


ঘটনাবহুল জীবন। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। বহু ঘটনা হারিয়ে যায় মুহূর্তের ভিড়ে। কোনও ঘটনা উঠে আসে শিরোনাম হয়ে। আর তার মধ্যে কিছু রেখে যায় দাগ। রক্তের দাগ। এমনই সাড়া ফেলে দেওয়া কয়েকটি ঘটনা ফিরে দেখল বর্তমান। সোহম করের কলমে।
ব্যবসায়ীর মেয়েকে অপহরণ করলে মোটা টাকা কামানো যাবে—এই ভাবনাটা মাথায় গেঁথে গিয়েছিল গুঞ্জনের। তাই শুরু হয় প্ল্যানিং। হুড়োহুড়ি চলবে না। ঠান্ডা মাথায় সবটা সারতে হবে। মাস খানেক আগেই টার্গেট ফিক্স করে ফেলল গুঞ্জন। রোমা ঝাওয়ার। সল্টলেকের ব্যবসায়ীর মেয়ে। বছর ২৫ বয়স। শুরু হল ‘ফলো’ করা। কোন কলেজে পড়ে? সকালে কখন বেরয়? কখন ফেরে? কীসে যায়? সঙ্গে কে থাকে? মাসখানেক ধরে একে একে সব প্রশ্নের উত্তর সাজিয়ে ফেলেছিল গুঞ্জন। বাহন মোটরসাইকেলে চেপে। এমনকী ‘স্মার্ট’ ছেলেটি নিজের লোক বানিয়ে নিয়েছিল বাড়ির দারোয়ানকেও। কাহিনি অবশ্য এখানেই শেষ হল না। অপহরণের অন্তরালে কি লুকানো ছিল অন্য কিছু? প্রশ্ন উঠল এজলাসে।
একে একে বিভিন্ন অভিযুক্তের বাড়ি থেকে টাকা উদ্ধার হচ্ছে। গুঞ্জনের আইনজীবী আদালতে বললেন, এটা কোনও অপহরণই নয়। রোমা আর গুঞ্জন প্রিয় বন্ধু। রোমা স্বেচ্ছায় গিয়েছেন এবং ফিরে এসেছেন। গুঞ্জনকে নাকি রোমা গাড়িতে উঠে চকোলেট খাইয়েছেন। এমনকী গুঞ্জনের স্ত্রী রুমেলাও তাদের বন্ধুত্বের কথা বলেন। তখন মোট ১৬ লক্ষ ৪০ হাজার উদ্ধার হয়েছে। গুঞ্জনের মায়ের ফ্ল্যাট থেকে সাড়ে ৮ লক্ষ উদ্ধার হল। বাকি টাকা ফুলবাগানের বাসিন্দা পাপ্পুর বাড়ি থেকে। পুলিস কিন্তু তখনও স্বীকার করছে না যে, মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছে।
এবার অপহরণের কাহিনি একটু দূরে থাক। পুলিস যখন এসব নিয়ে ব্যস্ত, সেই সময় রক্ত ঝরেছে শহরের বুকে। এই ক’দিন পুলিস গুঞ্জনের দুই শাগরেদ পাপ্পু ও অরবিন্দ প্রসাদকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মুম্বই, বিহার কোথাও বাকি রাখেনি। অপহরণের ৯ দিনের মাথায় পুলিস জানতে পারে, অরবিন্দ প্রসাদকে গুঞ্জনই গুলি করে হত্যা করেছে। মুক্তিপণের বখরা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল তাদের মধ্যে। তারপর বাইপাসের ধারে পরমা আইল্যান্ডের কাছে অরবিন্দের দেহ ফেলে দেয় গুঞ্জনরা। সেকথা ‘সোর্স’ মারফত্ জানতে পারে পুলিস। যদিও গুঞ্জন জানিয়েছিল, পাপ্পু খুন করে অরবিন্দকে। পরে গুঞ্জনের বিরুদ্ধে এক ট্যাক্সিচালককে খুনের মামলাও শুরু করে পুলিস। মিঠুন কোলে নামে আরও এক ব্যক্তির খুনের মামলাও শুরু হয়েছিল গুঞ্জনের বিরুদ্ধে।
বারাসত সেশন কোর্ট গুঞ্জন সহ সাতজনকে দোষী সাব্যস্ত করে। সেই দিনটাও ছিল শনিবার। বিচারক সমরেশ প্রসাদ চৌধুরী যখন গুঞ্জনকে দোষী সাব্যস্ত করলেন, গুঞ্জন নির্বিকার। তার উপর যেন কোনও প্রভাবই পড়ছে না! দামোদর ও দশরথ বেকসুর খালাস হয়ে যায়। আর পাপ্পু যাদব আজও অধরা। বছর চারেক আগে অরবিন্দ হত্যায় গুঞ্জন সহ দীনেশ যাদব, মুকেশ সিং ও মুন্না সিংয়ের যাবজ্জীবন সাজা হয়।
রোমা টিআই প্যারেডের সময় গুঞ্জনকে চিনতে নাকি ২ মিনিটও সময় নেননি। শুধু গুড্ডুকে চিনতে পারেননি তিনি। গুঞ্জনের স্মর্টনেস (পড়তে হবে ওভার স্মার্টনেস) আদালত চত্বরে নাকি ঠিকরে বের হতো। গুঞ্জন এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্সি জেলে। কয়েক বছর আগে তার কাছ থেকে স্মার্টফোন উদ্ধার হয়েছিল। সেই স্মার্টনেস যে এখনও কমেনি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাপ্পুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন নাকি? কে জানে!