


শুভদীপ রায়: কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন। সামনে ব্যারিকেড। চারপাশে ভিড়। হেলমেট পরা পুলিশ লাঠি হাতে ভিড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। এবার নিশ্চয়ই উঠবে চেনা স্লোগান। কিন্তু না। ভিড়ের সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন একসঙ্গে দু’হাত দিয়ে বুড়ো আঙুল আর তর্জনি জুড়ে ‘হার্ট হ্যান্ডস’ বানিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘পুলিশ আঙ্কেল... ভাস্তেগুনা হুইয়া!’ পাশে দাঁড়ানো একজন ইচ্ছে করেই চোখ দুটো উলটে ভেংচি কাটছে। আরেকজন দু’হাত তুলে ‘ডব্লিউ! ডব্লিউ! ডব্লিউ!’ বলে লাফাচ্ছে। কয়েকজন আবার পুলিশের দিকে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিচ্ছে। এসব দেকে পুলিশ তো বেজায় অবাক। একটাই প্রশ্ন, হচ্ছে টা কী! ভিড় থেকে একজন নির্লিপ্ত মুখে বলল, ‘স্কিল ইস্যু ব্রুহ।’ দূর থেকে এমন দৃশ্য দেখে মনে হতেই পারে আন্দলোনের শুটিং চলছে? নাকি সত্যিকারের আন্দোলন? আসলে দুটোই।
‘জেন জি’ র কাছে প্রতিবাদ, পারফরম্যান্স, মিম আর রাজনীতি—সব একই ক্যানভাসের আলাদা রং। তাই দিল্লির রাস্তায় পুলিশ লাঠি তুলছে, এ ছবি চেনা লাগলেও, সেই লাঠি খেয়ে অনেকে হেসে উঠছে এমনটা একেবারে অচেনা। শুধু হাসি নয়। কেউ হাততালি দিচ্ছে। কেউ বলছে, ‘আজ টিয়ার গ্যাসের ব্যবস্থা নেই?’ লাঠি থামলেই বলছে, ‘স্যার, আজ তো একেবারে অরা ফার্মিং করে দিলেন!’ সেকথা শুনে চারপাশে আবার হাসির রোল। এরই মধ্যে একজন মোবাইল তুলে বলছে, ‘মা, চিন্তা কোরো না। পুলিশের কাছে মার খেতে এসেছি। হয়ে গেলেই ফিরে যাব।’ আরেকজন বন্ধু তাকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘পাক্কা মেন ক্যারেক্টার এনার্জি!’ আরও একটু এগোতেই এক তরুণী পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বলল, ‘আঙ্কেল, আপনি একেবারে আনহিঞ্জড!’ পাশে দাঁড়ানো বন্ধু ফিসফিস করে যোগ করল, ‘ব্রো ইজ কুকড।’ অফিসার এসবের মানে জানেন না। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছেন, প্রশংসা মোটেই করা হচ্ছে না।
হঠাৎ গড়গড় শব্দ। পুলিশের গার্ডরেলকে গাড়ি বানিয়ে কয়েকজন সেটাকে ঠেলে ঠেলে আনছে। মুখে দিয়ে হর্নের আওয়াজও করছে। একজন চালক, বাকিরা যাত্রী। একদম সামনে থাকা চালক চিৎকার করে বলছে, ‘নিউ লোর আনলকড।’ ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলল, ‘এটা ভাইরাল হবেই।’ অর্থাৎ প্রতিবাদ চলছে, সেটাকে কেন্দ্র করে কনটেন্টও তৈরি হচ্ছে। একটাকে অন্যটা থেকে আলাদা করাই যায় না। এরই মাঝে এক পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে কেউ বলে উঠল, ‘উসনে মেরা ক্রাশ কো চুরা লিয়া!’ অফিসারের মুখে লজ্জার হাসি। এতগুলো ক্যামেরার সামনে সেই হাসি লুকিয়ে রাখা সহজ নয়। মুহূর্ত নিমেষে ভাইরাল। অফিসারের নতুন পরিচয়, ‘পুকি!’
আসলে এটাই জেন-জির পৃথিবী। এখানে আন্দোলন মানে সিরিয়াস কিছু নয়। সহজ স্বাভাবিক রজনামচার মতোই। আলাদা করে তার জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। পোশাকের দরকার নেই। সাদা পাতা হাতে নিয়েও মিছিলে যাওয়া যায়। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর আসবে, ‘অনেক কিছু লেখা আছে, আপনি ভক্ত হলে ঠিক দেখতে পেতেন।’ আসলে জেন জির দুনিয়ায় স্লোগানে জুড়েছে নতুন শব্দ। যাকে মিম বললেও চলে। যার অর্থ সাধারণ অভিধানে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই যেমন, লাঠিচার্জ মানে ‘প্লট টুইস্ট’। গ্রেপ্তারি ‘নিউ লোর’। পুলিশের ধমক ‘ক্রিঞ্জ মোমেন্ট’। আর টিয়ার গ্যাসের সামনে দাঁড়িয়ে, ‘লেট হিম কুক!’ এসব শুনতে উদ্ভট। কিন্তু ওই মুহূর্তে উপস্থিত সবাই বুঝে যাচ্ছে কে কাকে খোঁচা দিচ্ছে। ‘অরা’ মানে শুধু ব্যক্তিত্ব নয়, অদৃশ্য এক ক্যারিশমা। কেউ একটু স্মার্ট কিছু করলেই তার ‘অরা বেড়ে গেল’। আর কেউ বোকামি করলেই মুহূর্তে ‘অরা লস’। যেমন পুলিশ যদি হেলমেট পরে হুড়মুড়িয়ে এসে নিজের সঙ্গীকেই ধাক্কা মেরে ফেলেন, ব্যস! ভিড়ের মধ্যে থেকে ভেসে আসবে, ‘ম্যাসিভ অরা লস!’ তারপর আসে ‘কুকড’। রান্নাঘরের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এর মানে, পরিস্থিতি এমন খারাপ যে আর নিস্তার নেই। আর এসব যারা করছেন তারা ‘আনহিঞ্জড’! এই শব্দটাও বেশ মজার। কেউ রাগের মাথায় অযৌক্তিক আচরণ করলেই জুটবে এই তকমা। মানে আগে যাকে বলা হত ‘মাথা খারাপ’, এখন সে ‘আনহিঞ্জড’। আর ‘লোর’? ইতিহাস নয়, ইতিহাসের মতো ছড়িয়ে পড়া গল্প। একবার কোনো ঘটনা ঘটল, তার পর থেকে সেটাই কিংবদন্তি। আজকের লাঠিচার্জ কালকের ‘লোর’। এর মধ্যেই কেউ হয়ে উঠছে, ‘মেইন ক্যারেক্টার এনার্জি!’ অর্থাৎ, আজকের নায়ক সে-ই। বাকিরা সব সাইড ক্যারেক্টার। কেউ আবার বন্ধুকে বলছে, ‘লক ইন।’ মানে, চারপাশ ভুলে শুধু লক্ষ্যেই মন দাও। আর ‘ভাস্তেগুনা হুইয়া’— শব্দটার অর্থ খুঁজতে গেলে একটু সমস্যায় পড়তেই হবে। কারণ, এর আসল কোনো অর্থই নেই। জেন-জির কাছে এটা এক ধরনের ইনসাইড জোক। এমন একটি ক্যাচফ্রেজ, যা শুনে একই ডিজিটাল দুনিয়ার মানুষ হেসে ফেলবে, আর বাকিরা ভাবতে বসবে—‘এটা আবার কী?’ যদিও এই শব্দের জন্ম বেশ অদ্ভুত। অন্তত এক দশকেরও বেশি আগে ভাইন-এ ভাইরাল হয়েছিল একটি ভিডিয়ো। সেখানে শোনা গিয়েছিল, ‘ক্যান আই গেট আ হোয়া?’ দ্রুত উচ্চারণে অনেকের কানে কথাটা অন্যরকম শোনায়। তারপর টিকটক, রিলস, মিম পেজ ঘুরতে ঘুরতে সেই ভুল শোনাই নতুন জীবন পায়। ভারতীয় জেন-জির হাতে এসে সেটাই বদলে যায় ‘ভাস্তেগুনা হুইয়া’-য়। কোনো অভিধান তাকে স্বীকৃতি দেয়নি, কারণ তার প্রয়োজনও পড়েনি। বন্ধুদের আড্ডা থেকে কলেজ ক্যাম্পাস, আর সেখান থেকে আন্দোলনের ময়দান—সব জায়গাতেই এটি এক ধরনের মিম-স্লোগান। যার কাজ দাবি জানানো নয়, বরং মুহূর্তটাকে এমনভাবে অদ্ভুত করে তোলা, যাতে সবাই থমকে যায়।
মজার বিষয়, এই ভাষার অর্ধেকই পুলিশের বোধগম্য নয়। ফলে অপমান হচ্ছে, ঠাট্টা হচ্ছে, অথচ সামনে দাঁড়ানো মানুষটি বুঝতেই পারছেন না ঠিক কী বলা হল। এই ভাষাকে স্রেফ যোগাযোগের মাধ্যম নয় সাংস্কৃতিক কোড বলা ভালো। যে কোড বুঝবে, সে হাসবে। যে বুঝবে না, সে শুধু তাকিয়ে থাকবে। তাই জেন জির এই প্রতিবাদ শুধু রাজনৈতিক ঘটনার ছবি নয়। এটা ভাষার বিবর্তনের ছবিও। এখানে ব্যানারের পাশাপাশি মিম আছে। স্লোগানের পাশে আছে স্ল্যাং। প্রতিবাদের মাঝেও কনটেন্ট। আর পুলিশের লাঠির সামনেও এমন এক হাসি আছে, যা ব্যথা লুকোয়, আবার ভয়কেও উপহাস করে। সম্ভবত এটাই ওদের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। ওরা রাগে চিৎকার করে না সবসময়। কখনও কখনও এমন ভাষায় হাসে, যা প্রতিপক্ষের কানে পৌঁছয়, কিন্তু মাথায় পৌঁছয় না। আর এই দুই পৃথিবীর মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের ভারত। একদিকে লাঠি। অন্যদিকে হাসি। একদিকে রাষ্ট্রের কঠোরতা। অন্যদিকে মিমের ভাষায় প্রতিরোধ। ইতিহাসের বইয়ে হয়তো এই আন্দোলনের কারণ লেখা থাকবে। কিন্তু সময়ের ডায়েরিতে জায়গা করে নেবে অন্য এক দৃশ্য—লাঠিচার্জ শেষ হওয়ার পর পুলিশকে হাততালি দিয়ে বলা, ‘স্যার, আজ তো একেবারে ফায়ার পারফরম্যান্স!’