


সৌমিত্র দাস, এগরা: এগরার খাদিকুলে বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের। তিন বছরে বদলে গিয়েছে অনেক কিছু। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। গ্রামে ভাঙাচোরা রাস্তায় পিচের প্রলেপ পড়েছে। বদলে গিয়েছে এলাকার মানুষের জীবনজীবিকা। এখন গ্রামে আর কেউ বাজি তৈরি করেন না। দীপাবলিতে বাজির শব্দও শোনা যায় না। কেউ দিনমজুরের, কেউ পানের বরজের কাজ করেন। কেউ ভিনরাজ্যে কাজ করতে চলে গিয়েছেন। ভানু বাগের সেই বাজি কারখানা এখন ধ্বংসস্তূপের চেহারা নিয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাজি কারখানার কঙ্কাল দেখে এখনো শিউরে ওঠেন গ্রামবাসীরা। ভিতরে ভাঙা শেড ঝোপজঙ্গলে ঢেকেছে। তৈরি বাজি ও বাজির মশলা রাখার গোপন চেম্বার লতাপাতায় ঢাকা।
২০২৩সালের ১৬মে’র তপ্ত দুপুর। এগরা-১ ব্লকের সাহাড়া পঞ্চায়েতের অধীন খাদিকুল গ্রামে বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। তীব্র শব্দ, বারুদ, অনর্গল ধোঁয়া আর পোড়া দেহের গন্ধে ভরে উঠেছিল খাদিকুল। হাজার হাজার মানুষ, পুলিশ-প্রশাসন, অ্যাম্বুলেন্সের ছোটাছুটিতে বদলে গিয়েছিল এলাকার পরিবেশ। দশজনের মৃত্যু হয়েছিল।
গ্রামে পুলিশ-প্রশাসনের নজর এড়িয়ে অবৈধ বাজি তৈরির রমরমা কারবার চলত। বাজি তৈরি এলাকায় রীতিমতো কুটিরশিল্পের চেহারা নিয়েছিল। তবে বেআইনি বাজির পাশাপাশি রকমারি আতসবাজির নামডাক ছিল। প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড থেকে এখানে বাজি কিনতে আসতেন ব্যবসায়ীরা। গ্রামের এক পাশে ফাঁকা মাঠে বিশাল কারখানা গড়ে তুলেছিল বাজি ব্যবসায়ী ভানু বাগ। গ্রামের অনেক মহিলা কাজ করতেন। সেদিন ওই বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল আশপাশ এলাকা। বহুদূর থেকে সেই শব্দ শোনা গিয়েছিল। অবৈধ বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে ঝলসে মৃত্যু হয়েছিল কারখানার মালিক ভানু বাগ সহ ১০জনের। সবাই ছিলেন খাদিকুলের বাসিন্দা। দুর্ঘটনার পর তৎকালীন সরকার মৃতদের পরিবারের লোকজন আর্থিক সাহায্যও পেয়েছেন। পরিবারের একজন করে সদস্য হোমগার্ডের চাকরিও পেয়েছেন।
সেদিনের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে গলা কেঁপে যায় অনেকের। পরিত্যক্ত কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে ভানুর ভাই কালীপদ বাগ বলেন, বরাবর দাদার বাজি তৈরির বিরোধিতা করেছি। বাজি তৈরি ও ব্যবসার সঙ্গে আমার পরিবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন নিজের জমিতে চাষ আর ফিশারি নিয়েই থাকি। গ্রামের বছর তেরোর অংশু বাগও চায় না গ্রামে আর কেউ বাজি বানাক। সেদিনের দুর্ঘটনায় মায়ের ঝলসে যাওয়া দেহ আজও ভুলতে পারেনি সে। মা মাধুরী বাগের মৃত্যুর পর বাবা পুলিশে হোমগার্ডের চাকরি পেয়েছেন। দাদা আকাশ একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান পুষ্পরানি সাউ মাইতি বলেন, সেদিনের আতঙ্কের স্মৃতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি গ্রামের মানুষ। আর বাজি তৈরি হয় না এই গ্রামে। তবে পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে নজর রাখা হয়েছে, যাতে এলাকায় কেউ অবৈধভাবে বাজি তৈরি না করে। স্থানীয়রা অনেকেই বলছেন, সেদিনের ঘটনা এতটাই এখানকার মানুষকে আতঙ্কিত করে রেখেছে যে, এখন গ্রামের পুজোতেও আর বাজি ফাটে না। দীপাবলিতে খাদিকুলে তাই শুধুই প্রদীপ আর মোমবাতি জ্বলে।