


সন্তান যে স্কুলে পড়ে, হঠাৎ শুনলেন সেই স্কুলের অ্যাফিলিয়েশন অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে কোর্ট বা সংশ্লিষ্ট বোর্ড। আইনি পথে কী করবেন? পরামর্শে আইনজীবী দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঘটনা ১
সকাল সকাল ছেলেকে নিয়ে স্কুলে পৌঁছেছেন সৌমিক। বেহালার একটি সিবিএসসি বোর্ডে ছেলে পড়াশোনা করে। কিন্তু স্কুলের গেটের সামনে পৌঁছে বাকরুদ্ধ সৌমিক! যে স্কুলে এত বছর ছেলে পড়েছে, তার গেটের বাইরে নোটিস ঝোলানো। স্কুলের অ্যাফিলিয়েশন বাতিল করেছে কেন্দ্র! যার সহজ অর্থ একটিই। এই স্কুলের কোনো ছাত্রছাত্রীই আর এই স্কুল থেকে পরীক্ষায় বসতে পারবে না। কান্নার রোল পড়ে গিয়েছে স্কুলচত্বরে। নীচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাও অন্য স্কুলে ভর্তির একটা সুযোগ থাকে। কিন্তু যারা উঁচু ক্লাসে পড়ে, তাদের তো তড়িঘড়ি অন্য স্কুলে ভর্তি হওয়া বেশ মুশকিলের। তাহলে উপায়? মাথায় হাত অভিভাবকদের।
ঘটনা ২
নতুন স্কুল তৈরি হয়েছে পাড়ায়। বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ। মেয়েকে সেই স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি করেছিল মিতিন। তখন অবধি স্কুলটি ছিল এইট পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই অ্যাফিলিয়েশন পেয়ে যাবে স্কুল। ক্লাস সিক্সে পড়তে পড়তে সুখবর এল। স্কুল অ্যাফিলিয়েশন পেয়েছে। তাই অন্য স্কুলে মেয়েকে আর ভর্তি করার প্রয়োজন দেখেনি মিতিন। এখন মেয়ে ক্লাস নাইন। হঠাৎই স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের অ্যাফিলিয়েশন বাতিল হয়েছে। অন্য স্কুলের পরীক্ষার্থী হয়ে মিতিনের মেয়েকে পরীক্ষা দিতে হবে। অথচ গত তিন বছর ধরে স্কুলের বেতন পরিকাঠামো সহ অন্যান্য সব খাতেই অ্যাফিলিয়েশনপ্রাপ্ত স্কুলের মতোই খরচ নেওয়া হয়েছে।
উপরের দু’টির একটিও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদেরই চারপাশে থাকা কোনো কোনো মানুষজনের জীবনে এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু স্কুলের এমন অবিমৃশ্যকারী আচরণে অথৈ জলে পড়া অভিভাবকরা কী করবেন? আইনি পথে তাঁদের অধিকার কী কী? সন্তানদের ভবিষ্যৎই বা কী হবে?
বিষয়টিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
১) সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড়
প্রথমত, স্কুল যে অ্যাফিলিয়েশন পায়নি বা তা বাতিল হয়েছে সেটির সাক্ষ্য বা প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। সাধারণত দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট বোর্ডের নিয়ম না মানায় কোর্টের নির্দেশে স্কুলের অ্যাফিলিয়েশন বাতিল হয়। কখনো কখনো স্কুলটি পরিকাঠামোগতভাবে বোর্ডের গুণমান অবধি পৌঁছতে পারে না। তখনও বোর্ড স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করে অ্যাফিলিয়েশন বাতিল করে দিতে পারে। স্কুলের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য স্কুল অবশ্যই দায়ী। অত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে স্কুলের সঙ্গে। তাই দায় তার আছেই। অভিভাবকদের প্রথম কাজ কোর্টের বা বোর্ডের নির্দেশনামা জোগাড় করা। অনেক সময় কেউ স্কুলের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যু তুলে মামলা করেন। সেখানে স্কুল যোগ্যতার মাপকাঠিতে পাশ করতে না পারলে তার অ্যাফিলিয়েশন বাতিল করা হয়। তেমন কিছু ঘটলে অভিভাবকদের কাজ সেই মামলাকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলার নম্বর, কোর্টের নির্দেশ ইত্যাদির কপি জোগাড় করা।
মামলা ছাড়াও নির্দিষ্ট বোর্ড তাদের নিয়মনীতি না মেনে চললে বা প্রয়োজনীয় গুণমান বজায় না রাখতে পারলে যে কোনো স্কুলের অ্যাফিলিয়েশন কেড়ে নিতে পারে। তখন সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ওয়েবসাইটে গিয়ে তাদের নির্দেশের বিস্তারিত জানতে হবে। কেন অ্যাফিলিয়েশন বাতিল হল সেটিও দেখতে হবে।
২) অ্যাফিলিয়েশন সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য নেওয়া
নির্দিষ্ট স্কুলের ওয়বসাইটের লিঙ্ক নিয়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সাইটে গেলেই সেই স্কুল সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জানা যায়। তাছাড়া বাড়িতে বসেই অনলাইনে rtionline.gov.in-এ গিয়ে আরটিআই ফর্ম ফিল আপ করেও স্কুলের অ্যাফিলিয়েশন সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন অভিভাবকরা। বোর্ডের ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েও তথ্য জানতে চাওয়া বৈধ। এরপর এতকাল যে বেতন নেওয়া হয়েছে, স্কুলের কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটির জন্য নানা অর্থ জমা নেওয়া হয়েছে, স্কুল ব্যাগ, বইখাতা বা পোশাকের জন্য বাড়তি অর্থ জমা নেওয়া হয়েছে ইত্যাদির রসিদ বা অনলাইন ট্রানজাকশন কপি মজুত করুন। অত বছরের হিসেব একসঙ্গে জোগাড় করতে না পারলে অন্তত শেষ আর্থিক বছরের হিসেব হাতের কাছে রাখুন।
৩) তথ্য নিয়ে আইনের দ্বারস্থ
এই সকল তথ্য একজায়গায় করে স্থানীয় থানায় জেনারেল ডায়েরি করুন। এরপর স্কুলকে তার অবস্থান জানানোর জন্য একটি আইনি চিঠি দিতে হবে। সাধারণ অভিভাবক হিসেবেই এই চিঠি দিতে পারেন। স্কুলের কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানেও চিঠি পাঠাতে পারেন। স্কুল সেখানে তাদের অবস্থান, ভাবনা ও ছাত্রদের ট্রান্সফার তারা কোন স্কুলে ও কী পদ্ধতিতে করবে সব জানাতে বাধ্য।
স্কুলটি রাজ্য বোর্ডের অধীনস্থ হলে ডিস্ট্রিক্ট এডুকেশন অফিসার বা ডিইও-কে চিঠি দিয়ে জানাতে হবে ও তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের আবেদন করতে হবে। স্কুলটি সিবিএসই বা দিল্লি বোর্ডের হলে জয়েন্ট সেক্রেটারি, এডুকেশনকে চিঠি দিয়ে এই আবেদন করতে হবে।
আইনি শাস্তি কী
নিম্ন আদালতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ৩১৮ (প্রতারণা) অনুসারে মামলা রুজু হবে। এই অপরাধ সিভিল ও ক্রিমিনাল দু’ক্ষেত্রেই অন্তর্ভুক্ত। তাই ২০১৯ কনজিউমার ফোরাম অ্যাক্টের অধীনে পরিষেবা না দেওয়া, প্রতারণা ইত্যাদি মর্মে মামলা করা যায়।
হাই কোর্টে রিট পিটিশন করা যায়। আইনি নোটিশে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করা যাবে। এই ক্ষতিপূরণ শুধু স্কুলে বেতন বা পরিষেবা খাতে খরচ ধরেই হবে না, মানসিকভাবে বিভ্রান্ত করা, চাপ তৈরি করা, উদ্বেগে ফেলার জন্যও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে স্কুলকে। শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিক মুক্তি বা রিলিজ দিয়ে তার ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার আবেদনও থাকবে এই পিটিশনে। এই রিট পিটিশনের জন্য কোর্ট সুয়ো মোটো কেস করে মামলা জিতবে। সাধারণত, ক্ষতিপূরণ, বেতন ও অন্যান্য খাতে খরচ ফেরত দেওয়া (রিফান্ড), অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসন ও স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এই চারটি দাবি জানিয়ে আবেদন করা হয়।
মামলা চলাকালীন আদালত পরিস্থিতি বিচার করে রায় দেবে। এসব ক্ষেত্রে সমমানের ও সমান সুবিধাযুক্ত অ্যাফিলিয়েটেড স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোর দায়ও সম্পূর্ণ স্কুলের উপর বর্তায়। আধুনিক যুগে এই ধরনের প্রতারণায় ক্ষতিপূরণের অঙ্কও বেড়েছে। সবদিক থেকে সাবধান থাকা বাঞ্ছনীয়।
মনীষা মুখোপাধ্যায়
কিছু পরামর্শ
আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে কেই বা চায়! তাই সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর আগে সেই স্কুল সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নিন।
নতুন গজিয়ে ওঠা স্কুল হলে তার অ্যাফিলিয়েশন আছে কি না নিজেরাই বোর্ডের ওয়েবসাইটে গিয়ে চেক করুন।
অনেক স্কুল ক্লাস এইট অবধি পঠনপাঠনের ছাড়পত্র পায়। পরে ক্লাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সেখান থেকেই শিক্ষার্থীরা বোর্ডের পরীক্ষা দিতে পারে। একান্ত প্রয়োজন না পড়লে সেই স্কুল এড়িয়ে টেন বা টুয়েলভ অবধি পড়ানোর ছাড়পত্র আছে এমন স্কুলে ভর্তি করুন।