


বেদসংহিতা ভারতবর্ষের ধর্ম্ম সভ্যতা ও অধ্যাত্মজ্ঞানের সনাতন উৎস। কিন্তু এই উৎসের মূল অগম্য পর্ব্বতের গুহায় নিলীন, তাহার প্রথম স্রোতও অতি প্রাচীন ঘনকণ্টকময় অরণ্যে পুষ্পিত বৃক্ষলতা ও গুল্মের বিচিত্র (আবরণে) আবৃত। বেদ রহস্যময়। ভাষা, কথার ভঙ্গী, চিন্তার গতি অন্য যুগের সৃষ্টি, অন্য ধরনের মনুষ্যবুদ্ধিসম্ভূত। এক পক্ষে অতি সরল, যেন নির্ম্মল সবেগ পর্ব্বতনদীর প্রবাহ, অথচ এই চিন্তাপ্রণালী আমাদের এমনই জটিল বোধ হয়, এই ভাষার অর্থ এমনই সন্ধিগ্ধ যে মূল চিন্তা ও ছত্রে ছত্রে ব্যবহৃত সামান্য কথাও লইয়া প্রাচীনকাল হইতে তর্ক ও মতভেদ চলিয়া আসিতেছে। পরমপণ্ডিত সায়নাচার্যের টীকা পড়িয়া মনে এই ধারণা উৎপন্ন হয় যে বেদের কখনই কোনও সংলগ্ন অর্থ ছিল না, নয় যাহা ছিল তাহা বেদের পরবর্ত্তী ব্রাহ্মণরচনার অনেক আগে সর্ব্বগ্রাসী কালের অতল বিস্মৃতি-সাগরে নিমগ্ন হইয়াছিল। সায়ন বেদের অর্থ করিতে গিয়া মহা বিভ্রাটে পড়িয়াছেন। যেন (কেহ) এই ঘোর অন্ধকারে মিথ্যা আলোকের পিছনে দাঁড়াইয়া বার বার আছাড় খায়, গর্ত্তে পঙ্কে ময়লা জলে পড়ে, হয়রান হইয়া যায়, অথচ ছাড়িতেও পারে না।
আর্য্যধর্ম্মের আসল পুস্তক, অর্থ করিতেই হয়, কিন্তু এমন হেঁয়ালির কথা, এমন রহস্যময় নানা নিগূঢ় চিন্তার জড়িত সংশ্লেষণ যে সহস্র স্থলে অর্থই করা হয় না, যেখানে কোনও রকমেই অর্থ হয় সেখানেও প্রায়ই সন্দেহের ছায়া আসিয়া পড়ে। এই সঙ্কট অনেক বার সায়ন নিরাশ হইয়া ঋষিদের মুখে এমন ব্যাকরণের বিরোধী ভাষা, এমন কুটিশ জড়িত ভগ্ন বাক্যরচনা, এমন বিক্ষিপ্ত অসংলগ্ন চিন্তা আরোপ করিয়াছেন যে তাঁহার টীকা পড়িয়া এই ভাষা ও চিন্তাকে আর্য্য না বলিয়া বর্ব্বরের বা উন্মত্তের প্রলাপ বলিতে প্রবৃত্তি হয়। সায়নের দোষ নাই। প্রাচীন নিরুক্তকার যাস্কও তদ্রূপ বিভ্রাট করিয়াছেন আর যাস্কের অনেক পূর্ব্ববর্ত্তী ব্রাহ্মণকারও বেদের সরল অর্থ না পাইয়া কল্পনার সাহায্যে mythopoeic faculty-র আশ্রয়ে দুরূহ ঋষগুলির ব্যাখ্যা করিবার বিফল চেষ্টা করিয়াছেন। ঐতিহাসিকেরা এই প্রণালী অনুসরণ করিয়া নানান কল্পিত ইতিহাসের আড়ম্বরে বেদের সুকৃত সরল অর্থ বিকৃত ও জটিল করিয়া ফেলিয়াছেন। একটি উদাহরণে এই অর্থ-বিকৃতির ধরণ ও মাত্রা বোঝা যাইবে। পঞ্চম মণ্ডলের দ্বিতীয় সুক্তে অগ্নির নিষ্পেষিত বা ছাপান (গুণ্ঠিত) অবস্থা আর অতিবিলম্বে তাহার বৃহৎ প্রকাশের কথা আছে। কুমারং মাতা যুবতিঃ সমুব্ধং গুহা বিভর্ত্তি ন দদাতি পিত্রে।...কমেতং ত্বং যুবতে কুমারং পেষী বিভর্ষি মহিষী জজান। পূর্বীহি গর্ভঃ শরদো বর্ব্ধহপশ্যং জাতং যদসূত মাতা। শ্রীঅরবিন্দের ‘‘বিবিধ রচনা’’ থেকে