


কাঠমাণ্ডু ও নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘কাল থেকে এক-একটা ফোন আসছে, আর আমার বুকটা কেঁপে উঠছে। কেন যে একা গেল লোকটা?’ টিভি সকাল থেকেই তারস্বরে চলছে। মোবাইলে খোলা ফেসবুক। সামনে সোফায় বসে রয়েছেন প্রৌঢ়া গায়ত্রী হাওলাদার। ঘুম না হওয়া দু’চোখ সমানে খুঁজে চলেছে নিখোঁজ স্বামীর খবর। প্রবল উৎকণ্ঠার ছাপ গোটা ফ্ল্যাটেই। ২ জি, মে রোড— কলকাতার বেহালায় পর্ণশ্রী পল্লির আবাসনটি বুধবার সন্ধ্যা থেকেই পাড়া-প্রতিবেশীদের আলোচনার কেন্দ্রে। এই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা রণজিৎ কুমার হাওলাদার (৬৩) গত ২১ আগস্ট এক ট্যুর এজেন্সির সঙ্গে রওনা হয়েছিলেন মানসরোবর যাত্রায়। উত্তর নেপালে ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান বিপর্যয়ের দিন ঘটনাস্থলেই ছিলেন তিনি। এরপর চব্বিশ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ৪০০ জন। রাস্তায়, দাঁত বের করা বাড়িঘরের গায়ে কাদামাথা নিথর দেহের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড (এনটিবি) জানিয়েছে, ৫৯০ জন পর্যটক সহ প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ। এঁদের মধ্যে ৫৯০ জন পর্যটক। ৪৭৬ জনই বিদেশি। আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া সহ প্রায় ৩০টি দেশের মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। সেই তালিকায় ভারতীয় ২৮৮ জন। মাত্র তিন বছর আগে কলকাতা মেট্রোরেলের চাকরি থেকে অবসর নেওয়া, শিবভক্ত রণজিৎবাবুর নামও রয়েছে সেই লিস্টে। পর্ণশ্রী থানা, নবান্নের তরফে যোগাযোগ করা হয়েছে গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে। বৃহস্পতিবার দুশ্চিন্তার স্বরে তিনি বলছিলেন, ‘টিভি, মোবাইলে নেপালের যা ছবি দেখছি, তাতে আরও ভয় লাগছে। মানুষটা কোনোভাবে ফিরে আসুক এটাই এখন ভগবানের কাছে একমাত্র প্রার্থনা।’ বাঁশদ্রোণীর রীনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে এদিন ছিল উদ্বিগ্ন আত্মীয়দের ভিড়। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী অবিবাহিত বোনের খোঁজ পেতে অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে দিদির। পুরানো বাড়ির দোতলায় বসে নিরাশ গলায় বলছিলেন, ‘এমনটা কখনো হয়নি।’ প্রয়াত প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায়ও একইদিনে মানসরোবর যাত্রায় গিয়ে নিখোঁজ। স্বামী তথা প্রাক্তন বিধায়ক শুভ্রাংশু রায় জানালেন, ‘আমার স্ত্রী একাই গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ওঁর সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করা যায়নি।’ অপেক্ষার পালা দীর্ঘ হচ্ছে সোনারপুরের সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রা কুণ্ডু, ডায়মন্ডহারবারের শিক্ষিকা কেয়া প্রামাণিকের পরিবারেরও। বারুইপুরের অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মী নিখিল রঞ্জন বিশ্বাস, স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা শিখা বিশ্বাস দু’জনেই নিখোঁজ। বাড়ি এখন তালাবন্ধ। মঙ্গলবার বাড়িতে শেষ ফোন এসেছিল হাওড়া আন্দুলের বাসিন্দা ৬৮ বছর বয়সি অনিতা দাসের। তারপর থেকেই সুইচড অফ। ছেলে অর্জুন-পুত্রবধূ মধুমিতা গতকাল থেকেই ফোন ঘুরিয়ে যাচ্ছেন থানা, ভবানী ভবন, নেপালের ভারতীয় দূতাবাসে।
কলকাতায় যখন উৎকণ্ঠার মেঘ, হাজার কিলোমিটার দূরে উত্তর নেপালের রাসুয়া, ধাদিং জেলায় তখন শোক, কান্না আর হাহাকার মিশে গিয়েছে কাদায় হারিয়ে যাওয়া রাস্তায়। এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতাল, এক মর্গ থেকে আর এক মর্গে হন্যে হয়ে ঘুরছেন স্বজনহারা মানুষ। মহারাজগঞ্জের ত্রিভুবনদাস ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালের সামনে ভিড় জমিয়েছেন কয়েকশো মানুষ। হাসপাতালের বাইরে ঝুলছে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃতদের ছবি। আর তা দেখে একাটানা হাহাকারে পরিবেশ ক্রমশ ভারী হয়ে উঠেছে। কাঠমাণ্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারের বাইরে শ্যালকের খোঁজে হাজির এক ব্যক্তি চিৎকার করে যাচ্ছেন, ‘সর্বত্র খুঁজে বেড়াচ্ছি। কোথাও কোনো তথ্য পাচ্ছি না। এই দেখুন আমার শ্যালকের ছবি। খুঁজে দিন প্লিজ!’ ভোটেকোশী নদীর জলধারা মিশেছে ত্রিশূলী নদীতে। বহু দেহ ভেসে এসেছে সেই স্রোত বেয়ে। ত্রিশূলী এবং নারায়ণী নদী থেকে উদ্ধার দেহগুলি রাখা হয়েছে চিতওয়ানের ভরতপুর হাসপাতালে।
বৃহস্পতিবার চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সংস্থা সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের জিরিয়ং কাউন্টিতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ৫৫৮ জন। এঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি।