


জীবন বাঁচানোর কারীগরদের প্রতি ৩ জনের ১ জন বার্ন আউটের শিকার। বহু ভারতীয় চিকিৎসক সপ্তাহে ৮০ ঘণ্টারও
বেশি কাজ করেন! অনিদ্রা, উদ্বেগ ও ঘুমের অভাব, মূলত এই তিন সমস্যায় ভুগছেন বেশিরভাগ ডাক্তার। তাই এবারের
চিকিৎসক দিবসের থিম—পর্দার আড়ালের সত্যিটা, ডাক্তারদের সুস্থ করবেন কে?
নবতিপর দিকপাল চিকিৎসক ডাঃ সুকুমার মুখোপাধ্যায় ডাক্তারির দুই আমলই দেখেছেন। ফারাক কতটা, এগিয়ে রাখবেন কোন সময়কে? সাক্ষাৎকার নিলেন বিশ্বজিৎ দাস।
বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কিংবদন্তী চিকিৎসক ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা...
একাধারে এমআরসিপি-এফআরসিএস ছিলেন। যদিও উনি প্র্যাকটিস করতেন মেডিসিন। তাঁর চিকিৎসা, তাঁর প্রেসক্রিপশনই ছিল শেষ কথা। ওঁকে সামনে থেকে দেখেছি। মেডিকেল কলেজে ওঁর হাত থেকে পুরস্কারও নিয়েছি। উনি যখন প্রয়াত হন ১৯৬২ সালে, আমি তখন মেডিকেলের সিনিয়র রেসিডেন্ট। চেম্বারে বসা অবস্থাতেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল ওঁর। বহু চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি। ধর্মতলা স্ট্রিট সেদিন লোকে লোকারণ্য! একদিকে ডাক্তারি, অন্যদিকে রাজনীতি—দু’দিকেই মেগাস্টার মানুষটি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে ‘জহর’ বলে ডাকবার ক্ষমতা রাখতেন। সকালে প্র্যাকটিস করতেন। বিকেল রাজনৈতিক জীবন! ওয়েলিংটন পার্কের উল্টোদিকে চেম্বার ছিল। রোজ লম্বা লাইন লেগে যেত। প্রায় বিনা পয়সাতেও ওখানে রোগী দেখতেন বিধানবাবু।
ওই সময়ে কেমন ছিল ডাক্তারি? অবজারভেশন, রোগীর সঙ্গে কথা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল তখন। মাস্টারমশাইরা বারবার সেদিকে নজর দিতে বলতেন।
অবজারভেশন বলতে?
রোগীর হাঁটাচলা, চোখ, মুখ, হাত, তালু পরীক্ষা করা, পেট টিপে দেখা। তখন কোথায় ছিল আজকের দিনের মতো এতো টেস্ট? এমআরআই, সিটি স্ক্যান, পেট স্ক্যান কিছুই ছিল না। ছিল বলতে এক্স রে, ইসিজি, বেরিয়াম মিল এক্স রে এইরকম প্রাথমিক কয়েকটি পরীক্ষা।
সত্যিই হাঁটা দেখে রোগ বোঝা সম্ভব? নাকি এসব গল্পকথা! বিধানবাবু নাকি পারতেন?
বোঝা যায় বৈকি। কারও বিকলাঙ্গতা আছে কিনা, হেমিপ্যারালিসিস বা একদিকে প্যারালিসিস থাকলে হাঁটা দেখেই বোঝা যায়। আরও কিছু রোগ আছে, পূর্বাভাস দেয় হাঁটা।
চোখ, মুখ নিরীক্ষণ করেও কি সত্যিই রোগের ইঙ্গিত মেলে?
রোগীর অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা আছে কিনা, জন্ডিস হয়েছে কিনা, কনজাংটিভাইটিস, এমনকী রোগী মরণাপন্ন কিনা (পিউপিল থেকে), এমন অসংখ্য বিষয় জানা যায়। অন্যদিকে মুখ দেখে ফেসিয়াল প্যারালিসিস চেনা যায়। পার্কিনসনস বোঝা যায়। মুখ ফুলে গেলে বোঝা যায়, রোগীর হাইপোথায়রয়েড থাকতে পারে। ‘সুপিরিয়র ভেনাকাভা সিনড্রম’-এর মতো জটিল অসুখও বোঝা সম্ভব মুখ দেখে।
আর আজকের ডাক্তারি?
এখন অবজারভেশন নির্ভর চিকিৎসা কমই হয়। রোগ ও রক্তপরীক্ষাই এখন ডাক্তারির অন্যতম স্তম্ভ। তবে এটাও মানতে হবে, তখনকার আর এখনকার জনসংখ্যার মধ্যে ফারাক আকাশপাতালের। তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কমিউনিকেবল ডিজিজ। কুষ্ঠ, যক্ষ্মা, কলেরা, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এইসব। আর এখন নন কমিউনিকেবল ডিজিজ। সুগার, প্রেশার, ইউরিক অ্যাসিড, ক্যান্সার।
কোন চিকিৎসাকে এগিয়ে রাখবেন। সে আমল, এ আমল— দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তখন এত আধুনিক পরীক্ষানিরীক্ষা আসেনি। সত্যি বলতে অবজারভেশনের উপর নির্ভর তখন শুধু যে চিকিৎসকরা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থেকে করতেন, সবসময় এমনটাও নয়। অন্য কোনও উপায়ও তো ছিল না। কিন্তু সবসময় অবজারভেশন নিখুঁত হবে, তার গ্যারান্টি নেই।
সেখানে রোগীকে দেখে নিজের উপলব্ধি এবং রোগ বা রক্তপরীক্ষার রিপোর্ট—দুই মিলিয়ে এখন সিদ্ধান্তে উপনীত হন আজকের চিকিৎসক। তবে হ্যাঁ, গোড়ার কথা কিন্তু ওই অবজারভেশন বা নিরীক্ষণ। ক্লিনিক্যাল আই। ওটি না থাকলে কীসের ডাক্তারি? ওটি ভুললে হবে না। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কিন্তু ওই ঘরানারই প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক।