


হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: আমার জন্ম দক্ষিণ কলকাতার মাতুলালয় হলেও আমার শৈশব কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে কলকাতা থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে রেল শহর কাঁচরাপাড়াতে। প্রথমে বাবার চাকরির সুবাদে রেল কোয়ার্টারে। তারপর আমার যখন বছর দশেক বয়স তখন আমরা রেল কোয়ার্টার ত্যাগ করে চলে যাই সে জায়গা থেকে মাইল পাঁচেক দূরে শহরের প্রান্ত সীমানায় এক পুরানো বাড়িতে। আমার চাকরিরত মধ্যবিত্ত বাবা-কাকা কিনেছিলেন সেই বাড়ি। কাঁচরাপাড়া পুরানো শহর হলেও যে স্থানে বাড়িটা কেনা হয়েছিল সে জায়গাকে এখন গ্রামই বলা ভালো। মাত্র কয়েকটা পাকা বাড়ি ছিল সেখানে। রাস্তাঘাট কাঁচা। সন্ধ্যাবেলায় কয়েকটা ল্যাম্পপোস্টে ম্যাড়ম্যাড়ে বাতি জ্বলত। ঘটনাচক্রে আমাদের বাড়িটা ছিল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার শেষ বাড়ি। তার পিছন থেকেই শুরু হচ্ছে বেশ অনেকটা অঞ্চল জুড়ে ছিন্নমূল উদ্বাস্তু কলোনি। ওপার বাংলা থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে যাঁরা এ বাংলায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই সব মানুষদের বসবাস। অধিকাংশই নিঃসম্বল মানুষ তাঁরা। কেউ ফেরিওয়ালা, কেউ পাটকলের মজুর, কারও বা ছোট্ট মুদির দোকান। এদেশে নিজেদের ডাল-ভাতের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানুষ করার জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। সেদিন আমাদের বাড়ির চারপাশে অনেক কিছু নেইয়ের মধ্যে অনেক কিছু ছিল। বাড়ির সামনে মাঠের মতো বেশ বড়ো জমি ছিল, গাছগাছালি ছিল, বাড়ির থেকে কিছুটা দূরেই একটা বিল ছিল। আর বিলের পাড়ের জমিতে কাশফুল ফুটত, আর তা দেখেই আমরা ছেলেবেলায় বুঝতে পারতাম দুগ্গাপুজো আসছে। তাছাড়া আমাদের বাড়ির সামনের ফাঁকা জমিতে একটা বড়ো শিউলি গাছও ছিল। সে-ই ধীরে ধীরে জানান দিত মহালয়া আসছে, পুজো আসছে। আর পুজো মানেই তো নতুন জুতো-জামা আর দেদার আনন্দ। মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারের অনুশাসন কিছুটা শিথিল হয়ে যেত সে সময়। আর তার সূচনা হত ওই মহালয়ার দিন থেকেই। মহালয়ার ধর্মীয় তাৎপর্য বোঝার মতো ক্ষমতা গ্রামের স্কুলে পড়া বারো-তেরো বছরে তখন আমাদের ছিল না। শুধু বুঝতাম মহালয়া মানেই আর কয়েকদিনের মধ্যেই স্কুল ছুটি পড়বে, এখন আর কিছুদিনের জন্য স্কুলে মাস্টারমশাইয়ের কানমলা থাকবে না, বাড়ির লোক উঠতে বসতে ‘পড়তে বস, পড়তে বস’ বলবে না, সূর্য ডোবার আগে বাড়িতে না ঢুকলে মায়ের পাখার বাড়ি পিঠে পড়বে না, সপ্তাহ দুইয়ের জন্য দেদার আনন্দ। কোমরে ক্যাপ বন্দুক গুজে এপাড়া ওপাড়ার পুজো মণ্ডপ ঘুরে ঠাকুর দেখা, ফুচকা, ঝালমুড়ি বা কোনো দিন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মোগলাই পরোটা খেতে যাওয়া। সে সময় স্কুলের টিফিনের পয়সা দেওয়া ছাড়া সাধারণত ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের হাতে পয়সা দেওয়া হত না। শুধু পুজোর কয়েকটা দিন এর ব্যতিক্রম ঘটল। সবার পকেটেই বাড়ি থেকে দেওয়া পাঁচ-দশ টাকা থাকত। সেই টাকা পকেটে নিয়ে পৃথিবীর যেকোনো মানুষের থেকেও ধনী আমরা তখন।
গ্রামীণ মফস্সলের রাতটাও সে সময় বেশ উত্তেজনাময় ছিল। আগের রাত বলতে যে রাতের শেষ লগ্নে মহালয়া শুরু হয় সেই রাত। পাড়ার ছোটো প্যান্ডেলগুলোতে কয়েকদিন আগেই বাঁশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। ত্রিপলও পড়ে গেছে। সেই প্যান্ডেল পাহারা দেওয়ার অছিলাতে সেখানে রাত জাগত পাড়ার কুড়ি-বাইশ বছর বয়সি দাদারা। আর তার সঙ্গে চলত ফিস্ট বা পিকনিক। প্যান্ডেল পাহারা দেওয়ার ব্যাপারটা আসলে ছিল অছিলা মাত্র। ওই ফিস্ট, রাতভর হুল্লোড় আর নানা ধরনের দুষ্টুমি করে রাত জেগে আনন্দ উপভোগ করাই ছিল আসল উদ্দেশ্য। অনেক গৃহস্থ বাড়ির কর্তারাই ও রাতে সজাগ থাকতেন। তবে তা শেষ রাতে উঠে রেডিয়োতে মহালয়া শুনবেন বলে নয়, বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য। যারা রাত জাগত পুজো প্যান্ডেলে তাদের মাথায় অনেক সময়ই নানান উদ্ভট দুষ্টুবুদ্ধি মাথা চাড়া দিত। কোনো বাড়ির লোক হয়তো চাঁদা দেবে বলে পাঁচদিন ধরে ঘোরাচ্ছেন। অথচ সে পয়সাওলা লোক। কেউ একজন হয়তো বলল ‘লোকটাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে।’ ব্যস পরিকল্পনা তৈরি হয়ে গেল। মাঝরাতে সে বাড়িতে গিয়ে তার খোলা বারান্দায় রাখা ফুলের টবগুলো উঠিয়ে এনে রেখে আসা হল দশটা বাড়ি পড়ে কোনো বাড়ির উঠোনে। আর গাছ থেকে নারকেল চুরির ঘটনা তো মহালয়ের রাতে হামেশাই ঘটত। তা অবশ্য খাবার জন্য নয়, যার গাছ থেকে নারকেল নামানো হয়েছে তার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। একই সঙ্গে উত্তেজনা আর মজা পাওয়ার জন্য। একবার মহালয়ার ভোরে আমাদের বাড়ির বারান্দায় একটা বেশ বড়োসড়ো ডাব পাওয়া গেল। আশপাশের বাড়িতেও একটা করে ডাব রেখে দেওয়া হয়েছে। একটু বেলা বাড়তে জানা গেল ওই ডাবগুলো আসলে পাড়াতে কৃপণ বলে পরিচিত এক ব্যক্তির বাড়ির ডাব। আরও একটা ব্যাপার ছিল মহালয়ার রাতে ফুল চুরি। যদিও তাকে ঠিক চুরি বলা যায় কি না জানি না। মহালয়ার ভোর রাতে হাতে ফুল পাড়ার লাঠি আর সাজি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন কিছু বৃদ্ধা বা বয়স্কা মহিলা। অন্যদের গাছ থেকে তারা টপাটপ ফুল পেড়ে নিজেদের সাজিতে ভরতেন। ডাব পাড়া ইত্যাদি ব্যাপার নিয়ে কোনো কোনো সময় মহালয়ার ভোরে পাড়ার মধ্যে মৃদু ঝগড়াঝাটি চিৎকার-চেঁচামেচিরও সৃষ্টি হত। কিন্তু সে অশান্তি বেশি দূর এগত না। পাড়ার বড়োরা সে সব অশান্তির নিষ্পত্তি ঘটাতেন দ্রুত। কারণ, আজ যে মহালয়া। মায়ের আগমন বার্তা ঘোষিত হচ্ছে। এসব দিনে কি ঝগড়া-অশান্তি করলে চলে। দেখা যেত ওইসব ঘটনাতে সকালবেলা যাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল একটু বেলা বাড়তেই তারা একসঙ্গে গঙ্গার উদ্দেশে রওনা হল তর্পণ করার জন্য। এক্ষেত্রে একটা কথা বলে রাখি, কৈশোর অতিক্রম করার পর যখন আমি মহালয়ার রাতে পুজো প্যান্ডেলে থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম এখনও আমিও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে ডাব চুরি, টব চুরি এধরনের দুঃস্পর্শে শামিল হয়েছি বেশ কয়েকবার। আর এসব কাজে আমাদের ইন্ধন জোগাতে আমাদের চাইতে আট-দশ বছর বয়সি বড়ো পাড়ার দাদারা। তারা একসময় মহালয়ের রাতে কী কী রোমাঞ্চকর কাণ্ড কারখানা ঘটাতেন সে সব গল্প আমাদের শোনাতেন। আর তা শুনে আমরাও উদ্দীপ্ত হয়ে নেমে পড়তাম ওই সব কাজে। পাড়ার অনেক দাদারাই তখন আমাদের চোখে হিরো। আমরাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে হিরো হওয়ার চেষ্টা করতাম। তাছাড়া, ওইসব কাজের মধ্যে একটা অ্যাডভেঞ্চারের ব্যাপারও ছিল। তাছাড়া আমরা অনেকেই তখন শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তর ইন্দ্রনাথ বা মার্ক টোয়েনের লেখা অ্যাডভেঞ্চার্স অব টম সয়্যারের হাকলে বেরি ফিনকে পড়ে ফেলেছি। তাই মহালয়ার ওই রাতগুলোতে অনেক সময় নিজেদের ইন্দ্রনাথ বা হাকলে বেরি ফিন বলে মনে হত।
মহালয়ার রাতের সঙ্গে সে সময় একটা ব্যাপার অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল। তা হল চকলেট বোমের শব্দ। আগের দিন থেকেই পাড়ার মুদি দোকানগুলোতে বিক্রি হত চকলেট বোম, কালীপটকা এসব শব্দবাজি। সে সময় শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ এসব ব্যাপার নিয়ে তেমন একটা সচেতনতা ছিল না মানুষের মনে। আইনের কড়াকড়ি বা নিষেধও ছিল না। তাই মাঝরাত থেকেই মাঝে মাঝে চকলেট বোমের শব্দে কেঁপে উঠত পাড়া। সে শব্দ আসত যখন ঘরে ঘরে রেডিয়োতে বেজে উঠত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর। মজা করে বলি, ওইসব শব্দবাজির একটা উপকারিতাও ছিল। যারা ঘুম কাতুরে মানুষ, যারা আশঙ্কিত থাকতেন মহালয়ার ভোরে ঘুম ভেঙে রেডিয়ো শুনতে পারবেন না বলে তাদের মধ্যরাতেই ঘুম ভাঙিয়ে দিত বাজির শব্দ। শোনা কথা আমাদের পাড়ার এক ঘুম কাতুরে ভদ্রলোক নাকি পাড়ার ছেলেদের একবার এক বাক্স চকলেট বোম কিনে দিয়ে শেষ রাতে সেগুলো তার বাড়ির সামনের রাস্তায় ফাটাতে বলেছিলেন, যাতে তিনি ঘুম ভেঙে উঠে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে পারেন সে জন্য। যদিও ওই শব্দবাজি ফাটাবার ব্যাপারে সব সময় মহৎ উদ্দেশ্য থাকত তা নয়। কোনো কোনো সময় কোনো বাড়ির বাগানে বা উঠানেও চকলেট বোম নিক্ষেপ করা হত বিভিন্ন কারণে। তবে এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। এসবই ছিল অল্প বয়সের নিছক দুষ্টুমি। এসব নিয়েই ছিল আমাদের বাল্যকাল বা কৈশোরের মহালয়ার রাত।
আমাদের বাড়িতে একটা ট্রানজিস্টর রেডিয়ো ছিল। দীর্ঘদিন সচল ছিল সেই রেডিয়ো। যৌথ মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার কাকা তাতে ইস্ট বেঙ্গল-মোহন বাগানের খেলার ধারা বিবরণী শুনতেন, সকাল-সন্ধ্যায় শোনা হত সংবাদ, কখনো বা অনুরোধের আসর-গান। রেডিয়োর সেই ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’ অ্যান্টিসেপটিক ক্রিমের মতনই মধ্যবিত্তর বঙ্গ জীবনের অঙ্গ ছিল রেডিয়ো। তারপর একদিন টেলিভিশন বা দূরদর্শন এল। রেডিয়োর প্রতি খানিকটা আকর্ষণ কমল মানুষের। কিন্তু রেডিয়ো হারিয়ে গেল না। তার একটা কারণ অবশ্যই রেডিয়োতে সম্প্রচারিত ওই মহালয়ার অনুষ্ঠান। টেলিভিশনের মহালয়ার অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত শুরু হয় এক সময়। মানুষ চোখের সামনে দেখতে পায় দেবী দুর্গাকে, দেখতে পায় দেবীর ত্রিশূল হাতে অসুরবধ। টেলিভিশনের সেইসব মহালয়ার অনুষ্ঠানের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলি সে সব অনুষ্ঠান রেডিয়োর মহিষাসুরমর্দিনীর সমতুল্য কোনো দিনই হয়ে উঠতে পারেনি বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। রেডিয়োর মহালয়া, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র যেন মিশে আছেন বাঙালির রক্তে। এই একটি ব্যাপার যেখানে বাঙালি মহানায়ক উত্তমকুমারকেও প্রত্যাখান করেছিলেন।
মহালয়ের আগের দিন বাবা বাজার ফেরত ব্যাটারি কিনে আনতেন। রেডিয়োটা নিয়ে বসতেন। সেটাকে পরম যত্ন আর মমতায় ন্যাকড়া দিয়ে মুছে তাতে ব্যাটারি পুরতেন। টিভির প্রকোপে অনেক সময় অনেকদিন রেডিয়োটা না চালানো হলেও নতুন ব্যাটারি পোরার পর বেশ কিছুক্ষণ নানা ধরনের উদ্ভট শব্দ কিছুক্ষণের পর ঠিক চালু হয়ে যেত রেডিয়োটা। শোনা যেত ‘আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র। আপনারা শুনছেন...। সেই ঘোষণা শুনে হাসি ফুটে উঠত বাবার মুখে। যাক, তবে রেডিয়োটা ঠিক আছে! এরপর সেই রেডিয়োকে স্থাপন করা হত টেবিলে। আর আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হত যাতে আমরা সেই রেডিয়োর কাছে না যাই। কারণ আমরা তখন সব ছোটো ছোটো ভাইবোন। কেউ যদি রেডিয়ো শুনতে গিয়ে কলকব্জা বিগড়ে দিই আর তার ফলে যদি পরদিন ভোরে মহালয়া শোনা না যায় তবে সে এক ভয়ংকর ব্যাপার হবে। সন্ধ্যাবেলায় যা শাঁখ বাজানোর পর বাবা আরও একবার চালু করতেন রেডিয়ো। সেটা ঠিক আছে কি না তা শেষ একবারের জন্য পরীক্ষা করে নিতে। তবে তা বেশিক্ষণের জন্য নয়, কারণ ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় থাকত। তারপর একসময় রাত নামত। আমরা ভাই বোনেরা তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম ভোরবেলা উঠে মহালয়া শুনতে হবে বলে। তবে মাঝে মাঝেই বাজির বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যেত। অনুষ্ঠান শুরুর আগে মা আমাদের ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিয়ে বলতেন ‘ওঠ, এবার মহালয়া শুরু হবে।’
বাবা ততক্ষণে গিয়ে বসেছেন রেডিয়োর সামনে। রেডিয়ো চালু করে দিয়েছেন তিনি। আধো-অন্ধকার ঘর। এরপর একসময় সেই অন্ধকার ঘরে গমগম শব্দে বেজে উঠত এক কণ্ঠস্বর—‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর।’ সেই কণ্ঠস্বরে সারা শরীর যেন কেমন বিহ্বল হয়ে উঠত, অদ্ভুত এক আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তাম আমরা। শুরু হয়ে যেত মহালয়া। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের স্তোত্র পাঠ আর একের পর এক অসাধারণ সব গান আর মাঝে মাঝে ন্যারেশন। ছোটোবেলায় সে সব স্তোত্র বা গানের সব শব্দের মানে বুঝতাম তা নয়। কিন্তু পরিবেশনার গুণে তা আমাদের মোহাবিষ্ট করে রাখত। নিশ্চুপভাবে রেডিয়োতে ভেসে আসা ধ্বনি শুনে যেতাম আমরা। আমার সবচাইতে ভালো লাগত যেখানে দেবী দুর্গাকে দেবতারা নানান অস্ত্রে সাজিয়ে তুলেছেন সেই অংশের বর্ণনা বা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কণ্ঠে বাংলা আলেখ্য—‘মহাদেব তাঁহার শূল হইতে একটি শূল প্রদান করলেন, বিষ্ণু দিলেন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনু ও বাণপূর্ণ তুণীর, ইন্দ্র তাহার বজ্র হইতে বজ্র প্রস্তুত করিয়া দিলেন এবং ঐরাবতের ঘণ্টা হইতে দিলেন একটি ঘণ্টা, যম দণ্ড, কালদেব দিলেন খড়্গ...।’ শুনতে শুনতে মনে হত যে মাকে যুদ্ধের জন্য সাজিয়ে তোলার দৃশ্য যেন আমি প্রত্যক্ষ করছি! এরপর থাকত অসুর নিধনের বর্ণনা। ‘জয় জয় জপ্য জয়ে জয় শব্দ প্রস্তুতি’—এই শ্লোকটি দিয়ে শেষ হত রেডিয়োর মহালয়া, যেমন আজও হয়। এতক্ষণে অবশ্য বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেছে। ঘরের বাইরে খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম। দেখতাম কিছুটা তফাতে শিউলি গাছের তলাটা সাদা হয়ে গেছে শিউলি ফুলে। অঞ্জলি ভরে সেই সাদা শিউলি ফুল তুলে এনে এনে রাখতাম টেবিলে রাখা রেডিয়োর পাশে। শিশির ভেজা শিউলি ফুলের সেই অপূর্ব সুবাস যেন তখনও চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলে নাকে এসে লাগে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবা নতুন গামছা, ধুতি, তিল-হরীতকী ইত্যাদি নিয়ে প্রস্তুত হতেন পিতৃপুরুষকে জল দান করার জন্য। মা আগের দিন সেসব সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতেন। আর আমিও এরপর পকেটে ক্যাপ বন্দুক নিয়ে চলে যেতাম পুজো প্যান্ডেলে। দেখতাম পুজো প্যান্ডেলে কাপড় লাগাতে চলে এসেছে ডেকরেটরের লোকজন। আরও সমবয়সি বন্ধুরা উপস্থিত হত সেখানে। প্যান্ডেল কেমন হবে, মায়ের মূর্তি ডাকের সাজ নাকি জরির কাপড়ে সজ্জিত থাকবে, স্কুল কবে থেকে ছুটি হবে, আশপাশের কোন কোন প্যান্ডেলে আমরা ঠাকুর দেখতে যাব, পুজোতে কার ক’টা জামা-প্যান্ট হয়েছে সে সব নিয়েই আলোচনা শুরু হয়ে যেত আমাদের। তখনও ঘরে ঘরে মোবাইল ফোন বা তাতে ফেসবুকের জন্ম হয়নি। কাজেই মহালয়া শুভ না অশুভ তা নিয়ে ফেসবুকীয় এড়ে তর্ক আমাদের সে দিন গ্রাস করতে পারেনি। এসব নিয়ে পণ্ডিতি ফলাবার ইচ্ছাও তখন আমাদের ছিল না। একটাই কথা শুধু আমরা জানতাম। মহালয়া মানেই পুজো এসে গেছে। আর পুজো মানেই বাঁধ ভাঙা আনন্দ।
এসব অনেক পুরানো দিনের কথা। সময় বহমান। বাবা-মা, সেই রাত জাগা বন্ধুরা আজ চলে গেছেন সেই দেশে। যেখান থেকে মর্তভূমে পদার্পন করেন দেবী দুর্গা। সেবারও ছিল মহালয়া। সেই শেষবার বাবা মহালয়ার দিন সেই রেডিয়ো চালাননি।
সেবার আর মহালয়ার দিন আমাদের বাড়িতে বাজেনি— ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর। ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা...।’ কারণ, আমার বাবা তখন মেঘমালার দেশের যাত্রী। পরের বছর আমি সেই রেডিয়ো বাজাবার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু তা বাজেনি। হয়তো বা বাবার ছোঁয়াতেই প্রাণ ফিরে পেত সেই রেডিয়ো। সেই রেডিয়োটাও হয়তো আজ কোথায় হারিয়ে গেছে বাবারই মতন। সেই রাত জাগা ডাব, ফুলের টব চুরি করা বন্ধুরাও কোথায় যেন আজ অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেই শিউলি গাছটাও আজ নেই। তবে সেই স্মৃতি রয়ে গেছে। তবে অর্ধেক জীবন পেরিয়ে এসে আজও আমি মহালয়া শুনি। মাও আজ মেঘের দেশে পাড়ি দিয়েছেন, তিনি আজ আমাকে আর ডেকে দেন না ‘আজ মহালয়া’ বলে। এখন মোবাইলে শুনি সেই মহালয়া। আগের দিন মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখি মহিষাসুরমর্দিনী শুনব বলে, ইয়ার ফোনে যখন বেজে ওঠে— ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর’ তখন খুব বেশি করে আমার মনে পড়ে আমার বাবার কথা, ডাব আর ফুলের টব চুরি করা, রাত জাগা বন্ধু আর সেই রেডিয়োটার কথা। আর সেই শিউলি ফুলের গন্ধ।