহি হোতা। কী হয়েছিল উত্তরাখণ্ডে? গত ২৬ জানুয়ারি। দেশজুড়ে যখন সাধারণতন্ত্র দিবস পালন হচ্ছে, তখন কোটদ্বারে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলের বাহিনী। ‘বাবা স্কুল গার্মেন্টস’ নামে একটি পোশাকের দোকানের নাম নিয়েই যত আপত্তি ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের। দোকানের মালিক ভাকিল আহমেদ। তিনি ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাই গৈরিক বাহিনীর যুক্তি ছিল, ‘বাবা’ শব্দটি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। আসলে এখানকার বিখ্যাত সিদ্ধাবলী বাবা হনুমান মন্দিরের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী ওই বাহিনী। একজন মুসলিম দোকানদার বাবা নাম ব্যবহার করবে, এটা মেনে নিতে পারছিল না হিন্দুত্বের ঠেকা নেওয়া বাহিনী।
পেশায় আইনজীবী ভাকিল আহমেদ খুব শান্তভাবেই তাঁদের জানান, তাঁর দোকান প্রায় ৩০ বছর ধরে চলছে। তাছাড়া এর আগে কেউ এই নাম নিয়ে আপত্তিও তোলেনি। তিনি উন্মত্ত বাহিনীকে বোঝানোর চেষ্টাও করেন ‘বাবা’ শব্দটি সব ধর্মেই চলে। এটি শুধু হিন্দুধর্মেই ব্যবহার হয় এমনটা নয়। দেখিয়েও দিলেন, ওই দেখুন, এই নামে আরও কয়েকটা দোকান আছে। ওই বাহিনীকে এসব শেখানো যে যাবে না, তা ওই ৭০ বছরের বৃদ্ধ কীভাবে বুঝবেন। দেখেছি, কিন্তু ওগুলি হিন্দুদের দোকান। সাফ কথা গেরুয়া বাহিনীর। সোজা বার্তা, হিন্দুদের দোকানে ‘বাবা’ চলবে। মুসলিম দোকানে নয়। রীতিমতো শাসানি চলতে থাকে। এই সময়ে অনেকটা রুপোলি পর্দার কাহিনির মতো আসরে প্রবেশ সুঠাম চেহারার এক যুবকের। প্রথমে বোঝানোর চেষ্টা করলেন গেরুয়া বাহিনীকে। বলার চেষ্টা করলেন, একটা দোকানেরই তো নাম, তাতে হয়েছেটা কী? এই সময়ই উন্মত্ত বাহিনী ছুড়ে দিল, সেই অমোঘ প্রশ্ন—‘পহেলে বাতা তেরা নাম কেয়া হ্যায়?’ ওই যুবকের নিজের ভাষায়, যখন এসব হচ্ছিল, আমি কাছেই আমার বন্ধুর দোকানে ছিলাম। আমার জিমও সেখানেই। ভিড় দেখে আমি সেখানে যাই। আমি প্রবীণ দোকানদারের পক্ষ নিই। ভিড় যখন আমার নাম জিজ্ঞেস করে, আমি বলি আমার নাম মহম্মদ দীপক। সংহতি দেখানোর জন্যই এই নাম বলেছিলাম। এই ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়।
এই সময় যদি উত্তর আসত আনোয়ার আলি। তাহলে নির্ঘাত ওই যুবককেও মারধর শুরু হত। কিংবা হেনস্তা। তারপর হয়তো উড়ে আসত সেইসব শব্দ—‘যা পাকিস্তানে গিয়ে থাক’। আবার উত্তরটা যদি রাকেশ উপাধ্যায় হত, তাহলে চোখ কপালে উঠত ওই বাহিনীর। সমস্বরে বলে উঠত, আপ ব্রাহ্মণ হোকে ইয়ে বলতা? ওহ মুসলিম, আপ হিন্দু হ্যায়। ইয়ে তো সমঝো। অর্থাৎ রাকেশকে ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা চলত, আপনি ভুল করছেন। ওদের সঙ্গ দেওয়াটা আপনার অন্যায়। এখানেই দীপকের সেই অসাধারণ উত্তর। যা সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হতে সময় লাগেনি। দীপক ঠান্ডা গলায় বলেন, তাঁর নাম মহাম্মদ দীপক। এহেন উত্তর আশাই করেনি ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। চমকে উঠে আবার জিজ্ঞেস করে, ক্যায়া আপকা নাম মহম্মদ দীপক হ্যায়? বোঝাই যায়, বেশ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল তারা। একে তো হিন্দু বা মুসলিম কোনো ক্যাটিগরিতেই ফেলা যাচ্ছে না।
এই একটা উত্তরই যেন ভারতীয় গণতন্ত্র ও সংবিধানের মূল ভিতটাকেই তুলে ধরল। যে সংবিধান আমাদের শিখিয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কারো সঙ্গে বিভেদ করতে পারবে না। স্রেফ মুসলিম বলে কোনো দোকানিকে তার দোকানের নাম বদলাতে হবে না। হিন্দু-মুসলিম-শিখ-ইসাই ভাই ভাই। সেই স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণাতেই তো বড়ো হয়েছি আমরা। জাফর-নাজিরদের সঙ্গে কোনো কিছু শেয়ার করতে কিংবা তাদের বাড়িতে খেতে যেতে তো আমাদের কোনোদিনও অসুবিধা হয়নি। এভাবেই তো বড়ো হয়েছি আমরা। কিন্তু নতুন প্রজন্মকে সেই ধারণাই পালটে দেওয়ার একটা চেষ্টা সুকৌশলে করছে গেরুয়া শিবির। ভাবখানা এমন তুমি মুসলিম, তাহলে চলে যাও পাকিস্তান। দেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে মুসলিমদেরও যে অবদান আছে, সেটাই ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আর কারা সেই কাজটা করছে, যাঁরা নিজেরাই স্বাধীনতার আন্দোলনে তেমন কোনো ভূমিকা নেয়নি।
এরপর ৩১ জানুয়ারি বজরং দল ও হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা দীপকের জিমের বাইরে বিক্ষোভ দেখায়। বিক্ষোভ চলাকালীন সাম্প্রদায়িক স্লোগানও দেওয়া হয়। ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে, প্রথমে পুলিশ দীপককে বোঝাচ্ছে। পরে ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন যুবক দীপকের জিমের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। এই ঘটনায় পুলিশ মোট তিনটি এফআইআর দায়ের করেছে। প্রথম এফআইআর ভাকিল আহমেদের অভিযোগের ভিত্তিতে। এতে বজরং দলের গৌরব কাশ্যপ, শক্তি সিংহ সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দোকানে ঢুকে হুমকি ও গালিগালাজের অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় এফআইআর দায়ের হয়েছে স্বয়ং দীপক কুমারের বিরুদ্ধে। বজরং দলের কর্মী কমল পাল ও গৌরব কাশ্যপের অভিযোগ, দীপক ও তাঁর বন্ধু বিজয় রাওয়াত তাদের কর্মীদের মারধর করেছে। শুধু তাই নয়, ঘড়ি ও টাকা ছিনতাই করেছে। এমনকি জাতিগত কটূক্তির অভিযোগও আনা হয়েছে। আর তৃতীয় এফআইআর পুলিশ নিজে করেছে। প্রায় ৩০-৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাস্তা অবরোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে।
আসলে ভাকিল আহমেদের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। ২০২৪ সালেই উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে এমন উদ্যোগ নিয়েছিল দুই রাজ্যের বিজেপি সরকার। বলা হয়েছিল, দোকানের সাইনবোর্ডে নিজেদের নাম জানাতে হবে। যাতে কে হিন্দু, কে মুসলিম সেটা বোঝা যায়। সুপ্রিম কোর্ট ওই নির্দেশে হস্তক্ষেপ করায়, সেযাত্রায় বিষয়টি কার্যকর করতে পারেনি গেরুয়া প্রশাসন। কিন্তু তাদের সংগঠনকে নামিয়ে দিয়ে সেটাকেই বেসরকারিভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল তাদের কর্মসূচির নাম রেখেছে, ‘জিসকা কাম, উসি কা নাম’। বজরং দলের দেরাদুনের জেলা সমন্বয়ক আমন স্বেদিয়া বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেছেন, গত ছ’মাস ধরে বজরং দল উত্তরাখণ্ড জুড়ে ‘জিসকা কাম, উসি কা নাম’ অভিযান চালাচ্ছে। কী এই অভিযান? আমন বলেছেন, ‘আপনি ব্যবসা করুন, আমাদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু নিজের পরিচয় লুকাবেন না। আপনি মুসলিম হয়ে হিন্দু নামে বা বাবা সিদ্ধাবলীর নামে দোকান কেন চালাচ্ছেন? এটা হিন্দু পরিচয়ের অপব্যবহার। নিজের নামে দোকান চালান, যে আসতে চাইবে সে আসবেই।’ গত বছরের ডিসেম্বরেও দেরাদুনে ‘লাকি হেয়ার সেলুন’ নামে একটি দোকানে ভাঙচুর ও পোস্টার ছেঁড়ার ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছিল। একটি স্কুলে প্রার্থনা ঘিরে বিক্ষোভের ভিডিয়োও সামনে এসেছিল। আর এই সবগুলির পিছনেই ছিল হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী দল। আমনের দাবি, ‘এই সব ভিডিয়ো ‘জিসকা কাম, উসি কা নাম’ অভিযানের সঙ্গেই যুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই যে নিজের ইচ্ছামতো তারা এসব করছে, সেখানে পুলিশ-প্রশাসনের কি কোনো ভূমিকা থাকবে না? আইন কী হবে সেটা কি বজরং দল ঠিক করে দেবে? আমন কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ মানতে নারাজ। তিনি বেশ বুক ফুলিয়েই বলেছেন, দেখুন বোর্ড খোলা বা পরিচয় প্রকাশের সময় সবসময়ই পুলিশ উপস্থিত থাকে। সবকিছু পুলিশের উপস্থিতিতেই হয়। অর্থাৎ, আমরা পুলিশের সামনেই এই সব করছি। তার মানে, পুলিশ ঘুরিয়ে বজরং বাহিনীকেই সমর্থন করছে। এটা কখন সম্ভব হয়? যদি প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকেই নির্দেশ আসে। এটাই এখন গেরুয়া রাজ্যের বিধি। দীপক কাশ্যপ ওরফে মহম্মদ দীপক ও তাঁর বন্ধু বিজয় রাওয়াতকে তাই বলতে শোনা গিয়েছে, উত্তরাখণ্ড সরকার বজরং দলের লোকদের রক্ষা করছে।
এই ঘটনার পর থেকেই দীপককে নানাবিধ হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দীপকের জিমের ভাড়া মাসে ৪০ হাজার টাকা। আগে সেখানে অন্তত ১৫০ জন জিম করতে আসতেন। এখন মেরেকেটে ১৫ জন। সংবিধানের মূল মন্ত্রকে রক্ষা করতে গিয়ে পেটেই টান পড়ছে। দীপকের একটা ছোটো বাচ্চা আছে। তার স্কুল বন্ধ। মা কোনোমতে একটা চায়ের দোকান চালাচ্ছেন। সেটাই এখন রুটি-রুজির ভরসা। দীপকের পাশে দাঁড়িয়েছেন, রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে বহু সাংসদ-রাজনীতিবিদ। বহু মানুষও তাঁকে সমর্থন করছেন। কিন্তু একটা ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে দিয়েছে বজরং দল। তাঁদের সাফ দাবি, ক্ষমা চাইতে হবে দীপককে। দীপক বলেছেন, এই সময়ে আমি খুব অস্বস্তিতে আছি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভয় তো ঈশ্বরকেই করা উচিত। কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা পরিবারকে কষ্ট দিচ্ছে।’ তবে এত মানুষের সমর্থনে অভিভূত এই আলোর পথযাত্রী বলছেন, ‘বেশিরভাগ মানুষই আমার পক্ষে। আমি কোনো ভুল করিনি। তাই মানুষ সমর্থন দিচ্ছে। বাজার ও জিমের লোকেরাও আমার পাশে আছে। ‘ইয়ে এক চিরাগ, কহি আঁধিয়ো সে ভারী হ্যায়।
এটা বুঝতে হবে, ঘৃণা ছড়িয়ে কিছুই অর্জন করা যায় না। ভারতের প্রত্যেক নাগরিকের নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী উপাসনা করা, বাঁচা ও ধর্ম পালন করার অধিকার রয়েছে। আর এটা দিয়েছে, আমাদের সংবিধানই। দীপক আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, আমার নাম কী, তা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, আমরা যে কাজটি করছি, সেটা সঠিক না ভুল, একমাত্র সেটা দেখা। আমরা সংবিধান মেনে চলছি কি না, সেটা দেখা। আমরা মানবিক হব নাকি নিষ্ঠুর হব সেটা দেখা। হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগের কাছে মানুষের প্রধান পরিচয় ছিল ধর্ম। কিন্তু আমাদের ভারত তো সেই ১৯৫০ সালেই ওই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। তখনও তো দীপকের মতোই যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, ধর্মীয় পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-গান-সাহিত্যে এই মিলনের ঝুড়ি ঝুড়ি উদাহরণ আছে। কিন্তু সময় বদলছে, আজকের ভারতে ফের মাথাচাড়া দিয়েছে ধর্মান্ধতা। আজকের ভারতের মূল দ্বন্দ্ব দুই শ্রেণির মধ্যে। একদল যারা ‘দুসরা বাটোয়ারা’ চায়, আর একদল যারা ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে চায়। মহম্মদ দীপকের কাহিনি দ্বিতীয় দলের। ঝড়ের মুখে দীপ জ্বালিয়ে রাখার। এবার আমাদের পালা। আমাদের বেছে নিতে হবে, কোন পথটা ঠিক, আর কোনটা ভুল।