


অভিষেক পাল, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদ জেলায় এবার ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। গত বারের থেকে প্রায় চার হাজার হেক্টর বেড়েছে চাষের এলাকা। আর্সেনিক প্রবণ জেলায় ভূগর্ভের জল সেচের কাজে ব্যবহার করায় চাষ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কান্দি মহকুমায় সব থেকে বেশি বোরো চাষ হয়েছে বলেই জানিয়েছে কৃষিদপ্তর। জেলার উপ কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) মোহনলাল কুমার বলেন, এবছর ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছে চাষিরা। গতবারের থেকে বেশ কিছুটা বেড়েছে চাষের এলাকা। চিন্তার কারণ হল, যত বেশি জমিতে চাষ হবে তত ভূগর্ভ থেকে জল তোলা বাড়বে। আর ভূগর্ভের জল যত বেশি তোলা হবে ততই বাড়বে আর্সেনিক দূষণ। যা কখনও প্রাণঘাতী হতে পারে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ’-এর ডিরেক্টর ডক্টর তড়িৎ রায়চৌধুরী বলেন, লাগাতার ভূগর্ভের জল তুললে আর্সেনিক দূষণ বাড়ে। গরমকালে যে ধান চাষ হয় তা একেশো শতাংশ সেচের জলেই হয়। প্রায় সবটাই মাটির নীচ থেকে তোলা হয়। ধানের বীজতলা তৈরি থেকে ফসল পাকা পর্যন্ত প্রায় চারমাস সময় লাগে। তারমধ্যে ৬৫-৭০ শতাংশ সময় ধানের গোড়া থাকে জলের তলায়। সেই জল যদি আর্সেনিকযুক্ত হয় তবে সেই বিষ ধানে প্রবেশ করে। ফলে চালের মাধ্যমে আর্সেনিক প্রবেশ করে মানুষের শরীরে।
ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ ধান রোপণ শেষ হয়েছে। লাগাতার তাপমাত্রা বাড়ছে গোটা জেলায়। জল সেচের উপর নির্ভর করে চাষিরা ধান গাছ বাঁচিয়ে রেখেছে। লাগাতার ভূগর্ভের জল ব্যবহার করেই প্রধানত বোরো চাষ হয়। যার ফলে জেলায় আর্সেনিক সমস্যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে বলেই আশঙ্কা। কৃষিদপ্তরের তরফে চাষিদের সচেতন করা হলেও বোরো ধান চাষে আগ্রহ কিছুতেই কমছে না। গতবছর এই জেলায় ৮২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল।
গত বছর অতিবৃষ্টির জেরে কান্দি মহকুমায় বোরো ধান চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। যদিও শস্যবিমায় অধিকাংশ চাষিই ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। সেজন্যই এবার অনেকেই আগেভাগে ধান লাগিয়ে ফেলেছে। দ্রুত ফসল ফলিয়ে ঘরে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। ধান চাষি গোলাম শেখ বলেন, এক মাস হল বোরো ধান চাষ করেছি। জল দিয়ে ধানের চারা বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। আগাম ঝড়বৃষ্টি না হলে ভালোই ফলন হবে আশা করছি। খুব তাড়াতাড়ি ফসল তুলে ফেলতে পারব। জীবন্তির ধান চাষি রমেশ দাস বলেন, গত বছর আমি আগেভাগে ফসল তুলে ফেলতে পেরেছিলাম। যে কারণে অতিবৃষ্টিতে সেভাবে ক্ষতি হয়নি। তবে এ বছর যেভাবে গরম পড়ছে তাতে জল সেচ নিয়ে একটু চিন্তা রয়েছে। লাগাতার জল সেচ দিয়ে ধান বাঁচিয়ে রেখে যদি ফসল ওঠার মুখে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতি হয়, তাহলে সত্যি খুব সমস্যা হয়। তাই যতটা আগে ফসল ঘরে তোলা যায় সেই চেষ্টা করি।
যারা জলদি চাষ করেছে তাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে কৃষি আধিকারিকরা। তাঁদের দাবি, ধান রোয়ার ছ’ সপ্তাহ পরে ব্যাকটেরিয়াজনিত ঝলসা রোগ দেখা যায়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও ঝিরঝিরে বৃষ্টি, বেশি মাত্রায় নাইট্রোজেন সার, অত্যধিক আপেক্ষিক আর্দ্রতা, ভিজে পাতা, ক্ষতিগ্রস্ত চারা এবং জমিতে জলের গভীরতা বেশি থাকলে এই রোগের প্রকোপ বেশি হয়। নাইট্রোজেন সার চাপান হিসেবে দু’-তিন ভাগে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া জীবাণুঘটিত সিউডোমোনাস ফ্লুরোসেন্ট ২-৩ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে স্প্রে করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়।