


বাংলা ক্যালেন্ডারে বছরের শেষ মাস চৈত্র। গ্রামবাংলার আপামর মানুষের কাছে চৈত্র মানে গাজনের মাস। চড়ক উৎসবের ধুম। সেই সময় বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা মেতে ওঠে চৈত পরবে। ওড়িশার কোরাপুট, মালকানগিরি, কালাহান্ডি, কন্ধমাল, সুন্দরগড় প্রভৃতি এলাকায় মহা সমারোহে আজও পালিত হয়ে আসছে আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী লোক উৎসব। গোটা চৈত্র মাসজুড়েই চৈত পরবের আয়োজন চলে। আদিবাসী মানুষজন এই মাসের গোড়া থেকেই শুরু করে দেন প্রস্তুতি। ঘরবাড়ি সাফসুতরো করে রঙিন আলপনায় সাজিয়ে তোলা হয়। বাঙ্ময় হয়ে ওঠে জঙ্গলে ঘেরা আদিবাসী গ্রামের প্রতিটি দেওয়াল। বাড়িতে বাড়িতে চলে নানা ধরনের খাবারের আয়োজন। আত্মীয়-পরিজনদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে গোটা চৈত্র মাসে।
মাঠ থেকে ফসল তোলার পর শুরু হয় চৈত পরবের আবাহন। এই পরবে মূলত উৎপাদিত ফসলের জন্য প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রকৃতির সন্তানরা। চৈত্র মাস শুরু হলে আদিবাসী পুরুষরা কেউ আর চাষের জমির দিকে যান না। সেখানকার মাটিতে হাত পর্যন্ত দেন না। সকাল থেকে গ্রামের পুরুষরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েন জঙ্গলে শিকার করতে। আর মহিলারা বাড়িতে রান্নাবান্না করে অপেক্ষা করতে থাকেন, কখন ঘরে ফিররে ঘরের লোক। সন্ধ্যা নামার আগে শিকার ঝুলিয়ে ঘরে ফেরে যুবকরা। তারপর একসঙ্গে চলে পানাহার, নাচগান। ধামসা-মাদলের তালে নেচে ওঠে কোরাপুট, কেওনঝড়, কন্ধমালের পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা ছোট ছোট আদিবাসী গ্রামগুলি। কোথাও কোথাও ছাগল, মোরগ বলি দেওয়ার রীতিও রয়েছে। প্রকৃতি-পূজার কিছু আচার-উপাচার তো আছেই। স্থানভেদে ও বিভিন্ন জনজাতির ক্ষেত্রে সেসব কিছুটা বদলে যায়। কিন্তু যা সর্বত্র একই, তা হল— রাতভর নাচগান। ডিজে বক্সের পিলে চমকানো বিনোদন নয়, ধামসা-মাদল-বাঁশির সুরে-তালে দুলে ওঠে আদিবাসী পরগনা। সুদূর প্রবাসে কাজ করতে যাওয়া যুবক বা শহরে পড়তে যাওয়া তরুণী গ্রামে ফেরে। নতুন ফসলের আনন্দে যে খুশির বন্যা বয়ে যায় রুখাশুখা এই ভূমিতে, মাসভর তারই উদযাপন চলে চৈত পরবে।