


নিজস্ব প্রতিনিধি, ময়নাগুড়ি: রোজ সকালের মতো টিপুদা’র চায়ের দোকানে ভিড় জমেছে। ময়নাগুড়ি শহরে পা রেখে জিজ্ঞেস করলে যে কেউ বলে দেবেন নতুন বাজারে এই দোকানের ঠিকানা। টিপুর হাতে তৈরি দুধ চায়ে চুমক দিয়ে সবার সামনে কথাটা পাড়লেন দক্ষিণ খাগড়াবাড়ির হঠাৎ কলোনির সুরেন রায়। ‘শুনছি নাকি কৌশিক রায় আবার ভোটে দাঁড়িয়েছেন?’
কেন আপনি খুশি নন? প্রশ্ন শুনে পেশায় গাড়ির খালাসি সুরেনের মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। বললেন, পাঁচ বছর বিধায়ক থাকার পরও যাঁকে এলাকার কেউ চেনেন না, তিনি যদি আবার ভোটপ্রার্থী হন, তাহলে কি খুশি হওয়া যায়?
সুরেন কি সত্যি বলছেন? বিদায়ী বিধায়ককে চেনেন না ময়নাগুড়ি শহরের মানুষ? আলতো করে প্রশ্নটা টিপুর চায়ের ঠেকে ছুড়ে দিতেই সুভাষনগরের বাসিন্দা সুধাংশু ঘোষ বললেন, সবাই চেনেন কি না জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, একুশের ভোটে জেতার পর ময়নাগুড়িতে বিজেপি পার্টি অফিসের সামনে বিধায়ককে আমি একদিনই দেখেছিলাম। ওটাই প্রথম, ওটাই শেষ।
শহর ছেড়ে একটু ময়নাগুড়ির গ্রামীণ এলাকায় যাওয়া যাক। রামসাইয়ের কাছে খেমনহাট এলাকায় রাস্তার মোড়ে পুরি-সবজির দোকান বিষ্ণু রায়ের। আপনার এলাকার বিধায়ককে চেনেন? মুখের দিকে কিছুক্ষণ নিরাশ হয়ে চেয়ে থেকে সংক্ষিপ্ত উত্তর, পাঁচ বছর আগে ভোট চাইতে একবার এসেছিলেন। চেনা বলতে ওটুকুই।
দোমোহনি মোড়ে চায়ের দোকানে ভিড় জমিয়েছে এলাকার মানুষ। সেখানেই দেখা বার্নিশের দক্ষিণ মরিচবাড়ির বাসিন্দা কৃষক সুনীল সরকারের সঙ্গে। বললেন, গতবার পুজোর সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিস্তার গাইড বাঁধ ভাঙল। নদীর জল ঢুকে নষ্ট হয়ে গেল আমার লঙ্কাখেত। জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। এলাকার বিধায়ককে তো খুঁজে পাওয়া যায় না!
পাঁচ বছর বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও ময়নাগুড়ির বেশিরভাগ মানুষ যে তাঁকে চেনেন না, জানেন না। শুধু তাই নয়, এলাকার উন্নয়নে তিনি কোনো কাজ করেননি, এমনটাই দাবি বাসিন্দাদের। আর পাঁচজন বিধায়ক পাঁচবছরে উন্নয়নের কাজ করার জন্য যা অর্থ পেয়েছেন, একই পরিমাণ বরাদ্দ পেয়েছেন কৌশিক। কিন্তু তা দিয়ে কী করলেন?
পদ্ম পার্টির বিদায়ী বিধায়কের স্বীকারোক্তি, পাঁচটি স্কুলের বাউন্ডারি ওয়াল করেছি। দশটি স্কুলে বেঞ্চ দিয়েছি। কয়েকটা সৌরবাতি। আর এক কিমি রাস্তা।
আর কিছু নয়? কৌশিকের সাফাই, কাজ করতে গেলে তো পঞ্চায়েত ও পুরসভার নো অবজেকশন সার্টিফিকেট লাগবে। পুরসভা যদি এনওসি দিত, তাহলে নিশ্চয়ই ময়নাগুড়ি শহরে বিধায়ক তহবিলের টাকায় কাজ করতাম। রামসাই পঞ্চায়েত এলাকায় আমাদের উপপ্রধান রয়েছেন। সেকারণে সেখানে এনওসি মেলায় রাস্তা করেছি।
উন্নয়নে দাগ কাটতে না পারলেও ময়নাগুড়ির বিজেপি বিধায়ককে গত পাঁচ বছরে ঘিরে থেকেছে বিতর্ক। কখনও দেহরক্ষীদের নিয়ে মঞ্চে উঠে উদ্দাম নাচের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। কখনও আবার বিধায়ক ‘নিখোঁজ’ বলে পোস্টার পড়েছে ময়নাগুড়ি শহরে। পাঁচ বছরে পাঁচটা স্কুলের বাউন্ডারি ওয়াল আর দশটা স্কুলে বেঞ্চ দেওয়ার পারফরম্যান্স নিয়ে ফের ভোটের ময়দানে কৌশিক রায়। আর এতেই বিজেপির অন্দরে চরমে ক্ষোভ। ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান তৃণমূলের মনোজ রায়ের দাবি, পাঁচবছরে বিজেপি বিধায়ক সাকুল্যে দু’টো স্কুলে বাউন্ডারি ওয়াল করেছে বলে জানি। এর মধ্যে একটি শহরে। কিন্তু রাজ্য সরকার ময়নাগুড়িতে ঢেলে কাজ করেছে।