


নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: সবার প্রিয় বুচুর (অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়) জন্মদিন। বিশাল কেক নিয়ে ক্লাবে হাজির হয়েছিল বন্ধুরা। হইচই, মজা-ঠাট্টা। এমন সময় স্ত্রীর ফোন পেয়ে কেক কাটার ছুরি হাতে নিয়েও রেখে দিতে হয় তাঁকে! ছেলের হাত ভাঙার খবর পেয়ে দৌড়ে বাড়ি গিয়েছিলেন। দুই বোন, স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে দ্রুত পৌঁছে যান আর জি কর মেডিকেলে। তখন কে জানত, এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক লিফট দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে যাবে বুচুর জীবনটাই! বাকরুদ্ধ গোটা পাড়া। প্রাণচঞ্চল যুবক অরূপ যে আর নেই, কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না! বন্ধুদের আনা কেক সাতসকালে জলে ভাসানো হয়েছে! বাড়ির ফ্রিজে এখনো যত্নে তুলে রাখা রেষ্টুরেন্ট থেকে আনা জন্মদিনের খাবার!
দক্ষিণ দমদম পুরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কালিন্দী ১২২, এসএইচকেবি সরণির বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। দক্ষিণ দমদম পুরসভায় অস্থায়ী কর্মী ছিলেন। স্ত্রী সোনালি বন্দ্যোপাধ্যায় একজন আশা কর্মী। আবাসনের দোতলায় বাবা, মা ও পরিবারের সঙ্গে থাকতেন অরূপ। তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী হিসাবে সহকারী বিএলএ’র ভূমিকা পালন করেছেন এসআইআরে। পরোপকারী হিসাবে তাঁকে চিনত সবাই। রাতবিরেতে এক ডাকে পৌঁছে যেতেন হাসপাতাল কিংবা থানায়। বন্ধুমহলে জনপ্রিয় তো ছিলেনই। বৃহস্পতিবার ছিল তাঁর জন্মদিন। বুধবার মধ্যরাতে বাড়িতে স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে কেক কেটেছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই গিয়েছিলেন বাজারে। অসুস্থ মা ছেলের জন্য রেঁধেছিলেন তাঁর প্রিয় মাছের পদ। রাতে খাবার আনিয়েছিলেন হোটেল থেকে। সেই খাবার বাড়িতে রেখে চলে গিয়েছিলেন পাশের ক্লাবে। কারণ, বন্ধুরা বারবার ফোন করে ডাকছিল। তারাও এনেছিল প্রমাণ সাইজের কেক। রাত ১০টা নাগাদ অরূপের বছর চারেকের ছেলে বিছানায় লাফানোর সময় খাট থেকে পড়ে হাত ভাঙে। ফোনে স্ত্রীর থেকে সেই খবর জেনে তড়িঘড়ি বাড়ি যান। ছেলেকে নিয়ে ছোটেন আর জি করে। বন্ধুদের কেউ কেউও সেখানে যান। কেক সযত্নে রাখা ছিল। কিন্তু হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অরূপের মৃতদেহ বাড়িতে ফিরবে—এমনটা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি কেউ। আজ, শুক্রবার স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে বোলপুরে তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে শ্যালিকার ছেলের মুখেভাতের অনুষ্ঠান। তার আগেই সব শেষ! বিকাল পর্যন্ত বাড়িতে থাকা বৃদ্ধা মাকে কেউই তাঁর ছেলের মর্মান্তিক পরিনতির কথা জানানি। বাড়ির সামনে সবার জটলা দেখে বারবার প্রশ্ন করেছেন, আমার নাতি ঠিক আছে তো!
অরূপের পিসি কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় হাহাকার করে ওঠেন, ‘বুধবার ছেলেটা স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে বড়োমার মন্দিরে গিয়েছিল। মায়ের আশীর্বাদও কাজে এল না! আমরা কি নিয়ে বাঁচব?’ জেঠু দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখে জল। বলেন, ‘সবার চোখের সামনে জলজ্যান্ত ছেলেটা আর্তনাদ করতে করতে মারা গেল। কেউ কিছু করল না। আমাকেই ভগবান কেন তুলে নিলো না!’ এদিন ভোর থেকে হাসপাতালে দৌড়ানো সহ দিনভর পরিবারের পাশে ছিলেন দক্ষিণ দমদম পুরসভার সিআইসি সঞ্জয় দাস। তিনি বলেন, ‘অরূপের উপর শুধু তার বাড়ি নয়, পাড়ার সবাই একপ্রকার নির্ভরশীল ছিল। যেকোনো সমস্যায় ওই ছিল ভরসা। এমন মর্মান্তিক পরিণতি বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। এই গাফিলতির কোনো ক্ষমা হয় না।’