


বিশেষ নিবন্ধ, সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ঘটনাটি বেশ কয়েক মাস আগের। ব্রিটেনের এক সমুদ্রতটে গিয়েছিলেন উনাঘ নামে এক তরুণী। আচমকাই তাঁর সঙ্গে আলাপ জমাতে আসেন এক ব্যক্তি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তরুণীর নাম, বাড়ি কোথায় জানতে চাওয়ার পর আচমকাই মোবাইল নম্বর চেয়ে বসেন তিনি। অচেনা ব্যক্তিকে নিজের মোবাইল নম্বর দিতে চাননি উনাঘ। কয়েক সপ্তাহ পর তাঁকে টিকটকের একটি ভিডিয়ো ফরওয়ার্ড করেন একজন। হতবাক হয়ে উনাঘ দেখেন, সেদিনের গোটা ঘটনাটি রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন ওই ব্যক্তি। অথচ ওই সময়ে যে ভিডিয়ো রেকর্ডিং হচ্ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি উনাঘ। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ভিডিয়ো পোস্ট করার আগে একবারের জন্যও তাঁর অনুমতি নেননি ওই অপরিচিত ব্যক্তি। ওই ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন উনাঘ। বেশ কিছুদিন বাড়ির বাইরে বেরতেও ভয় পেতেন তিনি। শুধু উনাঘ নয়, এমন সব ঘটনা আকছার ঘটে চলেছে আমাদের চারপাশে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করা দুই তরুণী বা জিমে শরীরচর্চায় ব্যস্ত কোনো যুবক কয়েক দিন পর হঠাৎই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের সেই মুহূর্তের ভিডিয়ো দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছেন। কারণ তাঁরা কাউকে মোবাইল ফোন বা ক্যামেরায় ভিডিয়ো রেকর্ড করতে দেখেননি।
কখনো কখনো মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে সিঁধ কাটে প্রযুক্তি। তখন সেই প্রযুক্তিকে আর প্রগতি বলা যায় না। তা হয়ে ওঠে এক ধরনের ডিজিটাল আগ্রাসন। সেই তালিকায় সাম্প্রতিকতম সংযোজন—‘রে-ব্যান মেটা’ স্মার্ট গ্লাস। মেটা এবং রে-ব্যান-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘রে-ব্যান মেটা’ স্মার্ট গ্লাস এখন বিশ্বজুড়ে এক ভয়ংকর বিতর্কের কেন্দ্রে। কেন বিতর্ক? কারণ মার্ক জুকারবার্গের সংস্থা এই চশমাকে ‘প্রাইভেসি-ফোকাসড’ বলে বাজারে আনলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং কেনিয়ার নাইরোবির এক সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের স্বীকারোক্তি শিরদাঁড়ায় হিমস্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়েছি, যেখানে আমাদের চশমা শুধু আমাদের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় না, আমাদের অজান্তেই নজরদারিও চালায়। আমাদের অন্তরমহলের দৃশ্য পাচার করে দেয় সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে কোনো এক অন্ধকার দপ্তরে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৫ সালেই প্রায় ৭০ লক্ষ জোড়া এই চশমা বিক্রি হয়েছে। আর এই প্রতিটি চশমা এখন পরিণত হয়েছে একেকটি সিসি ক্যামেরায়। সুইডেনের দুই সংবাদপত্র এবং ‘দ্য ডিকোডার’-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, মেটা তাদের এআই-কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য কেনিয়ার ‘সামা’ নামক একটি সাব-কন্ট্রাক্টর সংস্থাকে ব্যবহার করছে। প্রযুক্তিগতভাবে এই চশমা সবসময় রেকর্ড না করলেও, যখনই ব্যবহারকারী মেটা এআই-কে সক্রিয় করেন (‘হাই মেটা’ বলে কমান্ড দেওয়া হয়), তখনই চশমার সামনের দৃশ্যটি ক্লাউড প্রসেসিংয়ের জন্য মেটার সার্ভারে চলে যায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আপনার ব্যক্তিগত পরিসর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে নাইরোবিতে থাকা ওই সংস্থার কর্মীদের কম্পিউটারে। অর্থাৎ, ব্যবহারকারীর একটি ভয়েস কমান্ড অজান্তেই নিজের অন্দরমহলের দরজা খুলে দিচ্ছে তৃতীয় পক্ষের কাছে। বেশ কিছু রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সেখানকার কর্মীরা প্রতিদিন এমন বহু ভিডিয়ো দেখেন, যেখানে এই স্মার্ট গ্লাস ব্যবহারকারীরা অজান্তেই নিজেদের অত্যন্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত রেকর্ড করে ফেলেছেন। এক কর্মীর কথায়, ‘আমরা সব দেখি—লিভিং রুম থেকে শুরু করে নগ্ন শরীর, সব।’ কেউ হয়তো জামাকাপড় ছাড়ছেন, কেউ শৌচাগার ব্যবহার করছেন, আবার কেউ হয়তো সঙ্গীর সাথে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে লিপ্ত— সব দৃশ্যই কেনিয়ার সেই কর্মীদের স্ক্রিনে ফুটে উঠছে।
বিষয়টি অবশ্য এমন হওয়ার কথা ছিল না। মেটা দাবি করেছিল, তাদের এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ব্যবহারকারীর ডেটা সুরক্ষিতভাবে ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, মেটা জানিয়েছিল যে, গোপনীয়তা বজায় রাখতে তাদের সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মুখ ঝাপসা করে দেওয়া হয়। কিন্তু ‘সামা’-র কর্মীদের মুখে শোনা গিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। নির্দিষ্ট কিছু আলোয় এই বিশেষ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিটি কাজ করে না। সেই কারণে অনেক সময়েই ভিডিয়োতে থাকা মানুষের মুখ স্পষ্ট দেখা যায়। তার মানে একটাই, আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় যাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন, বা আপনার বাড়িতে আসা কোনো অতিথির পরিচয়, কোনো কিছুই নাইরোবির ওই অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছে আর গোপন নেই। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রযুক্তির অপপ্রয়োগ হলে সহজেই ব্ল্যাকমেলিং বা সাইবার অপরাধের রাস্তা খুলে যাবে। কিছু আইনি নথিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, নিরাপত্তার ফাঁক গলে অসাধু কর্মীরা সংবেদনশীল ডেটা হাতিয়ে নিতে পারেন। সেখান থেকে খুব সহজেই ডার্ক ওয়েবের দুনিয়ায় সেইসব ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিয়ো পৌঁছে যেতে পারে।
বিতর্ক এড়াতে মেটার তরফে একটা অদ্ভুত দাবি করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, চশমার ফ্রেমে থাকা একটি ছোটো এলইডি আলো জ্বললে আশপাশের মানুষ বুঝতে পারবে যে, ভিডিয়ো রেকর্ড হচ্ছে। তাই সহজেই তাঁরা চাইলেই সতর্ক হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি একেবারেই আলাদা। অধিকাংশ মানুষই দিনের বেলা বা ভিড়ের মধ্যে ওই সামান্য আলোটুকু খেয়াল করতে নাও পারেন। কোনো ব্যবহারকারী চাইলে একটুকরো কালো টেপ বা এক ফোঁটা কালি দিয়ে সেই আলো ঢেকেও দিতে পারেন। গবেষকদের মতে, প্রাইভেসির নিরিখে এটা কোনো সুরক্ষা নয়। দায় ঝেড়ে ফেলার জন্য একটা কৌশল মাত্র।
বিপদের মাত্রা কতটা, তা হাতেকলমে দেখিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র—আনফু এনগুয়েন এবং কেইন আর্দাফিও। তাঁদের মতে, এই চশমায় কিছু পরিবর্তন করা হলেই তা একটা ‘স্টকিং টুল’ বা নজরদারি যন্ত্রে পরিণত হবে। তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে চশমাটি কোনো অপরিচিত ব্যক্তির দিকে তাকালেই ইন্টারনেটে থাকা কোটি কোটি ছবি ও তথ্য খুঁজে ওই ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, এমনকি বাবা-মায়ের নাম পর্যন্ত বার করে নেওয়া যাবে। আপনি হয়তো ক্যাফেতে বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন, আর আপনার পাশের টেবিলে এই চশমা পরা কেউ আপনার দিকে তাকিয়ে আপনার সমস্ত ইতিহাস জেনে ফেলছে—এটি আর কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার দৃশ্য নয়, ঘোর বাস্তব।
এই স্মার্ট গ্লাসে শুধু ক্যামেরা নয়, রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী ডাইরেকশনাল মাইক্রোফোনও। এই প্রযুক্তিই এখন প্রাইভেসির বড়ো শত্রু হয়ে উঠেছে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই মাইক্রোফোনগুলি শুধু ব্যবহারকারীর কথা নয়, পাশের টেবিলে হওয়া নীচু স্বরের কথাবার্তা বা ব্যক্তিগত আলাপচারিতাও রেকর্ড করতে পারে। আর এর মধ্যে দিয়েই ‘অডিও স্নুপিং’-এর এক নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছে। আবার ব্যবহারকারীরা অনেকেই কখনো কখনো একটি মারাত্মক ভুল করেন—কাজ শেষে চশমা খুলে রেখে দেন নাইটস্ট্যান্ড বা টেবিলের উপর। কিন্তু চশমার ক্যামেরা বন্ধ করতে ভুলে যান। ‘সামা’-র এক কর্মী জানিয়েছেন, তাঁরা এমন অনেক ফুটেজ দেখেছেন, যেখানে ব্যবহারকারী চশমা খুলে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী বা পরিবারের অন্য সদস্যরা ঘরে এসে পোশাক পরিবর্তন করছেন। চশমাটি তখন একটি স্থির সিসি ক্যামেরার মতো কাজ করে। অতি-আধুনিক এই চশমায় বিপদে পড়তে পারে আপনার পকেটও। অনেকেই এই বিশেষ চশমা পরে অনলাইনে কেনাকাটা করেন বা ফোনে ইউপিআই পিন দেন। ১২ মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় ক্রেডিট কার্ড নম্বর, সিভিভি কোড বা ফোনের পাসওয়ার্ডের মতো সংবেদনশীল তথ্য ধরা পড়ে যেতে পারে। আর কোনোভাবে কেনিয়ার সেই ডেটা সেন্টারে হ্যাকার হামলা হলে আপনার পুরো ব্যাংক অ্যাকাউন্টের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে ব্যক্তিগত জীবন, সবটাই পণ্য ডার্ক ওয়েবের পণ্য হতে পারে।
আমরা এখন এক অদ্ভুত প্যারাডক্সের মধ্যে বাস করছি। যে চশমার সুবাদে আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড আরও সহজ হওয়ার কথা ছিল, সেই চশমাই এখন আমাদের ব্যক্তিগত জগতকে অন্যের কাছে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। এই স্মার্ট গ্লাস আসলে আমাদের জীবনে ঢুকে পড়া এক ডিজিটাল স্পাই। আর তাই সতর্কতা নিতে হবে আমাদেরই। সেই কারণে শোওয়ার ঘর বা শৌচাগারে ঢোকার আগে, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বা ব্যক্তিগত আলোচনার সময় চশমাটি খুলে রাখুন। সতর্ক থাকুন ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংকের পিন টাইপ করার সময়েও। নাহলে চশমা আপনার পাসওয়ার্ড ‘দেখে’ ফেলতে পারে। সতর্ক থাকতে হবে চারপাশের মানুষজনের থেকেও। কারণ কার চোখে এই স্মার্ট গ্লাস রয়েছে, কে ওই চশমা দিয়ে আমার-আপনার অজান্তে ভিডিয়ো রেকর্ড করছেন, তা এক ঝলকে বোঝা সম্ভব নাও হতে পারে।
প্রযুক্তি নিজে ভালো-মন্দ বোঝে না। ব্যবহারকারীরা নিজেদের মতো করে তা ব্যবহার করে। তাই সাবধান হওয়ার সময় এখনই। না হলেই সাড়ে সর্বনাশ।