


সোহম কর, কলকাতা: মিছিলের সময় ছিল দুপুর আড়াইটে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সময়ের তোয়াক্কা করেননি ‘জেন-জি’রা। শিয়ালদহ চত্বরে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আন্দোলনকারীরা ভিড় জমিয়েছিলেন। বেলা বাড়তেই শিয়ালদহ স্টেশন মানুষের কালো মাথায় ভরতি হয়ে যায়। কে মিছিল ডেকেছে, কারা ডেকেছে, কারা থাকবে, জেন-জি এসবেরও তোয়াক্কা করে না। তাঁদের হাতে শুধুই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানদের বিরুদ্ধে স্লোগান। বাম ছাত্রসংগঠনগুলো মিছিলের ডাক দিয়েছিল, সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি। তিনটের একটু পরে মিছিল তার নিজের চলনেই এগতে থাকে। কে নেতা, কে স্লোগান দিচ্ছে, জেন-জি তারও পরোয়া করে না। নিজের স্লোগানে, নিজের চলনে মিছিল নিয়ে এগিয়েছে তারা। প্রতিবাদে-বিক্ষোভে দখল হয়েছে কলকাতা।
ককরোচের মিছিলে স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান, হাল্ক, ডালির মাস্ক পরে তরুণ-তরুণীরা এসেছিলেন। তাঁদের হাতে রাখা পোস্টারে ধরা পড়েছে নতুন স্লোগান। কলকাতার রাস্তায় আন্দোলনের এমন ভাষার পোস্টার এর আগে কি দেখা গিয়েছে? এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল মিছিলে। এই যাত্রাপথে চলেনি গণসঙ্গীত। তার জায়গা নিয়েছিল আধুনিক হিন্দি প্রতিরোধের গান। সেই গানের সঙ্গে উদ্দাম নৃত্যও। তবে সব স্লোগান গিয়ে মিশেছিল একই গন্তব্যে—‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই’। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবি তোলা এই মিছিলে কখনো শোনা গেল, ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনের দাবি। কখনো উই ওয়ান্ট জাস্টিস। মিছিলে কত লোক হয়েছে? এই প্রশ্নটাই মিছিলের পথে অবান্তর ছিল। কারণ, হিসাবেরও তোয়াক্কা করে না জেন-জি। কিন্তু মিছিল যখন ধর্মতলায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ‘বিখ্যাত হওয়া’ মেলোডি ছড়াচ্ছে, সেই জনস্রোতের শেষ তখন মৌলালিতে। তালতলায় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলে গেলেন, ‘এই দৃশ্য কখনো দেখিনি। এক ঘণ্টা ধরে মিছিল যাচ্ছে।’ মৌলালি মোড়ে এক বর্ষীয়ান বাম নেতা মিছিল দেখতে এসেছিলেন। প্রবল ঠেলাঠেলিতে রসিকতা করে বললেন, ‘আমি বরং পার্টি অফিসেই যাই।’ তার মাঝে রাস্তায় কয়েকজনকে দেখা গেল, ঠান্ডা পানীয় এনে আন্দোলনকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত একই ইস্যুতে কংগ্রেসের ছাত্র-যুবরাও মিছিল করেন। তবে এই মিছিল শুধুই জেন জি-র নয়। তাঁদের শিক্ষক-শিক্ষিকা, বাবা-মা, সকলেই যেন শামিল... প্রতিবাদে।
এদিন বিকালবেলার ধর্মতলা ছিল আন্দোলনকারীদের মুক্তাঞ্চল। যেন ‘আমরা সবাই রাজা’র দেশ। পুলিশ সংযত। কিন্তু একটু হলেও তাল কাটল। ‘অপছন্দের সংবাদমাধ্যম’কে আন্দোলনকারীরা হেনস্তা করলেন। প্রতিবাদীদের একাংশ জুতো, জল ভরতি বোতল, লাঠি ছুড়তে শুরু করলেন। সাংবাদিকরা রক্তাক্ত হলেন। পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে গেল। আহত কয়েকজন আন্দোলনকারীও। পরে সংখ্যা পাতলা হলে, ধর্মতলার একাংশ প্রায় ঘণ্টা তিনেক পর যান চলাচলের জন্য ছাড়া হয়। প্রতিবাদীরা রানি রাসমণি রোডে অবস্থান করেন। তবে বাম ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের মাথা ফেটেছে। সে হাসপাতালে ভরতি।
রাত পর্যন্ত অবস্থান চলে। নেতৃত্বরা বলেন, আন্দোলন চলবে। প্রশ্ন থেকে যায়, আর জি করের পথেই কি আরও একটা আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করছে কলকাতা?