


এখন “মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব”। এখন ‘মামকাঃ’ মানে আমার পক্ষের লোকেরা। ধৃতরাষ্ট্রের অর্থাৎ মনের পক্ষে আছে কারা? না, দশটি ইন্দ্রিয়-পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়, পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়। বাক্-পাণি-পাদ-পায়ু-উপস্থ—এই পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়; চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা-জিহ্বা-ত্বক—এই পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়। এখন এই যে দশটা ইন্দ্রিয়, এদের কর্তা, এদের মালিক হ’ল মন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “ইন্দ্রিয়াণাং মনো নাথঃ মনোনাথস্তু মারুতঃ”। ইন্দ্রিয়দের কর্তা, অধিকর্তা, রাজা বা নিয়ন্ত্রক হ’ল মন আর মনকে নিয়ন্ত্রণ করে সাধক, বুদ্ধিমান ব্যষ্টি। সাধক মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন মরুৎকে নিয়ন্ত্রণের দ্বারা অর্থাৎ বায়ুকে নিয়ন্ত্রণের দ্বারা অর্থাৎ প্রাণায়ামের দ্বারা। ইন্দ্রিয়সমূহের যে অভিব্যক্তি সেইগুলোকে বলা হয় প্রাণ। ‘প্রাণ’ মানেই এনার্জি আর vital energy-কে বলা হয় ‘প্রাণাঃ’। তোমরা এটা ‘Idea and Ideology’ পুস্তকে নিশ্চয়ই পড়েছ। মানুষ যখন প্রাণকে অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের অভিব্যক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তখন তাকে বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
আ-যম্ + ঘঞ = আয়াম অর্থাৎ যা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। যার দ্বারা প্রাণকে অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের অভিব্যক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে তা হ’ল প্রাণায়াম। প্রাণ + আয়াম = প্রাণায়াম। “প্রাণান্ যময়ত্যেষ প্রাণায়ামঃ”—যার দ্বারা ইন্দ্রিয়ের অভিব্যক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয় তাকে বলা হয় প্ৰাণায়াম। প্রাণায়ামের দ্বারা যে ইন্দ্রিয়েরা নিয়ন্ত্রিত হয় তা-ই নয়, ইন্দ্রিয়দের অধিকর্তা মনও নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং তখন স্বভাবতই মন ইন্দ্রিয়ের সমপর্যায়ভুক্ত হয়ে যায় যদিও ইন্দ্রিয়দের সে অধিকর্তা; তাই মনকে বলা হয় একাদশ ইন্দ্রিয়। অনেক পণ্ডিত মনকে আলাদা সত্তা হিসাবে মানতেই রাজী নন। আবার অনেকে বলেন মনও একটা ইন্দ্রিয়। যদিও মন ঠিক ইন্দ্রিয় নয় কারণ মনের দু’টো ভূমিকা রয়েছে—ইন্দ্রিয় হিসেবে তার একটা ভূমিকা রয়েছে, আবার বাকী দশটা ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবেও তার একটা ভূমিকা রয়েছে।
এখন ‘মামকাঃ’ বলতে কী দাঁড়াচ্ছে তাহলে? না, দশটা ইন্দ্রিয় হ’ল মনের পক্ষের লোক। ওদের নিয়েই না মনের কাজ-কারবার, মনের শাসন, মনের প্রতাপ যা কিছু। ইন্দ্রিয়গুলো যদি মনের অধীনে না থাকত তাহলে মনের কোন দাম থাকত না, কোন গুরুত্ব থাকত না, তার অস্তিত্বই নিরর্থক হয়ে যেত। মন চাইছে, তাই চোখে দেখছে; মন চাইছে, তাই কাণ শুনছে; মন চাইছে, তাই নাক আঘ্রাণ নিচ্ছে। মন না চাইলে এরা কেউ কিছু করতে পারে না। মনে করো, তুমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছ। আর তোমার মন তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে ঢাকা শহরে, আর তুমি চলছ কলকাতার রাস্তা দিয়ে। তোমার সামনে দিয়ে একজন পরিচিত লোক এসে গেল, কিন্তু তোমার মন রয়েছে ঢাকায়। তাই পরিচিত লোকটিকে সামনে দেখেও তুমি তাকে দেখতে পাবে না; কারণ, মন দেখবার কাজে তোমার চোখকে সেখানে নিয়োজিত করেনি।
শ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার’ থেকে