


নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী: অবারিত দানশীলতার কারণে জগতে যিনি ‘দানবীর কর্ণ’ নামে খ্যাত হয়েছিলেন, সেই কর্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকালে অর্জুনের হাতে মৃত্যুবরণ করার পর বীরের সদ্গতি লাভ করে স্বর্গে গেলেন। স্বর্গে তাঁর আগমনে এক বিরাট উৎসবের আয়োজন করা হল। তাঁকে পরম সমাদরে অভিনন্দন ও আবাহনে বরণ করে নিলেন দেবরাজ ইন্দ্র, মতান্তরে স্বয়ং ধর্মরাজ যম। কর্ণের সারাজীবনের পুণ্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর জন্য স্বর্গে চমৎকার সব আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু এক অদ্ভুত বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। স্বর্গলোকে তাঁকে যখন আপ্যায়ন করে খেতে দেওয়া হল, তখন তাঁর সামনে একটা চমৎকার সোনার থালা সাজিয়ে দেওয়া হল ঠিকই, কিন্তু সেই থালায় খাদ্য হিসেবে যা পরিবেশন করা হল, তা কোনো সুস্বাদু অন্ন বা ব্যঞ্জন নয়; বরং তা ছিল সম্পূর্ণ সোনার তৈরি নানা মূল্যবান অলংকার, বহুমূল্য হীরে-মোতি ও চুনি-পান্না।
স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের সামনে কর্ণ এই অদ্ভুত ও অভাবনীয় ব্যাপার দেখে অত্যন্ত বিরক্তি বোধ করেই জিজ্ঞাসু হয়ে উঠলেন। তিনি জানতে চাইলেন, কেন তাঁকে খাদ্যের পরিবর্তে এই মণিমাণিক্য দেওয়া হচ্ছে। তখন দেবরাজ তাঁকে বুঝিয়ে বললেন— দেখ বাছা! তুমি মর্তলোকে থাকার সময় আজীবন ব্রাহ্মণ এবং দরিদ্রদের দু’হাত ভরে অজস্র ধনরত্ন দান করেছ ঠিকই, কিন্তু সেখানে অন্নপান বা সাধারণ খাবার জিনিস তুমি কাউকেই সেভাবে কিছু দাওনি। সবচেয়ে বড়ো কথা, বিশেষত নিজের পিতৃ-মাতৃ-কুলের বা পূর্বপুরুষদের কারও উদ্দেশে তুমি কখনো এক গণ্ডুষ জল বা একটা পিণ্ড পর্যন্ত দাওনি। তুমি তাঁদের আত্মিক তৃপ্তির জন্য অন্নের সংস্থান করনি, ফলে আজ স্বর্গে তোমার নিজের খাবার থালায় শুধু সেই দামি জিনিসগুলোই ফিরে এসেছে, কোনো অন্নপান বা আহার্য বস্তু সেখানে নেই।
এই কথা শুনে কর্ণ কিছুটা বিষণ্ণ হয়ে বললেন—দেখুন, আমি তো আমার সারাজীবন ধরে জানতামই না যে, আমার প্রকৃত পিতা-মাতা কে বা কারা। আমি তো সারাজীবন এক সূতপুত্র হিসেবেই বড়ো হয়েছি—অধিরথ-সূতপুত্র রাধা-গর্ভজাত। আমার পিতৃপুরুষের তালিকাতেই বা কারা আছেন, সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা ছিল না। তাহলে সেখানে আমি কার উদ্দেশে এবং কাদের স্মরণ করে পিণ্ড দিতাম? কর্ণের এই অকাট্য যুক্তিতে ইন্দ্র সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বললেন— বেশ তো, এখন তো মৃত্যুর পর তোমার সামনে সমস্ত সত্য উন্মোচিত হয়েছে, তুমি এখন সব জানো। আর তুমি যেহেতু এত বড়ো দানবীর এবং পুণ্যবান, তাই বিশেষ বিবেচনা করে তোমাকে আমরা পনেরো দিনের জন্য পুনরায় মর্তলোকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। এই পনেরো দিনের জন্য ধরণীতে ফিরে গিয়ে তুমি এই প্রতিপদ থেকে মহালয়া অমাবস্যা পর্যন্ত সময় ধরে তোমার সেই অজানা পিতৃপুরুষের উদ্দেশে মনপ্রাণ ভরে অন্ন-জল দাও। তারপর মহালয়ার অমাবস্যা কাটলেই তুমি স্বর্গে ফিরে এসো, তখন এখানেও তোমার জন্য অন্নের সুব্যবস্থা হবে।
এই আদেশের পর কর্ণ আবার ফিরলেন ধরণীতে। সেখানে টানা পনেরো দিন ধরে তিনি তাঁর পিতৃমাতৃগণের উদ্দেশে ভক্তিভরে শ্রাদ্ধ-তর্পণ করলেন। তারপর যখন সেই নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি স্বর্গে ফিরে গেলেন, তখন ইন্দ্র তাঁকে আশীর্বাদ করে বললেন—তোমার এই পিতৃমাতৃ কর্মের পনেরো দিন এখন থেকে মর্তলোকে ‘পিতৃপক্ষ’ বলে জগতে চিরকাল পরিচিত হবে এবং এখন থেকে তোমার পুণ্যময় বিশ্রাম-স্থান হোক এই পিতৃলোক।
জনশ্রুতি-পরম্পরায় বাহিত এই পৌরাণিক কাহিনিটি অত্যন্ত কৌতুকপ্রদ ও উদ্ভাবিত হলেও এর মধ্যে দিয়েই আমাদের সমাজে পিতৃপক্ষের তাৎপর্য এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি আমাদের কর্তব্যের এক গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে।
এই পিতৃপক্ষের ধারণা এবং পিতৃলোকের অন্তনির্হিত মাহাত্ম্য বুঝতে গেলে আমাদের জীবন, মৃত্যু ও দেহের নশ্বরতার দর্শনে একটু গভীরে যেতে হয়। যে শরীরটিকে আমরা আজীবন এত যত্ন করি, যে শরীর থেকে সদ্য সদ্য প্রাণ পাখিটি বেরিয়ে গেল, সেই প্রাণহীন শরীরের মতো বীভৎস বস্তু জগতে আর কিছু হতে পারে না। এখানে ‘বীভৎস’ বলতে ঠিক কুরূপ, কুৎসিত বা ঘৃণ্য কিছু বোঝানো হচ্ছে না। কিন্তু গভীরভাবে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এই যে শরীর— যেটি এই কয়েক মুহূর্ত আগেও চলমান, প্রাণবন্ত ও শব্দময় ছিল, হয়তো বৃদ্ধত্ব কিংবা অসুস্থতার কারণে কিছু ধীর বা স্পন্দমান ছিল, কিন্তু তবুও তিনি কথা বলতেন, হাসতেন, হাঁটতেন, ব্যস্ত হতেন অথবা কোনো বিপরীত ঘটনায় বিরক্ত হতেন, পূর্বকৃত কর্মের জন্য হয়তো বা অনুতপ্তও হতেন—সেই পরিচিত মানুষটির শরীর থেকে প্রাণ যেই বেরিয়ে গেল, অমনি কিন্তু আমাদের অবচেতন মনে এক তীব্র প্রত্যাহার এবং পরিহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।
সেই প্রাণহীন নিথর শরীরটা নিয়েই তাঁর সবচেয়ে কাছের আত্মজনেরাও আস্তে আস্তে কেমন নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। মন থেকে চাইলেও সকলেই কিন্তু সেই শব-শরীরকে পরিহার করতে আরম্ভ করেন। পূর্ববঙ্গের গ্রাম্য জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করলে মনে পড়ে, মৃত্যুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শবদেহ তুলে নিয়ে এসে মাটিতে শোয়ানো হত বাড়ির প্রাঙ্গণে বা তুলসীতলায়—মরলে দণ্ড দু-চার কান্নাকাটি শেষকালে দেয় গোবরছড়া। আর আধুনিক শহরের বহুতলের মধ্যেও শবদেহ নিয়ে বড়োজোর তিন-চার ঘণ্টার সংবেদন বা ক্রন্দন চলে। তারপরেই সময় যত এগতে থাকে, নিকট আত্মীয়-স্বজনও অত্যন্ত বাস্তবতার সঙ্গে উচ্চারণ করতে থাকেন—সাত ঘণ্টা হয়ে গেল, অপু এখনও বম্বে থেকে এসে পৌঁছতেই পারল না, কিন্তু ‘বডি’ তো আর ফেলে রাখা যাবে না।
লক্ষ করুন, এই এক মুহূর্ত আগে যাঁর হাত-পা সচল ছিল, যাঁর চক্ষু ছিল কারুণিক আশীর্বাদে ভরা, সেই শরীর এখন সম্পূর্ণ নিথর এবং নির্মমভাবে এক ধাক্কায় সেটা এখন শুধুই একটা ‘বডি’। আর প্রাণহীন অবস্থায় এই বডির মূল্য যেন ঠিক এখনই শেষ। সেটাকে ঘরের মধ্যেও আর বেশিক্ষণ রাখা যায় না। এমনকি সেই বডির সঙ্গে সংপৃক্ত বা শবস্পৃষ্ট হওয়া চাদর, বিছানা, বালিশ—এই সমস্ত জড় বস্তুর সঙ্গে সেই অচেন জড় ‘বডি’ একাকার হয়ে যায় এবং শেষ যাত্রায় শ্মশানভূমিতে দগ্ধ হওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
শ্মশানে চিতা দগ্ধ হওয়ার পর আগুনে পড়ে থাকে শুধু নাভিশেষ, যা সম্পূর্ণ দগ্ধ হয় না। মরদেহের এই শেষ অস্থিটুকু পর্যন্ত কেউ বাড়িতে নিয়ে আসে না, সেটাকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে তবেই কাজ শেষ হয়। তারপর সেই আগুনের উত্তাপ গায়ে মেখে, গঙ্গার জলে স্নান করে মানুষ বাড়ি ফিরে আসে। আর যিনি গঙ্গাস্নান করলেন না, তিনিও বাড়িতে এসে স্নান করেন এবং জামা-কাপড় সব ধুয়ে ফেলেন। ঘরে ঢোকার সময় আগুনের স্পর্শ আর নিমপাতা দাঁতে কাটার এক অদ্ভুত নিয়ম আমরা পালন করি। অর্থাৎ, যাকে শ্মশানে দিয়ে আসা হল, সেই মৃত মানুষটি মৃত বলেই যেন এক অশুদ্ধতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সর্বতোভাবে ঝেড়ে ফেলার এক সার্বিক চেষ্টা বা প্রক্রিয়া থাকে এর মধ্যে। সাময়িক তিক্ততার উপমায় নিমপাতা দাঁতে কেটে যেন সেই মৃত্যুকে অস্বীকার করার একটা চেষ্টা থাকে। এই মৃত মানুষও গলার কণ্ঠীটি পর্যন্ত খুলে ফেলে এমনভাবেই যেন সব বন্ধন মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন, যেটাকে বলা যায় প্রকৃষ্টভাবে চলে যাওয়া। প্র+ইত (গত)=প্রেত।
এখানে ‘প্রকৃষ্টভাবে’ শব্দটা ব্যবহার করার একটি বিশেষ কারণ আছে। আপনার আমার যে শরীরটাকে এতকাল আমরা প্রকৃষ্ট বলে জেনে এসেছি, যে শরীরকে মূল্য দিয়ে সারা জীবন এত সাজগোজ, এত কিছু করেছি—প্রাণ চলে গেলে সব ছেড়ে এইভাবে চলে যাওয়াটাই প্রকৃষ্টভাবে চলে যাওয়া—যেখানে একটুকু পিছুটান আর নেই, সংস্কৃতে সেই নিষ্পন্ন পদটি হল ‘প্রেত’। ‘প্র’ (প্রকৃষ্টভাবে) উপসর্গের সঙ্গে ইন ধাতু (যাওয়া) যুক্ত হয়ে এই পদ তৈরি। সাধারণ মানুষ এই প্রেত-শব্দের আসল অর্থই জানে না, তারা ভাবেন ভূত-প্রেত বুঝি। কিন্তু শ্রাদ্ধের সময় যখন বারবার প্রয়াত মানুষটির নামের সঙ্গে প্রেত কথাটা উচ্চারিত হতে থাকে, তখন শ্রাদ্ধকারীকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়—তিনি চলে গেছেন, সব ছেড়ে প্রকৃষ্টভাবে চলে গেছেন।
কিন্তু ভারতবর্ষ এমনই এক মধুর জায়গা যেখানে সব ছেড়ে চলে যাওয়া অত সহজ নয়। যিনি প্রকৃষ্টভাবে চলে গেলেন, তাঁকে আবার প্রকৃষ্টভাবে আমরা ধরেও রাখি—ধরে রাখি আমাদের স্মরণে, মননে ও তর্পণে। ভারতবর্ষে জীবিত ও মৃতের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক সেতু তৈরি হয়, পরলোকেও আমরা সেই সেতু তৈরি করি তাঁদের জন্য। ফলে তোমার যাওয়া তো নয় যাওয়া। আমাদের প্রাচীন শাস্ত্র বলেছে—প্রয়াত ব্যক্তির শ্মশান-কর্মের পরেই তাঁর একটা সূক্ষ্ম বায়বীয় শরীর তৈরি হয়। মৃত্যুর পরেও অন্তত বারো দিন নাকি সেই বায়বীয় শরীর আকাশস্থ নিরালম্ব অবস্থায় তার পূর্বতন গৃহ, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-স্বামী এমনকি তাঁর উদ্দেশে দেওয়া বস্তুপিণ্ডগুলিকেও দেখতে পায়। সেই জন্য সে তার বাড়ির আশপাশেই বায়বীয় শরীরে ঘোরা-ফেরা করে। তার মানে, তখনও এই মানুষটির প্রেত-ভাব তৈরি হয়নি প্রকৃষ্টভাবে চলে যাওয়াটা সম্পূর্ণ হয়নি, পুরাণ বলেছে, প্রয়াত জনের এই অস্থির ভাবটুকু প্রশমন করার দায় রয়েছে তাঁদেরই, যাঁদের সঙ্গে তিনি একসময় সারাজীবন কাটিয়েছেন। জীবিত সম্পর্কিত আত্মীয়দের উচিত বাড়ির কোথাও উঁচু একটি জায়গা দেখে একটি মৃৎপাত্রে খানিক জল রাখা। পুরোহিতরা জলের সঙ্গে খানিক দুধও রাখতে বলেছেন এবং মন্ত্র পড়ে সেই সূক্ষ্ম বায়বীয় শরীরের উদ্দেশে বলতে বলেছেন—তুমি শ্মশানের চিতাগ্নিতে কতই না জ্বালা-যন্ত্রণা ভোগ করেছ। সমস্ত আত্মীয়-স্বজনেরা তোমাকে শ্মশানে রেখে যে যার মতো চলে গেছে। তোমার ওই দগ্ধ শরীর জুড়োনোর জন্য এই জল দিলাম, খানিক দুধ দিলাম বললাভের জন্য। তুমি এখন এই অনন্ত আকাশের মধ্যে কোথাও আছ, অবলম্বনহীন এবং নিরাশ্রয়। তাই তুমি এই জল ও দুধ পান কর, স্নান কর এবং একটু সুখী হও— ‘ইদং নীরং ইদং ক্ষীরং স্নাত্বা পীত্বা সুখী ভব’।
শাস্ত্র বিধান দিয়েছে, শ্রাদ্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রতিদিন একটি করে পিণ্ড দিয়ে প্রয়াত প্রেত-পুরুষের একটি শরীর সৃষ্টি করতে হয়। সেই সূক্ষ্মশরীর নিয়েই সে প্রেতলোকে প্রবেশ করে। অবশেষে এক বছর পর যখন সপিণ্ডীকরণ শ্রাদ্ধ সম্পন্ন হয়, তখন প্রেতপুরুষ তাঁর পরম্পরাবাহিত স্বজাতীয় পিতৃগণের সঙ্গে মিলিত হন দিব্য পিতৃলোকে। ভারতীয় শাস্ত্র মতে, এই পিতৃলোক ব্যাপারটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি সম্পূর্ণ দেবলোক নয় বটে, কিন্তু প্রায় দৈবশক্তিসম্পন্ন এক অদ্ভুত অন্তরীক্ষ লোক।
এই পিতৃলোকের ধারণা করা হয়েছে একেবারে ঋগ্বেদের কাল থেকে। ঋগ্বেদ পিতৃ শব্দের বহুবচন ‘পিতরঃ’ শব্দটি ব্যবহার করে পিতৃলোকের কল্পনা করেছে। সেই পিতৃগণের মাহাত্ম্য এমনই যে, ঋগ্বেদে সেই পূর্বপুরুষেরা দেবতাদের সঙ্গে এক রথে আরোহণ করেন এবং একসঙ্গে হোম-দ্রব্যও গ্রহণ করেন। দেবতাদের সঙ্গে পিতাদের এই ওঠা-বসা বস্তুত প্রয়াত পিতৃগণকে একটি অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন দেবতা-প্রায় ক্ষমতায় ভূষিত করে।
অবশ্য ঋগ্বেদ একজন প্রয়াত মানুষের প্রেতদেহের কথা স্পষ্টভাবে বলে না। বৈদিক ধারণায় মৃত্যুর পরে পরেই বিদেহী আত্মায় পরিণত সূক্ষ্ম শরীর তার পূর্বপুরুষ পিতৃগণের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। মৃতজন আসন্ন মৃত্যুর পরেই পিতৃলোকে পূর্ব পিতা-পিতামহের সঙ্গে মিলিত হতে পারছে— অন্তত ঋগ্বেদ পিণ্ডদান এবং পিতৃগণের মধ্যে আর এক বছরের প্রেতলোকে দাঁড়িয়ে থাকার বিলম্বটুকু রাখেনি।
অন্যদিকে, আমাদের দেশের এসক্যাটোলজি বা পরলোকতত্ত্ব পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রয়াত হওয়ার পরেও তাঁদের অন্নপান যাতে ঠিক মতো চলে, তার জন্য জীবিত জনের অনেক দুশ্চিন্তা থাকে। সেই দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য দেবলোকের তলায় একটি পিতৃলোকের ব্যবস্থা করেছেন শাস্ত্রকারেরা। এই পিতৃলোকের দেখভালের ব্যবস্থা আবার স্বয়ং যমরাজের হাতে। ধারণা করা হয় যে, জীবিত জনের তিন প্রয়াত পুরুষদের তিনটি জেনারেশন এই পিতৃলোকে থাকেন, আর তাঁদের আগের জেনারেশনকে স্বর্গে পাঠিয়ে দেন যমরাজ।
এই পিতৃলোকে শুধু পুরুষরাই নন, প্রয়াত মাতা-মাতামহীরাও থাকেন। আমাদের প্রাচীন ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলি এবং উপনষিদ একজন পুরুষ বা একজন স্ত্রীলোককে কখনো একটা গোটা মানুষ ভাবেননি। বৃহদারণ্যক উপনিষদে মহাজ্ঞানী যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন— একটা পুরুষের শরীর হল অর্ধাংশ শূন্য শস্যবীজের বা দ্বিদল ডালের অর্ধেক দানার মতো। যে অর্ধাংশ ফাঁকা সেখানে স্ত্রী শরীর এলে তবেই না একটা গোটা মানুষ হয়—‘তস্মাদিদম্ অর্ধবৃগলমিব স্ব ইতি হ স্মাহ যাজ্ঞবল্ক্যঃ, তস্মাদয়মাকাশঃ স্ক্রিয়া পূর্য্যতে এব’। এই অর্ধেক আকাশ পূরণ করে স্ত্রীলোক, দুয়ে মিলে তবে একটা সম্পূর্ণ মানুষ। এই গভীর দার্শনিক ভাবনা থেকেই পিতা এবং মাতাকে একসঙ্গে দ্বিবচনে সংস্কৃত ভাষায় ‘পিতরৌ’ বলা হয়, যদিও প্রয়াত মানুষের আবাসিক স্থানটাকে একত্রে খানিক পিতৃতান্ত্রিকভাবেই পিতৃলোক বলা হয়েছে।
সদ্য প্রয়াত পিতা-মাতাদের উদ্দেশে আমরা যে শ্রাদ্ধ করি, তার এক বছর পর হয় সপিণ্ডীকরণ। আমাদের এক বছর পিতৃলোকের এক দিন। এইভাবে প্রতিটি বার্ষিক শ্রাদ্ধে আমরা তাঁদের আহার্যের ব্যবস্থা করে থাকি, আর তাঁরা পরম সুখে আশীর্বাদ করতে থাকেন।
কিন্তু বর্তমান যুগে উত্তরাধিকারীর সময়, সামর্থ্য এবং স্মৃতির বিড়ম্বনায় শ্রাদ্ধ কর্মটা যেহেতু আর সেভাবে করা হয়ে ওঠে না, তাই তর্পণ করার পথটা প্রশস্ত হয়ে উঠেছে খুব তাড়াতাড়ি। তর্পণ মানেই হল তৃপ্ত করা। আধুনিক যুগের ‘ফাদার্স ডে’ বা ‘মাদার্স ডে’ বেঁচে থাকা পিতা-মাতার জন্য হলেও আমাদের সমাজে মৃত্যুর পরেও পিতা-মাতাকে ভুলে না যাওয়ার যে সংস্কৃতি, তারই বহিঃপ্রকাশ এই তর্পণ।
প্রতিদিন নদী-পুষ্করিণীর জলে নেমে যে পূর্বপুরুষকে এক গণ্ডুষ জল দান করার বিধান ছিল, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় তা যখন আর সম্ভব হয় না, তখন সেই বাস্তব বুঝেই আমাদের শাস্ত্রকারেরা পুরো পনেরোটা দিন ধার্য করেছেন। এই পনেরো দিনের নামই পিতৃপক্ষ। আর যাঁরা এই পনেরো দিনের চোদ্দো দিনও তর্পণ করতে পারলেন না, তাঁদের জন্য চরমতম দিন বা শ্রেষ্ঠ তিথি হল মহালয়া। বছর কুড়ি আগেও কলকাতা হাইকোর্টে সমস্ত কর্মচারীদের জন্য নোটিশ পড়ত যে, যাঁরা ‘Tarpanist’ আছেন, তাঁরা এই চোদ্দো দিনের কোনো একটা সময় এক ঘণ্টা ছুটি পাবেন তর্পণ সেরে আসার জন্য অথবা এক ঘণ্টা দেরিতে অফিসে আসতে পারেন।
মহালয়ার গুরুত্ব নাকি এটাই যে, স্বয়ং ভগবান ব্রহ্মার নির্দেশে আমাদের প্রয়াত জনেরা—প্রয়াত পিতা-মাতারা সূক্ষ্ম দেহে নেমে আসেন মর্তভূমির পরিমণ্ডলে। সৃষ্টিকর্তার নির্দেশেই পিতৃমাতৃগণ বায়ুভূত নিরালম্ব অবস্থায় বংশধরদের ঘরের মধ্যেই প্রায় চলে আসেন করুণা করার জন্য। এইদিন অন্তরীক্ষে প্রয়াত পিতা-মাতাদের এই বিশাল বা মহান সমাবেশ, যাকে আমরা আলয় বা আবাস বলি, সেটা তৈরি হয় বলেই এই দিনটার নাম মহালয়া (মহা+আলয়)। তিথি শব্দটি স্ত্রী লিঙ্গ বলে তিথির বিশেষণ হিসেবে এটি মহালয়া বলে পরিচিত।
এই মহালয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার নিজের বহু অমূল্য স্মৃতি। পূর্ববঙ্গ থেকে যখন কলকাতায় এলাম, তখন দেখলাম— মহালয়ার দিনটা একটা সেলিব্রেশন। ব্যাপারটা আরও জমে উঠল যখন মহালয়ার আগের দিনই আমার খুড়তুতো দাদা আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের বাড়ির বড়ো রেডিয়োর একটা জালের অ্যান্টেনা ছাদে লাগাতে গেলেন। তিনি বললেন— কাল মহালয়া, ভোর চারটের সময় বীরেন্দ্রকৃষ্ণের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।
আমাদের কালীঘাটের বাড়িটা যেহেতু প্রায় গঙ্গার তীরেই ছিল, তাই পাড়ার অনেকেই চলে আসতেন মহালয়ার ভোরে। তর্পণের এই স্মার্ত বাধ্যবাধকতার মধ্যে হঠাৎই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সৌজন্যে শরৎ-শিউলির একটা উন্মাদনা চলে এল সকাল চারটের সময়। আমি আগেও মহালয়ার দিন দেখেছি, এখনও মহালয়ার দিন দেখি—রাত্রি দশটায় রেডিয়োর কাঁটাটিকে একেবারে ঠিক জায়গায় স্থাপন করে বারবার পরীক্ষা করে রাখা হত যাতে ভোর চারটের সময় একটা সেকেন্ডও বিফলে না যায়। টেবিল ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া হত যাতে ৩.৪৫-এ সকলে চোখ-মুখ ধুয়ে রেডিয়োর ধারে কাছে বসে পড়তে পারে। একজন বাঙালি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কী অসাধারণ জাদুবলে যে এক বিষাদগ্রস্ত তিথিকে উৎসবে পরিণত করতে পারেন, মহালয়া তার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ। তাঁর কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বাঙালির বিষাদ-তর্পণের দিন মহালয়াকে একটা অলৌকিক সন্ধিপর্বে পরিণত করেছে।
শাস্ত্রের মতে, পিতৃপক্ষের সঙ্গে দেবীপক্ষের কোনো আন্তরিক সম্বন্ধ নেই। পিতৃপক্ষের উপাদনা যেখানে শ্রাদ্ধ-তর্পণ, তিল-তুলসী-গঙ্গা, সেখানে দেবীপক্ষের উপাদান ঢাক-ঢোল-চাঁদমালা, নতুন জামা। কিন্তু এই দুই পক্ষের মধ্যে সন্ধি তৈরি করার কাজটা একেবারেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের। মুহূর্তের মধ্যে পিতৃপক্ষের শেষ দিন দুর্গাপুজোর প্রারম্ভিকে পরিণত হল। একবার আমার বাড়িওয়ালি বৃদ্ধাকে দেখেছিলাম, তিনি সকালে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার পরেই দুর্গতিনাশিনী দুর্গা বলে সমস্ত ঘরগুলিতে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিলেন। তিল-তুলসী-গঙ্গা পরিণত হল শরৎ-শিউলি-ঢাকে। দুর্গাপুজোর সঙ্গে এই পিতৃপক্ষের বাস্তব সম্পর্ক এইটুকুই যে, এই দিনেই দুর্গার মূর্তি-কারিগরেরা অনেকেই দুর্গামূর্তির চক্ষুদান করেন— হয়তো বা এই জন্যই যে মা জননী চোখ খুলেই দেখবেন তাঁর সন্তানেরা তাঁদের পিতা-মাতা বা পিতৃপুরুষকে ভোলেননি, মহালয়ার তর্পণ সেরেই তারা বিশ্বাত্মিকা জগজ্জননীর পুজো-আরাধনায় মন দেবে। পিতৃতান্ত্রিকতাকে পরের বছরের জন্য জমা করে দিয়ে মাতৃ আরাধনায় ব্রতী হবে।
কিন্তু মহালয়ার সবচেয়ে বড়ো দার্শনিক দিকটি অন্য জায়গায়। আমরা এতক্ষণ শুধু ভারতীয় ভাবনায় পিতৃপুরুষের মাহাত্ম্যটুকুই বোঝাতে চেয়েছি, যে মাহাত্ম্যটুকু পূর্ণভাবে যুক্ত হয়েছে মহালয়া তিথির সঙ্গে। মহালয়া পিতৃপক্ষের শেষ দিন হলেও এই দিনটি মাহাত্ম্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, এই দিন প্রয়াত জনের তর্পণ-কেন্দ্রখানি ব্যক্তিকেন্দ্র থেকে বিশ্বজনীন হয়ে পড়ে, আপন পরিবার থেকে সেটা সার্বজনীন চৈতন্যের হয়ে পড়ে। এই দিনে শুধু নিজের পিতা-মাতা, ভাই-বন্ধু নয়, এই দিনে সকল প্রয়াত আত্মার উদ্দেশে তর্পণ করা যায়। মন্ত্রের আরম্ভেই আমরা বলতে থাকি—যাঁরা সত্যিই আমার আত্মজন, পরিবার, কিংবা যাঁরা কোনোদিন আমার আত্মীয়-বন্ধু নন— যাঁরা এক পূর্বজন্মে ও অন্য জন্মে আমার বন্ধু বা অবান্ধব—‘যে অবান্ধবা বান্ধবা বা যে অন্য জন্মনি বান্ধবা’— তাঁরা সকলে আজকে আমার দেওয়া এই জলটুকু গ্রহণ করুন। সপ্তদ্বীপা বসুমতীতে সবাই আজকে এই মহালয়ার দিনে আমার পূর্ণাঞ্জলি জল পেয়ে তৃপ্ত হও—‘তৃপ্যন্তু ভুবন ত্রয়ম’। মহালয়ার এই উদার আহ্বান আমাদের ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে মুক্ত করে অনন্তের দিকে নিয়ে যায়। পিতৃপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে যে তর্পণ শুরু হয় মহালয়ার দিনে, সেটা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শোক এবং স্মরণের গণ্ডি পার হয়ে মানুষ যখন সমগ্র বিশ্বের সমস্ত অনাথ, নিরাশ্রয় এবং বিস্মৃত আত্মার মুক্তির জন্য অঞ্জলি প্রদান করে, তখনই মানবাত্মার প্রকৃত উত্তরণ ঘটে। অভাব থেকে পূর্ণতায়, সীমাবদ্ধতা থেকে অসীমে—যাকে বলে from privation to plenty—ব্যক্তি থেকে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার এই পরম লগ্নটাই হল মহালয়া।