


বাংলা দেখল বেনজির এসআইআর। এবার সামনে এল ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াতেও বাংলাকে সবক শেখানোর মনোবাঞ্ছা! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাকে বাগে আনতে পুনর্নির্বাচন দাওয়াইকে ঢেলে সাজতেই বদ্ধপরিকর ইসিআই। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে বাংলার ভোটারদের উপর যে নির্যাতন নামিয়ে আনা হয়েছে, তাতে ইতি পড়েনি এখনো। প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর, শীর্ষ আদালতের নির্দেশে এখন চলছে বিচারাধীন (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) ভোটারদের সম্পর্কে আপত্তির নিষ্পত্তিকরণ প্রক্রিয়া। এই গুরুদায়িত্ব বর্তেছে একদল জুডিশিয়াল অফিসারের উপর। তবে বরাদ্দ সময়ের নিরিখে এমন হতভাগ্য ভোটদাতার সংখ্যা এতই বেশি যে কাজটি কবে শেষ হবে তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। কেননা, ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা কেবল সময়ের অপেক্ষা। আরো প্রশ্ন সামনে এসেছে, সকলের প্রতি সুবিচার করবে তো জাতীয় নির্বাচন কমিশন? সমস্ত যোগ্য ভোটার কি এবার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন? বাংলায় এসআইআর নিয়ে ইসিআই এযাবৎ যতরকম পদক্ষেপ করেছে তাতে ধরা পড়েছে তাদের পরিকল্পনায় গলদ, অদক্ষতা এবং গাফিলতির নানা দিক। এমনকি, তাদের একাধিক সিদ্ধান্ত অমানবিক বলেও নিন্দিত হয়েছে। তাই শেষ প্রশ্ন, বহু যোগ্য ভোটারকে কমিশনের পাপের বোঝা বইতে হবে না তো? বঞ্চিত হবেন না তো তাঁরা?
যাই হোক, এমন কিছু গুরুতর প্রশ্নে রাজনৈতিক মহলে যখন তোলপাড় চলছে ঠিক তখনই সামনে এল জ্ঞানেশ কুমারের জ্ঞানগর্ভ পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা ভোটগ্রহণ সংক্রান্ত। শীঘ্রই বাংলাসহ মোট পাঁচ রাজ্যে নতুন বিধানসভা গঠনের জন্য ভোট নেবে ইসিআই। কিন্তু বাকি চার রাজ্য—তামিলনাড়ু, কেরল, পুদুচেরি, অসম নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারদের তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তাঁরা আইনি অস্ত্র তাক করে আছেন কেবল পশ্চিমবঙ্গের দিকে! সম্প্রতি দুদিনের বঙ্গসফরে এসে ঠারেঠোরে একথাই বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি। রাজ্য প্রশাসনের উদ্দেশে কড়া বার্তা প্রদানের পাশাপাশি বাংলার ভোট নিয়ে নয়া ছক তৈরি ফেলেছে কমিশন। নিয়ম অনুযায়ী, বুথের অভ্যন্তরীণ অশান্তির প্রেক্ষিতে কমিশন পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিয়ে থাকে। এমন নির্দেশদানের সুস্পষ্ট গাইড লাইনও আছে। এবার সেই নিয়মকে বুথের বাইরেও এনে দাঁড় করানো হয়েছে। বলা বাহুল্য, কমিশনের এই অতিসক্রিয়তা স্রেফ বাংলার জন্য, অন্য চার রাজ্য এই বন্ধনীতে আসবে না। অর্থাৎ, আসন্ন বিধানসভা ভোটে কোনো বুথের বাইরে ১০০ মিটারের মধ্যে অশান্তির অভিযোগ প্রমাণে কমিশন সেখানে পুনর্নির্বাচন করাতে পারে। রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তা এবং নির্বাচনের কাজে নিযুক্ত নোডাল এজেন্সির প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে কমিশনের ফুল বেঞ্চের তরফে এই চরম বার্তাই শোনানো হয়েছে বলে খবর। আরো খবর, জ্ঞানেশ কুমার রাজ্য প্রশাসনের অফিসারদের জানিয়ে দিয়েছেন, এবার বুথের বাইরেও সিসি ক্যামেরা থাকবে! বলা বাহুল্য, এতদিন কেবল বুথের ভিতরেই সিসি ক্যামেরার নজরদারি চলেছে। এবার বুথের বাইরে ১০০ মিটার ও তার চেয়েও বেশি এলাকা চলে আসবে সিসি ক্যামেরা এবং কমিশনের নজরদারিতে। অতীতে কিছু বুথে সিসি ক্যামেরা বিকল করে দেওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফুল বেঞ্চের নিদান, এবার এমনটা হলেও পুনর্নির্বাচনের কোপে পড়তে হবে।
ঐতিহাসিক কারণেই বাংলার মানুষ যথেষ্ট রাজনীতি সচেতন। তারা জানে, কোন সরকারকে কখন ও কেন বিদায় দিতে হয় আর কোন সরকারের পুনর্নির্বাচনের পক্ষে থাকতে হবে। কিন্তু বাংলার মানুষের এমন বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তগ্রহণকে বাইরে থেকেই প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়ে থাকে। এটা আমরা সবচেয়ে ভালো দেখেছি ২০২১ সালে। সেবার দুশোর বেশি আসনে জিতে নবান্ন দখলের সংকল্প ঘোষণা করেছিল বিজেপি। বঙ্গ বিজেপির মেরুদণ্ড গঠিত হয়নি আজও। তাই ওই সংকল্প ঘোষিত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মুখ থেকে। কিন্তু একুশে তামাম গেরুয়া শিবিরের স্বপ্নভঙ্গ নিয়েই লেখা হয়েছিল বাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই যন্ত্রণা, আত্ম-অপমানও বটে, বিজেপির কারো পক্ষেই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ছাব্বিশের ভোটকে ‘হয় এবার, নয় নেভার’ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তারা নিয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের। কিন্তু গোষ্ঠী কোন্দলে দীর্ণ এবং অতিশয় দুর্বল সংগঠন নিয়ে বঙ্গে বিজেপির যে কিছুই হওয়ার নয়, তা একজন বালকও বোঝে। তাই তারা এসআইআরকে আঁকড়ে ধরেছিল খড়কুটোর মতোই। কিন্তু এসআইআর’ও যে শমীক ভট্টাচার্যদের যার পর নাই হতাশ করেছে তা বোঝাই যাচ্ছে। এবার তাঁরা ভরসা রাখছেন ভোটগ্রহণে কমিশনের অতিসক্রিয়তার উপর। এই রাজনৈতিক অনুমান সত্য হলে, গণতন্ত্রের জন্য তা এক দুঃসংবাদ। দক্ষ কমিশনের স্বচ্ছতার নীতি এবং নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিই বৃহত্তম গণতন্ত্রের শক্তি। কমিশনকে যেকোনো মূল্যে তা রক্ষা করতে হবে।