


তন্ময় মল্লিক: সালটা ছিল ২০২৩। পঞ্চায়েত নির্বাচনের হাওয়া বোঝার জন্য রামপুরহাটে গিয়েছিলাম। বীরভূম জেলার পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে জানতে চাওয়ায় আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি নিয়ে চিন্তা নেই। কিন্তু, কুসুম্বা নিয়ে চিন্তায় আছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামার বাড়ির বুথেই জিততে পারছি না। আমি পাঁচবারের বিধায়ক। বারবার গিয়ে মিটিং করি, লোকজনের সঙ্গে কথা বলি। পঞ্চায়েতে জিতি, কিন্তু ওই বুথটায় হেরে যাই। খুব খারাপ লাগে আমার। হয়তো দোষ আমারই। মানুষকে ঠিকমতো বোঝাতে পারছি না।’
এলাকায় ঘুরে বুঝেছিলাম, দোষটা আশিসবাবুর নয়। কুসুম্বার ৩৪ নম্বর বুথে তৃণমূলের হারার জন্য দায়ী একটি পরিবারের দাম্ভিক আচরণ। তারই প্রতিবাদে মানুষ তৃণমূলকে হারাতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। এই সত্যিটা হয়তো আশিসবাবুও জানতেন। তাও দলের পরাজয়ের জন্য তিনি নিজেকেই দায়ী করতেন। কারোর উপর দায় না চাপিয়ে সব দোষ নিজের ঘাড়ে তুলে নিতেন। হয়তো মা সারদার বাণীই ছিল তাঁর জীবনে পথচলার আদর্শ, ‘যদি শান্তি পেতে চাও তবে কারো দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের।’ সেই শিক্ষা থেকেই কারোর দিকে আঙুল না তুলে নিজেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আশিসবাবু পাঁচবারের বিধায়ক। কৃষিমন্ত্রী হয়েছিলেন। শহরের মানুষ হলেও কৃষকের যন্ত্রণা তিনি বুঝতেন। তাই কৃষকবন্ধুর মতো প্রকল্প চালুর সুপারিশ করেছিলেন। আশিসবাবু নীরবে কাজ করে যেতেন। প্রচারের আলো গায়ে মাখার চেষ্টা করেননি।
একুশে তাঁকে মন্ত্রী করা হয়নি। শোনা যায়, বীরভূম জেলার এক দাপুটে নেতাকে খুশি করতেই তাঁকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। করা হয়েছিল ডেপুটি স্পিকার। তাতে নতুন করে সামনে এসেছিল ২০০৬ সালে বিধানসভায় ভাঙচুরের প্রসঙ্গ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিঙ্গুরে যেতে বাধা দেওয়ায় বিধানসভায় ভাঙচুর করা হয়েছিল। সেই দলে আশিসবাবুও ছিলেন। তারজন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু, কখনোই ‘বেশ করেছি’ জাতীয় মন্তব্য করেননি। উলটে প্রসঙ্গ উঠলেই মাথা নীচু করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কাজটা তিনি ঠিক করেননি।
আশিসবাবুকে রাজ্যবাসী রাজনৈতিক নেতা হিসাবে চিনলেও রামপুরহাটের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন মাস্টারমশাই। স্কুলের মাস্টারমশাই থেকে কলেজের অধ্যাপক। দীর্ঘ তাঁর শিক্ষকতার জীবন। ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী। কিন্তু, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কে চিড় খায়নি। তাই মন্ত্রী বা ডেপুটি স্পিকার নয়, রামপুরহাটের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘স্যার’। তাঁর এই মাস্টারমশাই ইমেজের জন্যই একদা লালদুর্গ রামপুরহাট হয়েছিল তৃণমূলের ‘সেফ সিট’।
বিধায়ক ও মন্ত্রী হিসাবে আশিসবাবু কতটা সফল, তা নিয়ে বির্তক থাকতেই পারে। তবে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। কারণ আশিসবাবু সবসময় ছাত্রছাত্রীদের মঙ্গলের জন্যই চিন্তা করতেন। তিনি নিজে ছাত্ররাজনীতি করেছেন। কিন্তু, কোনো মেধাবী ছাত্রছাত্রী তৃণমূল করলেও তিনি আড়ালে ডেকে মৃদু ধমক দিতেন।
আশিসবাবুর মৃত্যুর পর কথা হচ্ছিল তাঁরই এক ছাত্রের সঙ্গে। ছাত্রটি খুবই দুঃস্থ পরিবার থেকে উঠে এসেছে। কলেজ জীবনে আশিসবাবুর কাছে প্রাইভেট পড়ত। তার আর্থিক অবস্থা খারাপ শোনার পর ‘স্যার’ বলেছিলেন, ‘তোমাকে টিউশনের টাকা দিতে হবে না। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানিও।’ কিছুদিন পর আশিসবাবু জানতে পারেন, ছাত্র সংসদের নির্বাচনে ওই ছাত্রটি প্রার্থী হয়েছে। একদিন তাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘জীবনে রাজনীতি করার অনেক সময় পাবে। এটা কেরিয়ার তৈরির সময়। পড়াশোনা করে আগে নিজের পরিবারের দায়িত্ব নাও। তারপর রাজনীতি করার কথা ভাববে।’ ছাত্রটি স্যারের নির্দেশ মানায় জীবনে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে।
এভাবেই তিনি প্রচুর ছাত্রছাত্রীর জীবন গড়ে দিয়েছেন। অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রিয় স্যার এভাবে চলে যাওয়ায় শোকস্তব্ধ ছাত্রছাত্রীরা। সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় তাঁদের আবেগঘন পোস্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, আশিসবাবু আর পাঁচজন নেতার মতো নন। তিনি একটু আলাদা। সব্যসাচী ধর নামে তাঁর এক ছাত্র লিখেছেন, ‘সারা জীবন নরদেবতার পুজো করে গেছেন, তার এই পরিণতি? স্যার, আপনি রামপুরহাট কলেজ প্রতিষ্ঠার পর বাংলা অনার্সের ছাত্র হিসাবে রেকর্ড মার্কস পেয়েছিলেন। ... আপনি কলেজ লনে দাঁড়িয়ে বায়রন, কিটস্, শেলী, ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর কবিতা যেভাবে মুখস্থ বলে যেতেন অন্য বিষয়ের অধ্যাপকরা দাঁড়িয়ে শুনতেন।... বাম রাজনীতি যখন গোটা বাংলাকে জয় করতে পেরেছে তখন আপনি অপরাজিত। ...সেই আপনি গলায় দড়ি দিলেন? .... আপনি ভয় পেয়ে আত্মহত্যা করেননি। আপনার আত্মসম্মান খোয়া গিয়েছিল। তাই আপনি আজকের ভোরে আর সূর্যোদয় দেখলেন না। স্যার, আপনি কাদের সঙ্গে রাজনীতি করলেন?’
ক্ষমতার গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য আশিসবাবু রাজনীতিতে যোগ দেননি। তিনি মনে করতেন, শুধু মানুষ হওয়ার মন্ত্র দিলেই হবে না। মানুষকে দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে হবে। আর সেটা রাজনীতির বাইরে থেকে করা অসম্ভব। তাই সংসদীয় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। টানা ২৫ বছর বিধায়ক ছিলেন। মন্ত্রী হয়েছেন। ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব সামলেছেন। সেই মানুষটাই মৃত্যুকে স্বেচ্ছায় আলিঙ্গনের মুহূর্তে বলে গেলেন, রাজনীতিতে আসাটাই তাঁর ভুল হয়েছে।
আশিসবাবুর আত্মঘাতী হওয়ার কারণ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, পরাজয় তাঁকে যত না বিচলিত করেছিল তার চেয়ে অনেক মর্মাহত হয়েছিলেন ২১ জুলাই শক্তিগড়ের ঘটনায়। বিজেপি নেতার মুখে চোর বদনাম আর পিঠের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি মাস্টারমশাই হজম করতে পারেননি। সব কিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতিটা শুরু হয়েছিল সম্ভবত সেই দিন থেকেই। কেউ বলছেন, তারাপীঠ উন্নয়ন পর্যদের দুর্নীতির ঘটনায় চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁকে ফাঁসানো হবে আশঙ্কা করেই নিয়েছেন চরম সিদ্ধান্ত। আবার কেউ বলছেন, কয়েকজনের পরামর্শে ভালো তৃণমূল শিবিরে নাম লিখিয়ে অনুশোচনায় ভুগছিলেন। তাই এই সিদ্ধান্ত। ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক বিষয় নিয়ে চর্চা হবে। তবে, চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও একটা বিষয়ে সবাই একমত, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আশিসবাবু উপলব্ধি করেছেন, বড়ো নোংরা হয়ে গিয়েছে রাজনীতি। তাই পরিবারের সদস্যদের রাজনীতি না করার পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন।
কুসুম্বার মতো আশিসবাবুর নিজের ওয়ার্ডেও তৃণমূল হারত। অবশ্য তা নিয়ে তাঁর আক্ষেপ ছিল না। ওয়ার্ডে বিজেপি জেতার জন্য তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী শুভাশিস(খোকন) চৌধুরীকেই তিনি কৃতিত্ব দিতেন। সেই শুভাশিসবাবুও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সুরেই বলেছেন, ‘আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, এটা বিশ্বাস করি না। কিন্তু, উনি দুর্নীতি হচ্ছে দেখেও চুপ থাকতেন। প্রতিবাদ করলে এই দিনটা দেখতে হত না।’ শুভাশিসবাবু যে ভুল বলেননি, সেটা আশিসবাবুর সুইসাইড নোটেই স্পষ্ট, ‘সর্বদা সব দলীয় অন্যায়কে মেনে নিতে না পারলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি।’
আশিসবাবু টুলু মণ্ডলের জেলায় রাজনীতি করেছেন। কিন্তু, সাদা পাঞ্জাবিতে কালো দাগ লাগতে দেননি। বিজেপির কাউন্সিলার থেকে মুখ্যমন্ত্রী সকলেই তাঁকে ‘ক্লিনচিট’ দিয়েছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে তাঁকে অনেক মূল্য চোকাতে হয়েছে। অনুব্রত মণ্ডলের মতো নেতা তাঁকে প্রকাশ্য জনসভায় ‘অপদার্থ’ বলেছেন। অন্য কেউ হলে মঞ্চে দাঁড়িয়েই প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু আশিসবাবু করেননি। তাঁর শিক্ষা, তাঁর রুচিবোধ সেটা করতে দেয়নি। তিনি সেদিন শুধু অবাক বিস্ময়ে অনুব্রতর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সৌজন্যের খাতিরে হয়তো দু’জনে পাশাপাশি বসতেন। কিন্তু উভয়ের যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল তা মাপার মতো ফিতে তৈরি হয়নি।
মুখ্যমন্ত্রী ‘ক্লিনচিট’ দেওয়ায় একটা বিষয় পরিষ্কার, দুর্নীতির হাত থেকে বাঁচতে আশিসবাবু ঋতব্রত শিবিরে যাননি। তাহলে কি তিনি অনুব্রতর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে চেয়েছিলেন? সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো দিনই মিলবে না। তবে ঋতব্রত শিবির অনুব্রতকে জেলা সভাপতি করায় আশিসবাবু বুঝেছিলেন, টকের জ্বালায় পালিয়ে গিয়ে ঘর বেঁধেছেন তেঁতুলগাছের নীচেই।
আশিসবাবু পাঞ্জাবি পরতেন। তাঁর পাঞ্জাবির হাতা সব সময় কনুইয়ের উপরে থাকত। তাই আস্তিনের নীচে অস্ত্র লুকিয়ে রাজনীতি করার ‘ব্রত-কথা’ তাঁর জানা ছিল না। সেইজন্যই তিনি এভাবে চলে গেলেন। তবে রামপুরহাটের মাস্টারমশাই যাওয়ার আগে দিয়ে গেলেন চরম শিক্ষা। রাজনীতিতে ভদ্রলোকেদের টিকে থাকা কঠিন।