


বাংলায় ছড়িয়ে অজস্র জামাই। অসংখ্য শ্বশুর। তাদের কারও হিসেবহীন খরচ, কেউ কিপটে। কেউ গম্ভীর, কেউ দরাজ। রঙ্গে ভরা বঙ্গে এসব পার্বণের মজাই আলাদা।
ঝপ করে চেয়ারে বসে গা টা এলিয়ে দিলেন পরিতোষবাবু। এই নিয়ে সাড়ে বারোবার বাজার যেতে হয়েছে। ‘সাড়ে বারো’ কারণ, শেষবার মাঝরাস্তা অবধি পৌঁছতেই গিন্নি গিরিবালার হন্তদন্ত ফোন, ‘ফিরে এসো ফিরে এসো... জিরে গুঁড়ো পাওয়া গেছে!’
এই পাওয়া আর না পাওয়ার চক্করে সকাল থেকে ঘন ঘন বাজার যেতে হয়েছে পরিতোষবাবুকে। আজ জামাইপক্ষ, থুড়ি জামাইষষ্ঠী। এই একটা মাত্র দিন যেদিন বিবাহিত পুরুষরা ব্যাচেলরদের দেখে হিংসা করে না। এমনিতেই আগেরদিন সকাল থেকে বাজার দোকান শুরু হয়েছে পরিতোষের। সে পালা এখনও সাঙ্গ হয়নি। রাস্তাঘাটে আজ যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে তারা হয় শ্যালক নয়তো শ্বশুর। সব্বাই বাজারে বেরিয়েছে। বাঙালিকে এমন গণহিস্টিরিয়ার মতো বাজার করতে দেখার দিনই জামাইষষ্ঠী। পরিতোষবাবু ফর্দ মিলিয়ে ডাঁই করে জিনিসপত্র কিনে আনছেন, আর গিরিবালা তাঁর রান্নাঘরের সখী মিনতিকে নিয়ে থরে থরে জিনিস গুছিয়ে রাখছেন। যত গুছোচ্ছেন, কাজের সময় ততই তারা লুকিয়ে পড়ছে। তেজপাতার কৌটো উঁকি দিয়ে ধপ্পা বলছে, তো চারমগজ লুকিয়ে পড়ছে। রসুনের প্যাকেট সবে টেবিলে এসে বসতে না বসতে ভেটকি ফিলের ট্রে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। রান্নাঘর তো নয়, যেন স্পোর্টস চ্যানেল! হার্ডলস আর রিলে রেসে অংশ নিয়েছে শাশুড়িরা।
এমনিতেও এসব দিনে পরিতোষ এমনিতেই মনে মনে খাপ্পা থাকেন। ওঁর জীবনে কোনও জামাইষষ্ঠী ছিল না। এমন এক বাড়িতে বিয়ে হল যে তাদের নাকি জামাইষষ্ঠীই নেই! তা নেই তো নেই, পরে একদিন জামাইকে নেমন্তন্ন করে খাওয়া! সেসব বালাই নেই! যতসব হাড়কেপ্পন। একদিন রাগ করে গিন্নির কাছে যেই না এই নালিশ ফোঁস করে বলেছেন, ব্যস, অমনি এবাড়িতে এসে পরিতোষের বাবা-মা বউমার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতেন আর পরিতোষ শ্বশুরবাড়ি গেলে কেমন খাতিরযত্ন পেতেন সেসব হরপ্পা-মহেঞ্জাদোরে খুঁড়ে তুলে আনতে শুরু করেছিল গিরিবালা। পরিতোষ সেদিন থেকেই বুঝেছে, পুরুষ দু’প্রকার। এক, যারা জামাইষষ্ঠী খায়, দুই, যারা জামাইষষ্ঠীর বাজার করে।
সকালে বাজারে গিয়ে পরিতোষের মনে হচ্ছিল বাজার তো নয় যেন, শ্রীভূমির লাইন। পাক্কা এক ঘণ্টা সতেরো মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে রেওয়াজি খাসি মিলেছে। এক সপ্তাহ আগে থেকে বলে রাখা ভেটকির ফিলে পেতে তিনবার মাছওয়ালাকে তদ্বির করতে হয়েছে। আনাজপাতির বাজার ছাড়াও ইলিশ, পাবদা, চিংড়ি সবই যেন আজ মন্বন্তরের পর বঙ্গভূমিতে এই প্রথমবার টুপ করে ল্যান্ড করেছে। যা ছোঁবে, ছ্যাঁকা ফ্রি। এত দাম দিয়ে জামাইকে খাওয়ানোর চেয়ে হোটেল-রেস্তরাঁই তো ভালো। জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে তারা বেশ ছাড়টাড়ও দেয় আজকাল। হলে কী হবে? গিন্নির কড়া হুকুম, ওটি হবে না! নিজের হাতে জামাইকে রেঁধেবেড়ে খাওয়ালে তবেই নাকি শাশুড়িদের শান্তি।
আর জামাইটাও হয়েছে তেমন। আজকালকার ছেলে, তোর চারপাশে পটাপট লোকে ভেগান-টেগান হয়ে যাচ্ছে, কোথায় তুই অন্তত মাছটাছে নেমে ফিশি হওয়ার চেষ্টা কর, তা নয়! আগের দিন বিকেলেই শাশুড়িকে ফোন করছে, মা, রাতে নরম করে তেকোনা পরোটা খাব,আর মাংস তো থাকছেই! আ মোলো যা। যেন বাপের হোটেল। যদিও একরকম বাপের হোটেলই বটে। শ্বশুর আর বাবার মধ্যে এখনকার ছেলেরা ফারাক করে না, বরং শ্বশুরের দিকেই ঝোল টানে বেশি।
পরিতোষ যখন খুব ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে মামারবাড়িতে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে যেতেন, সেখানেও খাওয়ানোর সঙ্গে জামাইবরণ পর্বটি ছিল দেখার মতো। পাড়ার নতুন জামাই মানে সে যেন বচ্চন! গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ত তাঁকে বরণ করতে। বাঙালবাড়িতে জামাইয়ের হাতে শাশুড়িরা যে তেলে চোবানো হলুদ মাখানো সুতো বেঁধে দেন, তাকে বলে বানা। এই বঙ্গেও এই রীতি আছে। তবে বানা শব্দের প্রচলন নেই। আবার বাঙালরা যাকে বলে ‘মুঠা’, এপারে তাকেই বলে ‘বাটা’। পাঁচরকম ফল, মিষ্টি, তালপাতার পাখা, দুর্বা, প্রদীপের ভাপ, কাজলে জামাই বরণ না করে এপার ওপার কোনও বঙ্গের শাশুড়িরাই কিছু দাঁতে কাটেন না। গিরিবালাও উপোস করে রেঁধে যাচ্ছে। রান্নার মেয়েটি আজ তার ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট’।
ঠিক দশটা বাজতেই টিং টং। পাটভাঙা সুতির পাঞ্জাবি আর কোঁচানো ধুতিতে হাজির জামাই সুভদ্র। সঙ্গে মেয়ে। সুভদ্র বাস্তবিক ভদ্র, সজ্জন। শাশুড়ি গিরিবালার নয়নের মণি। জামাইবরণের সময় গিরিবালার ষোড়শীর মতো ধিঙ্গিপনা দেখলেই গা জ্বলে যায় পরিতোষের। এখন ছুটোছুটি করে রাতে পরিতোষকেই বলবে হাঁটুতে তেলমালিশ করে দিতে। এমনিতেই জামাইষষ্ঠীর দিন জামাইয়ের উপর রেগে থাকেন পরিতোষ। একে তো নিজের এমন আদর জোটেনি। তার উপর এই একটা দিনে প্রায় গোটা পনেরো দিনের বাজার-খরচ গলে যায়! তার উপর মেয়েটার সঙ্গে যে একটু সোহাগ করবেন, সে উপায়ও নেই। শাশুড়ি ও জামাইয়ের আদিখ্যেতার মাঝে বাপ ও মেয়ে যেন ফুচকার ফাউ!
সুভদ্র এখনকার ছেলে। জিমটিম করে। তবে এসেই জানিয়ে দিয়েছে, ‘বাবা আজ কিন্তু আমার চিট ডে!’
‘হ্যাঁ বাবা, জামাইষষ্ঠীই তো উপযুক্ত চিট ডে! সেজেগুজে এসে শ্বশুরের মানিব্যাগকে চিট করার এমন সুযোগ যেদিন পাওয়া যায়, সেদিন তো যথার্থই চিট ডে!’
সুভদ্র শুনেই হো হো করে প্রাণখোলা হেসে ওঠে। গিরিবালা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে। জামাইকে টুকটাক খাতিরদারি করেই মেয়ের সঙ্গে ভিড়ে গেল পরিতোষ। আহা রে! কই, ওর মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি তো ওর জন্য গোটা একটা দিন রেখে, রান্নাবান্না করে পাত সাজিয়ে এত তোয়াজ করে খেতে দেয় না। ওর শ্বশুর আবার ডাকসাইটে উকিল। চেম্বারভর্তি ক্রিমিনাল। তাদের সামলে বাজারে যাওয়ার ফুরসত তার নেই। ছেলের মা আবার উকিলের বউ। তার ঘ্যাম আরও। রান্নাঘরে ঢোকার প্র্যাকটিস নেই। ছেলের বিয়ে দিয়ে আরও ঝাড়া হাত-পা। মাঝেমধ্যেই ভাই-বোনদের সঙ্গে বেড়াতে চলে যায়। চাকরি সামলে ঘরবার সামলাতে হয় বাড়ির বউটিকেই। এমনিতে ওরা ওদের বউমাটিকে ভরসাও করে, ভালোওবাসে। তবে জামাই ও শাশুড়ি মিলে যে মাখোমাখো ‘জুটি’ নিজের বাড়িতে সম্বচ্ছর দেখেন পরিতোষ, তত খাতিরদারি যে তাঁর মেয়েটি পাল্টা ওবাড়িতে পায় না, তা বিলক্ষণ বোঝেন তিনি।
রাতে ওরা ফিরে যাওয়ার পর গিন্নি সবে এসে ঘরে বসেছেন। তখনই মোক্ষম কথাখানা পাড়লেন পরিতোষ।
‘তা তোমাকে জামাই এবার কী দিলে?’
ব্যস! সোডার বোতলে যেটুকু ভসভসানি বাকি ছিল তা বেরিয়ে এল। গদগদ গিরিবালা ফিনফিনে প্যাকেট থেকে বের করে আনলেন সোনালি সুতোয় বাঁধা বাক্স! তাতে উঁকি দিচ্ছে ঘিয়েরঙা কাতান বেনারসি। ‘আমার জামাই এবার বেনারসি দিয়েছে গো!’
বলেই গিফটের ফোটোসেশন করে আত্মীয়দের গ্রুপে পোস্টও হয়ে গেল। পরিতোষ জানে, সেখানে আবার চাপা প্রতিযোগিতা আছে— বিষয়: কার জামাই শাশুড়িকে কী গিফট দিল।
বেশিরভাগ শাশুড়িই এই দিনটা নানা আদর-আপ্যায়নে ঠেসে রাখে রুটিন। জামাইকে ধরো ধরো করতে করতেই তাদের দিন কেটে যায়। তবে বিষয়ী ও হিসেবি শ্বশুরদের কেসটা একটু আলাদা। বছরের অন্যদিন জামাই যতই তার ‘মাই ডিয়ার’ হোক, এইদিনটা জামাই শুধুই ‘মাই ফিয়ার’!
মুখ খুললেন পরিতোষ, ‘আর সকাল থেকে আমি যে ছুটে মরলাম, আমার জন্য কী এল?’
কথাটা লুফে নিয়েই, গোপন বোমা বের করার মতো আর একটা প্যাকেট খুললেন গিরিবালা। সেখানে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে টবসুদ্ধ একটা ছোট্ট গাছ!
‘সকাল থেকে তো খরচ শুনিয়ে খুব খোঁটা দিচ্ছিলে! দিল তো জামাই মুখের মতো জবাব? একটা গোটা মানিপ্ল্যান্ট দিয়ে গেল তোমাকে। নাও ধরো!’
ভুরু কুঁচকে রয়েছেন পরিতোষ। শাশুড়ির বেলায় বেনারসি, আর শ্বশুরের বেলায় হাতে চুষি! একটা নিদেন পাঞ্জাবিও নয়, শেষে মানিপ্ল্যান্ট!
গিরি বলেই চলেছে, ‘শোনো, এই গাছ বাড়ির দক্ষিণ পূর্বে পুঁতলে প্রচুর টাকা-পয়সা হয়, বুঝলে!’
মনে মনে হেসে ফেললেন পরিতোষ!
‘তোমাদের যা জামাই আদরের বহর, বাড়ির দক্ষিণ পূর্বে মানিপ্ল্যান্ট রাখলেও বাড়ির উত্তর পূর্ব দিয়ে হু হু করে আমার টাকা গলে যাবে!
পরিতোষের দিকে কটমট করে চেয়ে আছেন গিরিবালা।
পরিতোষ বুঝলেন, মুখ ফস্কে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনেছেন। সংসার সীমান্তে তিনি শুধুই আধাসেনা। যুদ্ধবিরতি না মানলে এখন ঘোর বিপদ!
মনীষা মুখোপাধ্যায়