


সুকান্ত বসু , কলকাতা: রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা কাজী নজরুল ইসলামের নামে। ব্রিটিশদের হাত থেকে রেহাই পাননি সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারও। ইংরেজ শাসক নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল নামকরা সব ব্যক্তিত্বদের। সে তালিকায় কে নেই? উপেন্দ্রনারায়ণ নিয়োগী, পুলিনবিহারী ধর, চারুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বাবা গুরজিৎ সিং, ডঃ জে এস দেবগুপ্ত। ইংরেজদের প্রতিহিংসার তালিকা শেষ হওয়ার নয়। তবে এই ক’জনের নাম উল্লেখের কারণ হল, এই নামকরা মানুষদের বিরুদ্ধে যে মামলা চলছিল তার নথিগুলি এখনও রয়ে গিয়েছে ব্যাঙ্কশাল আদালতে। তবে সেগুলি হাতে তুলে দেখার উপায় নেই। ধরলেই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে, এতটাই জীর্ণ।
ব্যাঙ্কশাল আদালতের বহুতল ভবনের একটি ঘরে হাজার নথির ভিড়ে কাপড় জড়ানো অবস্থায় রয়েছে ৪০টির উপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা। সেগুলির কোনওটির বয়স ৯৫ বছর, কোনওটার হয়ত ৯০। কোনও মামলায় একাধিক স্বাধীনতা সংগ্রামী দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হন। কোনও ক্ষেত্রে একা কারও সাজা হয়। ব্যাঙ্কশালের প্রবীণ আইনজীবী যামিনীরঞ্জন ঘোষ বলেন, ‘যাদের ঘাম ও রক্তে এদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের মামলার নথি রক্ষা করা জাতীয় কর্তব্য। ওগুলি কোনও সংগ্রহশালায় রাখার ব্যবস্থা হলে গবেষক থেকে সাধারণ মানুষ সবাই দেখতে পাবেন।’
কিছুকাল আগে নথির এ হেন দৈন্যদশা দেখে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন রাজ্য অ্যাডমিনিস্টেটর জেনারেল অ্যান্ড অফিসিয়াল ট্রাস্ট্রের তরফে বিচারক বিপ্লব রায়। তিনি নথিগুলি খুঁটিয়ে দেখেন। কীভাবে তা রক্ষা করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনাও শুরু করেন। তারপর কিছু নথির সুরক্ষারও ব্যবস্থা হয়। কিন্তু সে কাজ বেশিদূর এগয়নি। ফলে অমূল্য নথিগুলি ফের কাপড়বন্দি হয়ে পড়ে রইল ব্যাঙ্কশালের সেই নির্জন কক্ষেই। আদালতের আইনজীবী সংগঠনের দুই কর্তা শঙ্কর সেন ও প্রবীর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এই ফৌজদারি আদালতে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর বিচার হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক মামলার নথি যাতে সুরক্ষিত থাকে এবং কোর্ট চত্বরেই কোথাও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয় তা নিয়ে কলকাতা নগর দায়রা আদালতের মুখ্য বিচারক সুকুমার রায়ের কাছে দরবার করব।’ অনেকের বক্তব্য, এই কাজ হলে স্বাধীনতা আন্দোলনে অনেক না জানা ইতিহাস নতুন করে সামনে আসবে। যা ইতিহাসের অমূল্য দলিল হিসেবে থেকে যাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
গবেষকরা জানান, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে গিয়ে বঙ্গের বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী পড়েছিল রাজরোষে। আবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে কলম ধরে বহু পত্র‑পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত করেও দমিয়ে রাখা যায়নি বিপ্লবীদের। সে কারণে পত্রিকা প্রকাশ ও ইংরেজের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় ব্রিটিশ পুলিস একাধিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় জড়িয়ে দেয় স্বাধীনতাপ্রেমী লেখক‑কবি ও বিপ্লবীদের। নানা ষড়যন্ত্র করে সাজা খাটানোর ব্যবস্থাও করে। মামলায় কারও আর্থিক জরিমানা হয়। কারও জেল। সহ্য করতে হতো মানসিক নির্যাতন। সেই বিস্তারিত বিবরণই রয়েছে ব্যাঙ্কশালের নথিগুলিতে।