


তন্ময় মল্লিক: উত্তরবঙ্গে যা ঘটল তা জনরোষ নাকি পরিকল্পিত হামলা, এই নিয়ে বিতর্ক চলছে। আর সেটাই স্বাভাবিক। কারণ বাংলায় উৎসব হোক বা দুর্যোগ, সব কিছুতেই লাগে রাজনীতির রং। বানভাসি জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে বিজেপি নেতৃত্বের উপর যে আক্রমণ হয়েছে, এক কথায় তা নিন্দনীয়। এই অবস্থায় বঙ্গ বিজেপির পাল্টা মারের হুমকি কিংবা মহামহিমের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার অভিযোগ তোলার মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু, ভরা দুর্যোগের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃণমূল কংগ্রেস ও রাজ্য সরকারকে আক্রমণ অবশ্যই নজিরবিহীন। যে প্রধানমন্ত্রী মণিপুর নিয়ে মাসের পর মাস মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন, তিনি উত্তরবঙ্গের ঘটনায় এত সক্রিয় হলেন কেন? অনেকে বলছেন, গেরুয়া গড়ে দলের নেতাদের হেনস্তায় প্রধানমন্ত্রী বুঝেছেন, অতিবৃষ্টিজনিত ভূমি ধসের চেয়েও উত্তরবঙ্গে দ্রুত সরছে বিজেপির পায়ের তলার মাটি। তাই বিচলিত প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি আক্রমণ।
প্রায় এক দশক ধরে উত্তরবঙ্গে নির্বাচনী সাফল্য পেয়ে আসছে বিজেপি। সাফল্য পাওয়ার বেশকিছু কারণ আছে। প্রথম এবং প্রধান কারণ উত্তরবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্বল নেতৃত্ব। তারজন্য উত্তরবঙ্গে তৃণমূল সেভাবে সফল হয়নি। এছাড়া বিজেপি বিভিন্ন সময় গোর্খাল্যান্ড এবং উত্তরবঙ্গকে পৃথক রাজ্য করার দাবিকে সমর্থন করেছে। তাতে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন। তাঁরা ভেবেছেন, বিজেপির হাত শক্ত করলে পূরণ হবে দাবি। তাই একের পর এক নির্বাচনে বিজেপিকে তাঁরা ভোট দিয়ে জিতিয়েছেন।
চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এ রাজ্যে জোর ধাক্কা খায়। ৪২টি আসনের মধ্যে পেয়েছে ১২টি। উনিশের নির্বাচনের চেয়ে ছ’টি আসন কমেছে। তারই মধ্যে গেরুয়া শিবিরকে লজ্জা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে উত্তরবঙ্গ। আটটি আসনের মধ্যে জিতেছে তারা ছ’টিতে। এবার কোচবিহার আসনটি হাতছাড়া হয়েছে। একুশের ভোটে বিজেপি রাজ্যে মুখ থুবড়ে পড়লেও উত্তরবঙ্গে শাসক দলের থেকেও তারা বেশি আসন পেয়েছিল। এহেন গেরুয়া দুর্গে বিজেপির সাংসদ ও বিধায়করা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ায় দিল্লির কর্তারা উদ্বিগ্ন হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, ছাব্বিশের ভোটে দক্ষিণবঙ্গের দু’টি-একটি জেলায় কিছু আসন পেলেও মূল ভরসা উত্তরবঙ্গ। আর সেখানেই যদি নেতারা তাড়া খান, তাহলে ক্ষমতা দখল দূরের কথা, আসন ধরে রাখাই কঠিন।
উত্তরবঙ্গের যে দু’টি এলাকায় বিজেপি নেতৃত্ব লাঞ্ছিত হয়েছে, সেখানকার বিধায়ক এবং সাংসদ তাঁদেরই দলের। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার বিজেপির পক্ষে। তারপরেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সাংসদ খগেন মুর্মু এবং শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষকে উত্তেজিত লোকজন রীতিমতো তাড়া করেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকায় কোনওরকমে গাড়িতে উঠেছেন। রক্তাক্ত হয়েছেন খগেনবাবু।
সেদিন গাড়ির লম্বা কনভয় দেখে বানভাসিরা ভিড় জমিয়ে ছিলেন। তাঁরা হয়তো ভেবেছিলেন, নেতারা বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্য ত্রাণ দিতে এসেছেন। কিন্তু ত্রাণসামগ্রী দেখতে না পেয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, খালি হাতে কেন? এখানে ফটো তুলতে এসেছেন? তারপরই কেউ ছোড়ে জুতো, কেউ ছোড়ে ইট। সাধারণত কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে ত্রাণের দাবিতে অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। ত্রাণের গাড়ি লুটপাটের নজিরও রয়েছে বিস্তর।
বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূলের লোকজন তাদের দলীয় সাংসদ এবং বিধায়ককে হেনস্তা করেছে। তৃণমূলের পাল্টা দাবি, এতদিন যারা বিজেপি করত তারাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। কারণ বিজেপিকে ঘিরে তাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। তারজন্য বারবার ভোট দিয়ে বিজেপিকে জিতিয়েছে। কিন্তু উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। তা নিয়ে অসন্তোষ ছিল। বন্যার সময়
নেতৃত্ব ত্রাণ ছাড়াই এলাকায় যাওয়ায় বিস্ফোরণ ঘটেছে সেই ক্ষোভের।
তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া গেল, বিজেপির অভিযোগ ঠিক। হামলাকারীরা সকলেই তৃণমূলের। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিজেপি নেতাদের হেনস্তা করেছে। এরপরেও কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, সেখানে কি বিজেপির কর্মী সমর্থকরা ছিলেন না? যদি থেকে থাকেন তাহলে তাঁরা বিক্ষোভকারীদের বাধা দিলেন না কেন? কুমারগ্রামে গিয়েও
বিজেপি বিধায়ক মনোজ ওরাওঁ একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে থাকা বিজেপি কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছেন। ধস্তাধস্তিও হয়েছে। নাগরাকাটাতেও তেমনই প্রতিরোধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি। রহস্যটা এখানেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বিজেপি নেতৃত্ব স্ট্যান্টবাজির রাজনীতি করতে গিয়েই বিপদটা ডেকে এনেছে। যেদিন উত্তরবঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছিল সেদিনই কলকাতায় ছিল দুর্গাপুজোর কার্নিভাল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি মেনেই সেখানে ছিলেন। তা নিয়ে বিজেপি তীব্র কটাক্ষ করেছে। বিজেপি নেতৃত্ব নাগরাকাটায় গিয়ে বোঝাতে চেয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী যখন উৎসবে মেতেছেন তখন তারা দুর্গতদের পাশে আছে। তাই স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদকে না নিয়েই পৌঁছে গিয়েছিলেন নাগরাকাটায়। তবুও সঙ্গে কিছু ত্রাণ সামগ্রী থাকলে হয়তো বিপত্তি এড়াতে পারতেন। কিন্তু বিজেপি নেতাদের সেটা মাথায় ছিল না। কারণ বিজেপির দেওয়ার চেয়ে কেড়ে নেওয়ার রেকর্ডই বেশি উজ্জ্বল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্নিভালে উপস্থিতি নিয়ে বিজেপি ফায়দা তোলার চেষ্টা করেছিল। তা এখন বুমেরাং হয়ে ফিরছে। সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় উঠে আসছে পুলওয়ামায় জঙ্গিহানার দিন ডিসকভারি চ্যানেলের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও শ্যুটের প্রসঙ্গ। উঠে আসছে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানার পর সেখানে না গিয়ে বিহারে নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার কথাও।
বাংলায় কিছু ঘটলেই বিজেপি নেতৃত্ব বলে থাকে, ‘বদল হবে, বদলাও হবে।’ নাগরাকাটার ঘটনার পরেও বঙ্গ বিজেপির নেতাদের মুখে সেই একই কথা শোনা গিয়েছে। ছাব্বিশের ভোটে বাংলায় বদল হবে কি না, সেটা নির্ভর করছে রাজ্যের জনগণের উপর। সেখানে বিজেপির কিছু করার নেই। তবে, সুযোগ পেলে যে তারা বদলা নেবে, সেটা বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে। বিহারের দ্বারভাঙায় ‘ভোটার অধিকার যাত্রা’র সভায় এক যুবকের মন্তব্যের প্রতিবাদে বিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের উপর হামলা চালিয়েছে। একইভাবে খগেন মুর্মু আক্রান্ত হওয়ায় ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেসের অফিসে তাণ্ডব চালিয়েছে গেরুয়া বাহিনী।
নাগরাকাটার ঘটনার পর সুকান্ত মজুমদার পাল্টা মারের নিদান দিয়েছিলেন। কিন্তু, সেটা বাংলায় না হয়ে হল ত্রিপুরায়। তার কারণ পাল্টা মার দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি বঙ্গ বিজেপির নেই। এই পটভূমিকায় মিঠুন চক্রবর্তীকে ডায়লগ লেখার দায়িত্ব দিলে তিনি হয়তো লিখতেন, ‘মার খাব বাংলায়, মারব ত্রিপুরায়।’
নাগরাকাটায় দলীয় সাংসদ আক্রান্ত হওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘যেভাবে আমাদের দলের সহকর্মীরা-যাঁদের মধ্যে একজন বর্তমান সাংসদ ও বিধায়ক রয়েছেন-পশ্চিমবঙ্গে বন্যা ও ভূমি ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সেবা করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি তৃণমূল কংগ্রেসের অসংবেদনশীলতা এবং রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার করুণ রূপের স্পষ্ট প্রতিফলন। আমার একান্ত কামনা পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেস এই কঠিন পরিস্থিতিতে হিংসায় লিপ্ত না হয়ে মানুষের সাহায্যে আরও মনোযোগী হোক। আমি বিজেপি কার্যকর্তাদের আহ্বান জানাই, তাঁরা যেন জনগণের পাশে থেকে চলতি উদ্ধারকাজে সহায়তা করে যান।’
দলীয় সাংসদ আক্রান্ত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী উদ্বিগ্ন হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তিনি ঘটনার নিন্দা করবেন, সেটাও প্রত্যাশিত। কিন্তু বাংলার দুর্গতদের সাহায্যের জন্য তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন না কেন? সবচেয়ে বড় কথা, প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন পরিস্থিতি কঠিন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে যখন হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে, মানুষ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো, আর্থিক সাহায্য করা কি প্রধানমন্ত্রীর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না?
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতদের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ও একজনকে হোমগার্ডের চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ঘটনার নিন্দা করেছেন। তৃণমূলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও আক্রান্ত বিজেপি সাংসদকে তিনি দেখতে গিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কী করলেন? দলীয় সাংসদ ও বিধায়কের উপর হামলার জন্য তৃণমূল কংগ্রেস ও রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করলেন। বুঝিয়ে দিলেন রাজধর্ম পালন নয়, বাংলায় রাজনীতি করাই তাঁর লক্ষ্য। ফের একবার প্রমাণ হল, একুশের পরাজয়ের জ্বালা এখনও ভুলতে পারেননি মোদিজি।