


সোমনাথ বসু, কলকাতা: বৃহস্পতিবার রাতে ফেডারেশন জানাল, অবসর ভেঙে ফিরছেন সুনীল ছেত্রী। জাতীয় দলের কোচ মানোলো মার্কুয়েজ, এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে আহ্লাদে ডগমগ। কেউ কেউ তো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে লিখেই ফেললেন, ‘কিং ইজ ব্যাক’। ভাবখানা এমন, ভারতীয় ফুটবলের মরা গাঙে বান এসেছে। কিন্তু বাস্তব উল্টোটাই বলছে। চালশে সুনীলের ফিরে আসা ভারতীয় ফুটবলের কঙ্কালসার চেহারা ফের তুলে ধরল। শোনা যায়, ফেডারেশন নাকি ‘ভিশন ২০৪৭’ নিয়ে ভীষণ আগ্রহী। যেনতেনপ্রকারেণ বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ভারতকে পৌঁছে দেওয়াই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু সত্যি তা নয়। কল্যাণবাবুদের লক্ষ্য এবং উপলক্ষ মিলেমিশে একাকার। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। কয়েক মাস আগে উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ে মাঠ উদ্বোধন হল। কলকাতার দুই প্রধানের রিজার্ভ টিম সেখানে খেলেও ফেলল। কিন্তু ওই রাজ্যেরই দল ইন্টার কাশীর (আই লিগের ক্লাব) হোম গ্রাউন্ড বাংলার কল্যাণী! তাহলে যোগীরাজ্যে মাঠ উদ্বোধন করে লাভ কী? উত্তর নেই কারও কাছে।
ফেরা যাক সুনীল ছেত্রী প্রসঙ্গে। সন্দেহ নেই, বাইচুং ভুটিয়ার পর তিনিই দেশের সেরা স্ট্রাইকার। চলতি মরশুমে আইএসএলে এখনও পর্যন্ত এক ডজন গোল রয়েছে তাঁর নামের পাশে (এরমধ্যে বেশ কয়েকটি অবশ্য পেনাল্টি থেকে)। গত ৬ জুন কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের ম্যাচ খেলে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন। চোখের জলে ভাসল ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। সুনীল জানতেন, বিদায়ের জন্য কলকাতার থেকে ভালো মঞ্চ আর কোথাও হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, জাতীয় দলের পরের ম্যাচ ছিল ১১ জুন। অর্থাৎ অবসরের ঠিক পাঁচদিনের মাথায়। কিন্তু সেই খেলাটি হবে কাতারে। তাই বিদায়বেলায় প্রচারের আলো শুষে নেওয়ার জন্য সুনীল কলকাতাকেই বাছলেন। বোঝাই যাচ্ছে, পরিকল্পনামাফিক কাজই করেছেন তিনি। তাহলে অবসরের মাত্র ৮ মাস পরে কোচ মানোলো মার্কুয়েজের অনুরোধে কেন তিনি ফিরে এলেন? স্প্যানিশ কোচ নিশ্চয়ই বুঝিয়েছেন, সুনীল ছাড়া ভারতীয় ফুটবল যেন মণিহারা ফণী। আর দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তো তাঁর রয়েইছে। দুইয়ে দুইয়ে চার এবং খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। মনে প্রশ্ন জাগে, বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচের আগে এই কর্তব্যজ্ঞান কি ভুলে গিয়েছিলেন সুব্রত ভট্টাচার্যের আদরের জামাই?
নতুনের জন্য পুরানোকে সবসময় জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। এটাই রীতি। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলে না আছে নীতি, আর না আছে স্থিতি। তাই এএফসি এশিয়ান কাপের যোগ্যতা পর্বের ম্যাচের আগে চল্লিশ পেরনো সুনীলকে ফেরানো হল! এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ (১৮৫), সিঙ্গাপুর (১৬০) ও হংকংয়ের (১৫৫) বিরুদ্ধে খেলবে ভারত। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের নিরিখে এই তিনটি দেশই টিম ইন্ডিয়ার থেকে অনেক পিছিয়ে। দূরদর্শী কোচ হলে এই সময়ে প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন স্ট্রাইকারদের সুযোগ দিতেন। কিন্তু মানোলো তো সেই পথের পথিক নন। তাই ফারুক চৌধুরী, ইরফান, ছাংতে, মনবীরদের স্কোয়াডে রেখেও তাঁর মন ভরল না।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে এখন ভারত ১২৬তম স্থানে। এগনোর কথা ভুলে গিয়ে শুধুই পিছনের দিকে তাকান। বিজেপি পরিচালিত ফেডারেশন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকলে এটাই ভবিতব্য। জুনিয়র লেভেল থেকে ফুটবলার তুলে আনার বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা নেই কল্যাণ চৌবে অ্যান্ড কোংয়ের। দেশের ফুটবল সংস্কৃতি তৈরি এবং তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রধান দায়িত্ব তো তাদেরই। কিন্তু কাজের কাজ করার সময় কোথায়? বরং নিজেদের মধ্যে কাদা ছুড়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি কলঙ্কিত করতে ব্যস্ত তাঁরা। দায় এড়াতে পারেন না কোচ মানোলো মার্কুয়েজও। তিনি আবার এফসি গোয়ারও দায়িত্বে! জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তাঁর পরিসংখ্যানে একবার চোখ বোলানো যাক। ভারত খেলেছে মোট চারটি ম্যাচ। জয় অধরা। তিনটি ড্র এবং একটি হার। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা কিংবা স্পেন নয়। সিরিয়া, মরিশাস, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়া।
তাই ভারতীয় ফুটবল মানে থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়। অনুরাগীরা প্রিয় ক্লাবকে মাথায় তুলে রাখুন। কিন্তু জাতীয় ফুটবলকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য শুধুই আবেগ যথেষ্ট নয়। চাই পরিকল্পনা এবং তাঁর সার্থক রূপায়ণ।