


বিশেষ নিবন্ধ, বিশ্বজিৎ দাস: সাত-আট বছর আগের কথা। খোলামেলা গল্প-আড্ডায় রাজ্যের এক প্রথম সারির চোখের হাসপাতালের কর্ণধার বলছিলেন, ‘গাড়ি ভাড়া করে, কাজ ও দিন নষ্ট করে, কয়েকশো কিমি উজিয়ে এরপর থেকে আমার হাসপাতালে আসতে হবে না। যাঁরা আসছেন, এরপর আমি যাব তাঁদের কাছে’।
‘মানে?’
‘মানে এরপর থেকে যা নতুন হাসপাতাল করব, অধিকাংশই করব জেলায় জেলায়। সব জায়গায় উন্নয়ন বড়ো শহরকেন্দ্রিক। বেশি ছোটাছুটি করতে হয় তো জেলার মানুষদের!’
স্বাস্থ্যে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর লক্ষ্য কলকাতা। উনি বললেন উলটো। তারপরই মনে হল, একজন উদ্যোগপতি হিসেবে যে মডেলের কথা বলছেন, সেটাই হওয়া উচিত স্বাস্থ্য-শিক্ষা সর্বত্র। শিল্প, পর্যটন, জরুরি প্রয়োজনে হাজার হাজার কিলোমিটার চওড়া, ঝাঁ চকচকে রাস্তা থাকা জরুরি। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় উন্নত স্বাস্থ্যপরিষেবা পেতে মানুষকে কেন সকাল চারটেতে ঘুম থেকে উঠতে হবে? কেন তিন ঘণ্টা ঠেঙিয়ে কলকাতায় আসতে হবে? কেন ডাক্তার দেখাতে আরো দু’ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে? কেনই বা ওষুধ নিতে আরও দেড় থেকে দু ঘণ্টার অপেক্ষা আর বাড়ি ফেরা সেই রাত ১০টা-১১টায়!
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সহ সারা দেশে রয়েছে ত্রিস্তরীয় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। প্রথম স্তরে রয়েছে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র (সুস্বাস্থ্যকেন্দ্র), প্রাথমিক ও ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা গ্রামীণ হাসপাতাল। দ্বিতীয় স্তরে মহকুমা, জেলা হাসপাতাল, স্টেট জেনারেল ও সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল। তৃতীয় এবং সর্বশেষ বা টার্শিয়ারি স্তরে রয়েছে মেডিকেল কলেজ। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রেফারাল চেনটিও এভাবেই করা আছে। মানে মানুষ ছোটোখাটো সমস্যায় প্রাথমিক স্তরে যাবে। মাঝারি এবং একটু গুরুতর সমস্যায় যাবে দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতালে। জটিল অসুখ, বড়োসড়ো অপারেশনে যেতে হবে মেডিকেল কলেজে। প্রায় তিন দশক আগে রেফারেল ম্যানুয়াল করার সময় কোন জেলার মানুষ, কোন মেডিকেল কলেজে যাবে, সেসবও ঠিক করা হয়েছিল।
বর্তমানে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে দিনে ৫-৬ হাজার থেকে ১২-১৩ হাজার রোগী আসেন। যেকোনো সরকারি মেডিকেল কলেজের চিকিৎসককে জিজ্ঞাসা করুন, কতজনের সমস্যা মেডিকেল কলেজে আসার মতো? বলবেন, ‘অর্ধেকও নয়!’
তাহলে কেন আসছেন? স্থানীয় হাসপাতালে অনাস্থা? পরিকাঠামোর সমস্যা? ডাক্তারদের গ্রামে যেতে না চাওয়া? এসব আছেই। এর থেকেও বড়ো জিনিসটা হল মনস্তাত্ত্বিক। ‘পিজিতে যাই, ভালো চিকিৎসা পাবো। মেডিকেলে যাই, বড়ো ডাক্তারবাবু আছেন। আর জি করে যাই, পাশের বাড়ির বুচুর মায়ের কঠিন রোগ সারিয়ে দিয়েছিলেন ডাক্তাররা!’
এই মাইন্ড সেটআপের জন্য প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ শুধু চেকআপ করাতে টিসি, ডিসি, ইএসআর, লিপিড প্রোফাইল, ইকো-অ্যাঞ্জিও করাতে কয়েক হাজার কিমি ও টাকা খরচ করে ছুটছে দক্ষিণে! যেতেই পারতেন নিজের জেলার প্রাইভেট হাসপাতালে, আরেকটু খরচ করে কলকাতায়। না করে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সোজা চলে আসছেন পিজিতে। বা এর-ওর হাত ধরে চলে যাচ্ছেন চেন্নাই অ্যাপোলো কিংবা সিএমসি ভেলোরে। নিশ্চিত, কোথাও না কোথাও খামতিও আছে। না হলে কেন তাঁদের মাইন্ড সেট বদলাচ্ছে না।
তাহলে উপায়? প্রথমত, প্রাথমিক এবং দ্বিতীয় স্তরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত, ব্যাক টু দ্য রুটস। পুরো ব্যবস্থার ফোকাস একদিকে যেমন থাকুক আধুনিক ও স্মার্ট হওয়ার দিকে, অন্যদিকে নজর থাক মানুষের কাছে তা কত সহজে পৌঁছাবে, সে ব্যাপারে।
গত এক বছরে রাজ্যের সমস্ত সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার দেখিয়েছেন সাড়ে ৫ কোটি মানুষ! সব চিকিৎসা ফ্রি হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর এই সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। বেশি বেশি মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসছে দেখে সন্তুষ্ট হওয়ারই কথা। কিন্তু, সংখ্যা বলে না আসল সমস্যা কোথায়। বরং একটি বুদবুদের মধ্যে সবাইকে রেখে দেয়।
এই বিপুল সরকারি হাসপাতালমুখো মানুষের বেশিরভাগই কয়েকশো কিমি ডিঙিয়ে আসছেন। সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু যানবাহনের খরচ, কাজের দিন নষ্ট—সেগুলো যায় কোথায়! বর্ধমান থেকে কলকাতায় এলে, অ্যাম্বুলেন্স চালক নেন দুই পিঠেরই ভাড়া! তাই দিনশেষে বিনা পয়সায় ভালো চিকিৎসা পেয়ে যেখানে খুব খুশি হওয়ার কথা, ‘খুব’টুকু বাদ দিয়ে শুধু খুশি হয়ে ফিরছে মানুষ। অথবা মুখে থেকে যাচ্ছে খানিক বিরক্তি।
তাহলে? সেই ব্যাক টু দ্য বেসিকস। যেখান থেকে মানুষগুলো দু’তিনটে স্তরের হাসপাতাল ডিঙিয়ে কলকাতায় আসছেন, একেবারে সেখানে পৌঁছানো। যাতে বড়ো দরকার ছাড়া কলকাতা বা বড়ো শহরে আসতেই না হয়। সোদপুরে, কল্যাণী, আরামবাগের মতো শহরে কলকাতার বড়ো মিষ্টির দোকান, শপিং মল বা শাড়ির দোকানের ব্রাঞ্চ খুললে যেমন গর্বে বুক ফুলে ওঠে এলাকাবাসীর, একই মডেলে সাজাতে হবে স্বাস্থ্যকেও।
দরকার ল্যাপারোস্কপি থেকে রোবটিক সার্জারি, সুগারের আধুনিক ওষুধ থেকে থ্যালাসেমিয়া-হিমোফিলিয়া রোগীদের প্রয়োজনীয় রক্ত পাওয়া ব্যবস্থা করা। ক্যান্সারে রেডিও-কেমোথেরাপি, ব্রেন স্ট্রোকে সিটি স্ক্যান-এমআরআই, হার্টের জরুরি প্রসিডিওর যেমন অ্যাঞ্জিওগ্রাম, অ্যাঞ্জিওপ্ল্যাস্টি ইত্যাদি জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। টেলিমেডিসিন সময়, দৌড়াদৌড়ি, খরচ সবটাই বাঁচায়। দরকার টেলিমেডিসিনও। অবশ্যই দরকার অপ্রয়োজনীয় রেফার আটকানো এবং রেফার্ড রোগীর জন্য ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা। ভালো হয়, যদি বাড়ির দোরগোড়ায় স্পেশালিস্ট পরিষেবাও পাওয়া যায়। মনে মনে বলছেন, ‘অত খায় না’! বলি, ‘কেন, বড়ো শহরে বসে নিজের বেলা আঁটিসুঁটি, পরের বেলা দাঁতকপাটি?’
দেখা যাক, এগুলির মধ্যে কতগুলি হয়েছে, কতগুলি হয়নি। জেলা ও সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে ল্যাপারোস্কপি শুরু হয়েছে। রোবট আসেনি। সুগার সহ আরো অসংখ্য ক্রনিক রোগের ফ্রি ওষুধের সংখ্যা বেড়েছে। থ্যালাসেমিয়া এবং হিমোফিলিয়া রোগীদের রক্ত পাওয়ার সুবিধা জেলা স্তর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। যদিও ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা এখনো অনেকটাই বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ নির্ভর। জেলা স্তর পর্যন্ত সিটি স্ক্যান মেশিন ছড়িয়ে দেওয়ায় স্ট্রোক নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে। মানে স্ট্রোক হলে সবসময় রোগীকে কলকাতায় আনার দরকার নেই। জেলা হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে রোগীর সিটি স্ক্যান করিয়ে ডাক্তাররা রিপোর্ট অনলাইনে পাঠাচ্ছেন অন্য প্রান্তে থাকা বাঙ্গুরের ডাক্তারবাবুদের কাছে। তাঁরা কী করণীয় জানিয়ে দিচ্ছেন। তবে হার্টের জরুরি চিকিৎসা এখনো অনেকটাই বড়ো মেডিকেল কলেজ নির্ভর। হ্যাঁ, কেউ বলতে পারেন, এখন তো ডিএম, এমসিএইচ চিকিৎসকেরও অভাব নেই। ক্যাথল্যাবের মতো দামি যন্ত্র রয়েছে জেলার বহু প্রাইভেট হাসপাতালেও। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড হাতে সেখানে গেলেও তো হচ্ছে।
টেলিমেডিসিনে রোজ প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। তবে মারাত্মক চোটআঘাত আর মায়েদের জন্য ১০২ সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বাদে, রেফার্ড রোগীদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স কই? রোজ হাজার হাজার নিম্নবিত্ত, গরিব, মধ্যবিত্ত রোগীর পকেট থেকে ৩-৪ হাজার থেকে ৮-১০ হাজার টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে শুধু যাতায়াতে। এই দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। তাহলেই তো সত্যিকারের মুখে হাসি ফুটবে।
বাড়ির কাছে সুস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে, টেলিমেডিসিনের সাহায্যে ডাক্তারদের কনসালটেশন চললেও তাতে মানুষের মন ভরে না। তাই সে গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে ছোটাছুটি করে। এক্ষেত্রে দুরন্ত সলিউশন হল পুরো পরিষেবাটাই যদি তাঁর হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
সে ব্যাপারে দুর্দান্ত উত্তর হল কয়েক মাস আগে চালু মোবাইল মেডিকেল ইউনিট বা চলমান ‘মিনি হাসপাতাল’। একেবারে ব্লকে ব্লকে পৌঁছে যাচ্ছে। মাত্র তিন মাসে বিভিন্ন জেলায় সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি ক্যাম্প হয়েছে এই প্রকল্পে। আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স বা মিনি হাসপাতালেই রুটিন পরীক্ষা, ডাক্তার দেখানো সবকিছু হচ্ছে। এই ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ প্রকল্পে উপকৃত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৫ লক্ষ মানুষ।
বাড়ির কাছেই স্পেশালিস্ট দেখানো, ফ্রি টেস্ট করানো, ফ্রিতে ওষুধ দেওয়া, প্রয়োজনে দায়িত্ব নিয়ে রেফার করানো—সবমিলিয়ে এক ছাতার তলায় কর্পোরেট স্টাইলে গোছানো ক্যাম্পের উদাহরণ নিঃসন্দেহে সেবাশ্রয় ১ এবং ২ প্রকল্প। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখনো পর্যন্ত উপকৃত প্রায় ২৫ লক্ষ! আসলে দুর্গত মানুষের কাছে, সমস্যায় পড়া মানুষের কাছে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়ার সহজতম রাস্তা হল স্বাস্থ্য। আর মানুষের বিপদে যে দাঁড়ায়, মানুষ তাঁকে কোনোদিন ভোলে না। ভোগালেও অবশ্য ভোলে না কোনোদিন!
‘আপনি আমার কাছে আসবেন না, আমি আপনার কাছে যাব।’ লেখার শুরুতে এক কর্পোরেট হাসপাতালের বিচক্ষণ মালিকের কথাগুলি বলছিলাম। রাজ্যের প্রতিশ্রুতিমতো ‘দুয়ারে চিকিৎসা’র মতো বাড়ির কাছে পৌঁছে যাওয়া পরিষেবা যদি সত্যিই চালু হয়, সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন খেটে খাওয়া মানুষ।
পাশাপাশি মেডিকেল কলেজগুলির কথাও ভাবতে হবে। তুচ্ছ দরকারে কয়েকশো কিলোমিটার ডিঙিয়ে আসা বন্ধ করা যেমন জরুরি, তেমনই দরকার যাঁরা এসে পড়েছেন, তাঁদের জন্য ঠিকঠাক বসার, জলের, ছাউনির, বাথরুমের ব্যবস্থা করা। ছোটাছুটি কমাতে ঠিকঠাক সাইনেজের ব্যবস্থা করা। দামি যন্ত্র, ওষুধ, টেস্ট ও চিকিৎসা ফ্রিতে দিতে রাজ্য কয়েক হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে ব্যয় করেছে। ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানের মাধ্যমে ৫০-৯০ শতাংশ ছাড়ে ওষুধ বিক্রি করেছে। এইসব দোকান থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার শুধু ছাড়ই পেয়েছেন রোগীরা। স্বাস্থ্যসাথীতে ৩৭ লক্ষ বার ডায়ালিসিস হয়েছে ফ্রিতে। রোগীরা বছরে ১৫৫ কোটি টাকার ডায়ালিসিস পাচ্ছেন ফ্রিতে।
কিন্তু, এইসব কোটি কোটি টাকার ব্যাপারের মধ্যে, আপাতদৃষ্টিতে দেখতে তুচ্ছ কাজ মনে হলেও, প্লাস্টিক বিছিয়ে আর জি কর, পি জি, এন আর এস, ন্যাশনাল, মেডিকেলে দিনরাত কাটানো সোনামণি টুডু বা তারক সরকাররা বেশি কিছু চান না। ওঁরা যত পাই তত খাই, তারপর ভুলে যাই, তেমন নন। কিন্তু তার মানে ওঁরা এমনও নন, ফ্রিতে চিকিৎসা পাচ্ছেন বলে লিফটে আটকে থাকতে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চিৎকার করলেও কাউকে খুঁজে পাবেন না। ডাক্তারবাবু কোথায় জানতে চাইলে পুলিশ কিংবা প্রাইভেট সিকিউরিটি ধমকে কথা বলবে।
ফ্রিতে চিকিৎসা মানে অসম্মান নয়। তিনি তাঁর অধিকারটুকু নিচ্ছেন। তিনিও তো এ শহরেরই অতিথি। ভালো ব্যবহার ও পরিষেবা নিয়ে তাঁরা বাড়ি ফিরলে—খুশি হবেন নারায়ণই!