


‘তুমি আমাকে টাচ করবে না’, বলেছিলেন রিনা ব্রাউন। ছবির নাম ‘সপ্তপদী’। সেখানে কৃষ্ণেন্দু আর রিনার কেমিস্ট্রি বাংলা ছবির ইতিহাসে এক মাইলফলক। শুধু অভিনয় নয়, স্টাইল আইকন হিসেবেও নতুন পথ তৈরি করেছিলেন পর্দার ‘রিনা’ অর্থাৎ মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। কখনো ঘরোয়া লুক, কখনো বনেদিয়ানা, কখনো বা ‘রিনা’র মতো চরিত্রে স্কার্ট টপ ক্যারি করেছেন অনায়াসে। আগামী ৬ এপ্রিল তাঁর জন্মদিন। মহানায়িকাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য চতুষ্পর্ণীর তরফে তাঁর মতো করে সাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল নাতনি তথা অভিনেত্রী রাইমা সেনকে। পরিকল্পনা শুনে রাজি রাইমা। কিন্তু এই কাজ বড় কঠিন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ঠিক হল, ‘সপ্তপদী’র ‘রিনা ব্রাউন’-এর লুক রিক্রিয়েট করা হবে। পাশাপাশি দুটো লুক তৈরি হবে শাড়িতে। পোশাক পরিকল্পনা করলেন ফ্যাশন ডিজাইনার পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়। যতটা নিখুঁত করে তোলা যায়, সেই প্রয়াস ছিল অনবরত। বাকি গুরুদায়িত্ব ছিল মেকআপ শিল্পী প্রসেনজিৎ বিশ্বাসের উপর। ঠিক যেভাবে যত্ন নিয়ে ঠোঁটের মেকআপ করতেন মহানায়িকা, অথবা তাঁর চুল বাঁধার স্টাইল যেভাবে ধরা রয়েছে সেলুলয়েডে, রাইমাকে সেভাবেই সাজানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। পাশাপাশি ছবি তোলা হয়েছে সাদা-কালোয়। কারণ বাঙালি এভাবেই মহানায়িকাকে অনস্ক্রিন দেখতে অভ্যস্ত।
দিনভর ফ্যাশন শ্যুটের ফাঁকে ‘আম্মা’র গল্প করলেন রাইমা। এভাবেই দিদিমাকে সম্বোধন করতেন তিনি। ছোটোবেলার অনেকটা সময় আম্মার সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন তিনি এবং তাঁর বোন তথা অভিনেত্রী রিয়া সেন। সুচিত্রা কন্যা মুনমুন সেন তখন চুটিয়ে অভিনয় করছেন। দুই শিশুকন্যা অনেক সময়ই থাকত দিদিমার তত্ত্বাবধানে। স্মৃতিতে ডুব দিয়ে রাইমা জানালেন, স্কুলের দেওয়া বাংলা পড়া করিয়ে দিতেন আম্মা। নিয়ম করে পড়াতে বসাতেন। আবার বাড়িতে পুজো হলে সকলে মিলে ভোগ খাওয়ার নিয়মও তিনি তৈরি করেছিলেন। কলাপাতায় খাওয়া হত পুজোর ভোগ। বাড়ির সকলের সঙ্গে বসে পুজোর দিনে কলাপাতায় ভোগ খেতেন মহানায়িকাও। তাঁদের দুই বোনের দুষ্টুমিকে একদিকে যেমন প্রশ্রয় দিতেন আম্মা, আবার ঠিক সময়ে পড়াশোনা করে নিতে হবে, এও ছিল তাঁর নির্দেশ। আদরে, শাসনে দুই নাতনিকে আগলে রাখতেন মহানায়িকা। আম্মার কথা বলতে গেলে সেই ছোটোবেলার দিনগুলোতেই ফিরে যান রাইমা। মনে ভিড় করে আসে অজস্র স্মৃতি।
পরম্পরা, ঐতিহ্য— এসব শব্দের বহু অর্থ হয়। সুচিত্রা সেনের নাতনি হিসেবে রাইমা বহুবার শুনেছেন, তাঁকে নাকি মহানায়িকার মতো দেখতে। চোখ, নাকের গড়ন, হাসির ধরন, সবেতেই রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্যের ছাপ। তাঁর সাজপোশাকেও সুচিত্রার আভাস খুঁজে পান অনেকেই। এসব শুনে গর্ববোধ হয় রাইমার। পাশাপাশি দায়িত্বও বেড়ে যায় অনেকখানি। চতুষ্পর্ণীর এই বিশেষ ফ্যাশন শ্যুটের পরিকল্পনার শুরু থেকেই সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন রাইমা। সুচিত্রা সেনের ফ্যাশন স্টেটমেন্টকে অনুকরণ করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই রাইমা চেয়েছিলেন তাঁর স্টাইল বজায় রেখে এমন লুক তৈরি হোক, যাতে আম্মাকে শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব।
স্কার্ট টপের প্রথম লুকে পনিটেল করার পর রাইমা ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেই যেন গোটা ইউনিট ফিরে গেল বেশ কয়েক বছর আগে। ‘আম্মা’র মতো করেই হেসে উঠলেন রাইমা।
অন্য একটি লুকে সুচিত্রার চুল বাঁধার ধরন অনুসরণ করেছেন রাইমা। শাড়ির উপর পরেছেন একটি হাকোবা জ্যাকেট। একে ব্লাউজ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। গলায় বেঁধে নিয়েছেন মানানসই স্কার্ফ। সত্যি ভাবলে অবাক হতে হয়, এই বাংলায় বসে এই ধরনের স্টাইল অত বছর আগে করেছিলেন সুচিত্রা সেন।
আর একটি লুকে ছিল ঘরোয়া সাজ। শাড়ি, হাতে সোনার বালা, কানে ঝুমকো। সবথেকে বেশি আকর্ষণীয় ছিল কপালের টিপ। সোফায় বসে জানলার বাইরে তাকালেন রাইমা। তখন তাঁর মুখে এসে পড়েছে পড়ন্ত সূর্যের আলো। সময় যেন থমকে গিয়েছে। ফিরে গিয়েছে কয়েক বছর আগের কলকাতায়। সেখানে বাংলা ছবির সম্রাজ্ঞী উপস্থিত। তিনি যেন আদর করছেন নাতনিকে। তাঁর উত্তরসূরীর মধ্যে কোথাও নিশ্চয়ই খুঁজে পেয়েছেন নিজেকেও। রাইমার মুখেও তৃপ্তির হাসি। তাঁর এই প্রয়াসে হয়তো খুশি হলেন ‘আম্মা’...।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য