


সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে মনোময় ভট্টাচার্য।
• আমার বেড়ে ওঠা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা তখনকার সময়ে একজন আদর্শ স্কুল শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের অত বেতন ছিল না। মা ইলা ভট্টাচার্য ছিলেন ছিমছাম গৃহবধূ। আমরা পাঁচ ভাইবোন। বাবা ছাত্র-স্কুল-টিউশন এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। বেরতেন ভোরবেলা, আর ফিরতেন রাত ১১টা নাগাদ। কোনো কোনো দিন স্কুল থেকেই টিউশনিতে চলে যেতেন। সাতজনের পরিবার সচল রাখতে বাবাকে এই কষ্ট করতেই হত। পাশে ছিলেন আমার মা। পাঁচ ভাইবোনকে প্রায় একার হাতে বড়ো করেছেন। সবাইকে স্কুলের জন্য তৈরি করা, রান্নার তোড়জোড়, সব কাজ একা করা, একরকম হাড়ভাঙা খাটনি ছিল মায়ের। অনেক সময় স্কুল থেকে ফিরে সাড়ে তিনটে-চারটের সময় দেখতাম, মা দুপুরে খাবার খেতে বসছেন! কিন্তু কোনোদিন মাকে এসব নিয়ে টুঁ শব্দ করতে শুনিনি। তার মধ্যেও আমাদের পছন্দের রান্না করা, সবাই কীসে ভালো থাকবে এসব দিকে মায়ের খেয়াল থাকত। আগেকার দিনের মানুষ তো, সংগ্রাম করেছেন অনেক। তাঁদের কত স্বপ্ন পূরণ হয়নি শুধুই সংসার প্রতিপালন করতে গিয়ে!
মা নিজেও অসামান্য গান করতেন। গায়ক মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন মায়ের সংগীতগুরু। বাবার দিক থেকে আমরা যদু ভট্টর উত্তরাধীকারী। তাই দুই পরিবারেই গান ছিল সবচেয়ে বড়ো আশ্রয়। যখন আমি গান নিয়ে বসতাম, তখন মাও আমার সঙ্গে গাইতেন। নানা সুর নিয়ে আলোচনা হত। মায়ের কাছেই আমি কিছু কীর্তনাঙ্গের গান শিখেছি। এখনও মা যেটুকু করেন, খুব সুরে গান। আমার দাদু ছিলেন আশুতোষ কলেজের প্রিন্সিপাল। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় দাদুকে ডেকে চাকরি দিয়েছিলেন। ছোটোবেলায় মায়ের গান শুনে তিনি আমার বাবাকে বলেছিলেন,‘মেয়েকে কখনো গান ছাড়তে দেবেন না।’ বাবাও মায়ের এই গান নিয়ে গর্বিত ছিলেন।
বাবা ছিলেন গায়ক সুবিমল রায়ের ছাত্র। কিন্তু বাবা ভালো হারমোনিয়াম বাজাতে পারতেন না। বিয়ের পর মা বহুবার বাবার অনুষ্ঠানে মঞ্চে হারমোনিয়াম বাজিয়েছেন। মায়ের মধ্যে অনেক প্রতিভা ছিল। কিন্তু যা হয়, সংসার করতে করতে মায়েদের নানা প্রতিভা চাপা পড়ে যায়।
গান নিয়ে আমাদের পরিবার খুব সিরিয়াস। আমরা সব ভাইবোন গান করি। সকলেই প্রশিক্ষিত। আমি যে গান করি, আমার গায়কি মায়ের, তালজ্ঞান বাবার। আমরা দু’টি বিষয়ে বাবার কাছে বকুনি খেতাম, পড়াশোনা আর গান। বাবা খুব কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন। অনুশাসন মানতেন। প্রয়োজনে মারও খেয়েছি বাবার হাতে। মা আমাদের বাবার শাসন থেকে বাঁচাতেন। বাবার কত মার মা আটকে আমাদের বাঁচিয়েছেন! বাবা বলতেন, ‘তোমার আদরে এরা বাঁদর হয়ে যাচ্ছে!’
তবে বাবা খুব স্নেহশীও ছিলেন। আমাদের সব ভাইবোন সহ মায়ের কোথায় কী প্রয়োজন, সবদিকে নজর ছিল। মনের অন্দরে একটা স্নেহের ফল্গুধারা বইত তাঁর। বাবাকে সমীহও করতাম খুব। তাই মায়ের কোলেই আমাদের যাবতীয় মুখ লুকানো, প্রশ্রয়, যত আবদার। আমি সবার ছোটো। তাই প্রশ্রয় পেয়েছি বেশি।
এখন আমাকে যেমন দেখেন, ছোটোবেলায় মোটেই তেমন সুভদ্র ছিলাম না। সব ভাইবোনের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশি ডানপিটে ছিলাম। যখন তখন পুকুরে ঝাঁপ মারছি, দৌড়াদৌড়ি করছি। তাই আমাকে নিয়ে মা খুব দুশ্চিন্তায় থাকতেন। আমার অন্য দাদা-দিদিরা মাকে এত জ্বালাননি, যতটা আমি জ্বালিয়েছি।
আমার নিয়ম ছিল, রোজ সকাল-বিকেল মিলিয়ে আমি পুকুরে আড়াই ঘণ্টা থাকব। দুটো পাড়ার মাঝে ছিল পুকুর। প্রায় সন্ধে পার করে দিতাম পুকুর থেকে উঠতে। আমি হয়তো ডুবসাঁতার দিচ্ছি, আর মা আমাদের পাড়ার দিক থেকে এসে পুকুর ধারে দাঁড়িয়ে আমার নাম ধরে ভয়ে চিৎকার করছেন। ভাবছেন, আমি হয়তো ডুবে গিয়েছি!
কত স্মৃতি আজ মনে পড়ে যাচ্ছে। হয়তো কোনো এক দিন পড়া করিনি। এদিকে স্যার আসবেন। বাবা তো শুনলেই মারবেন। মাকে গিয়ে বলতাম, ‘ও মা, বলো না আজ আমার শরীর খারাপ। আজ পড়ব না।’ মা সবই বুঝতেন, মৃদু বকুনিও দিতেন বটে, তবে স্যারকে গিয়েও অনুরোধ করতেন অন্যদিন আসার জন্য। মা বারবার আমাদের ঢাল হয়েছেন।
আমার সেজদার সঙ্গে আমার মাত্র আড়াই বছরের তফাত। পিঠোপিঠি। তাই আমাদের মধ্যে খুনসুটিও বেশি হত। মা সবসময় তাঁর ছোটো ছেলেকে গার্ড করতেন। আর সেজদা রেগে যেতেন!
মায়ের এখন ৯৬ বছর বয়স, সন্তানশোকও পেয়েছেন। একেবারে এলোমেলো হয়ে যান আমাদের বড়ো দাদা চলে যাওয়ার পর। প্রথম সন্তানের চলে যাওয়া মাকে খুব বিচলিত করে তোলে। তারপর অনেক চেষ্টাচরিত্র করে মাকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি আমরা। এখন মা কানে কম শোনেন ঠিকই কিন্তু মারাত্মক স্মৃতিশক্তি। আমি গত ৩০ বছরে কবে কোথায় কোন স্টেজে কী গেয়েছি, কবে বিদেশ গিয়েছি, মাকে নিয়ে কোথায় কোথায় বেড়াতে গিয়েছি সবই মায়ের মুখস্থ। তাঁর সব ছেলেমেয়ে তাঁকে সারাক্ষণ ঘিরে থাকবে, এটাই মায়ের সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয়।
মায়ের বাড়ি ও আমার বাড়ি মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। বাড়িতে থাকার সময়ও রোজ নিয়ম করে দু’-তিনবার যাতায়াত করি। তাঁকে ঘিরেই আমাদের বাড়ির মূলস্রোত বয়ে যায়।
মা খুব মায়াপ্রবণ নারী। স্কুল-কলেজের জীবন থেকেই দেখেছি, আমরা ভাইবোনরা যখন স্কুল-কলেজ যাচ্ছি, মা শেষ অবধি রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন, যতক্ষণ না আমরা ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি। একটু ফেরার দেরি হলেই রাস্তায় এগিয়ে আসতেন। এই মায়া তো আর কোথাও পাব না।
আমরা চাই, আমাদের জন্য এই মায়া আরও অনেক বছর থাকুক। মা আমার এক মায়াটলটলে আশ্রয়।