


অনেক সময় বাচ্চার অতিরিক্ত প্রগলভ আচরণ বাইরের লোকের কাছে অস্বস্তি ও বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। কীভাবে শিশুকে সামাজিক আচরণ শেখাবেন? রইল বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।
ঘটনা ১
তিতিন বড্ড দুষ্টু। সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ায় সে সারাদিন। তার পিছনে ছুটতে ছুটতেই বাড়ির বড়রা নাজেহাল। তবু সেই অর্থে শাসন তাকে কেউ করে না। বাবা মায়ের স্ট্যান্ডার্ড কথা, ‘বাচ্চা দুষ্টুমি করবে না তো কে করবে?’ কিন্তু প্রশ্রয় পেতে পেতে তিতিনের দুষ্টুমিরও বাঁধ ভাঙছে। বাড়িতে তো বটেই, বাইরে গিয়েও যেমন ইচ্ছে আচরণ চলছে তার। রেস্তরাঁয় গিয়ে ডিগবাজি খেয়ে পাশের টেবিল থেকে চেয়ার উল্টে দেওয়া থেকে প্লে স্কুলে বন্ধুর টিফিন ছুড়ে ফেলে দেওয়া, কোনও কিছুই বাদ যাচ্ছে না। বাবা মা তাও কেমন যেন উদাসীন। স্কুলে তাকে নিয়ে নিত্য অশান্তি। এক মাসে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কারণে পেরেন্টস কল-এর পর এবার একটু টনক নড়েছে বাবা মায়ের।
ঘটনা ২
অতিরিক্ত শান্ত আর লাজুক বাচ্চা মেহের। একেবারে শিশু বয়সে কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। কিন্তু একটু বড় হতেই দেখা গেল বাড়ির চেনা গণ্ডির বাইরে গেলেই সমস্যা হচ্ছে তার। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে রীতিমতো কান্নাকাটি শুরু করছে মেহের। বাবা মা বা বাড়ির অন্যান্যরাও একটু অপ্রস্তুত মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে। শেষ পর্যন্ত মাত্র দেড় বছর বয়সেই তাকে প্লে স্কুলে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন এক মন্টেসরি টিচার। তারপর থেকেই একটু একটু করে স্বাভাবিক আচরণে ফিরছে মেহের।
বাচ্চার আচরণ ও সেই সংক্রান্ত সমস্যা নতুন কোনও বিষয় নয়। অনেক সময়ই দেখা যায় প্রাথমিকভাবে বাড়ির প্রশ্রয়ের কারণেই বাচ্চা ক্রমশ অবাধ্য হয়ে ওঠে। আবার কোনও শিশু অতিরিক্ত লাজুক হলেও বাড়িতে বড়রা সেদিকে খুব একটা নজর দেন না। তাঁরা ভাবেন বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তেমনটা হয় না। বাচ্চার আচরণ বিষয়ে বাবা মায়ের প্রথম থেকেই মনোযোগী হওয়া উচিত, বললেন এক বেসরকারি প্লে স্কুলের হেডমিস্ট্রেস অনন্যা ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, ‘বাচ্চারা সাধারণভাবেই দুরন্ত বা শান্ত যা-ই হোক না কেন, তাদের কিছু সামাজিক নিয়ম ছোট থেকেই শেখানো প্রয়োজন। আর সেই নিয়মগুলো খেলার ছলেই শিখেয়ে দেওয়া যায়।’ কেমন সেই নিয়ম? আর কীভাবেই বা বাচ্চাকে সামাজিক হতে শেখাবেন?
প্লে ডেট নির্বাচন
আজকাল অধিকাংশ বাচ্চাই বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বড়জোর দু’টি বাচ্চা বাড়িতে একসঙ্গে বড় হয়। ফলে সমবয়সিদের সঙ্গে মেলামেশা, খেলাধুলোর সুযোগ বাচ্চারা পায় না বললেই চলে। আর এই সমবয়সি মেলামেশার অভাবেই বাচ্চারা আচরণগত কিছু সমস্যায় ভোগে। ফলে তাদের যতটা সম্ভব সমবয়সি পরিমণ্ডল দিতে পারলে তাদের সামাজিক আচরণ সঠিক থাকবে। এই প্লে ডেট কোনও পার্কে হতে পারে, কোনও বাচ্চার বাড়িতে হতে পারে বা স্কুলের কোনও পিকনিক ইত্যাদিতেও হতে পারে। তাতে বাচ্চা নিজের বয়সিদের সঙ্গে সময় কাটাবে, তাদের সঙ্গে খেলা করতে শিখবে, নিজের জিনিসপত্র ভাগ করতে বা শেয়ার করতেও শিখবে। বড়দের অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের বদলে খানিকটা সময় নিজের দায়িত্ব নিয়ে চেনা গণ্ডির বাইরে সময় কাটালে বাচ্চার মানসিক উন্নতিও হবে। এই প্লে ডেটে বাচ্চার বায়না শোনা বা চাহিদা মেটানোর কেউ থাকে না বলে সে এই ধরনের আচরণ করবেই না। তাই এই প্লে ডেট যত বাড়বে ততই বাচ্চার আচরণ স্বাভাবিক হতে থাকবে। সমবয়সিদের প্রতি বাচ্চার মনোভাব বদলে যাবে। সে বন্ধুত্ব করতে শিখবে। বন্ধুর সঙ্গে নিজের জিনিসপত্র ভাগ করতে শিখবে, গল্প করতে শিখবে, তার সঙ্গে নিজের ভাবনাগুলো বলতে ও তার কাছ থেকে তা শুনতে শিখবে। এগুলো তার স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য খুবই প্রয়োজন। এতে শিশুর ধৈর্য, মনোযোগ, শোনার অভ্যাস, চুপ করে থাকার প্রবণতা ইত্যাদি বাড়বে।
সহানুভূতির শিক্ষা
এক্ষেত্রে বাবা মাকে বিশেষ নজর দিতে হবে বাচ্চার আচরণের দিকে। তাকে অন্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। অন্যের কষ্টে তার প্রতি সহানুভূতির আচরণ শেখাতে হবে। অন্যকে সাহায্য করার শিক্ষা দিতে হবে। এগুলো সবই রোজকার কাজের মাধ্যমেই শেখানো যায়। কয়েকটা উদাহরণ দিলেন অনন্যা। তাঁরা কথায়, ‘রোজ বাবা মাকে ছোট ছোট কাজে বাচ্চা সাহায্য করুক। যেমন খাবার পরিবেশনের সময় তাকেও সেই কাজের অংশীদার করে নেওয়া হোক। বাচ্চার নিজের বই খাতা গোছানোর ভার তাকেই দেওয়া হোক। প্রথমে ভুল হবে। হয়তো গোছানোর বদলে চারদিকে বইপত্র ছড়াবেই বেশি, কিন্তু ধৈর্য ধরে বাবা মাকে এই কাজ শেখাতে হবে। ক্রমশ বাচ্চা নিজের কাজ নিজেই করতে শিখে যাবে। এরপর হল সহানুভূতির পাঠ। পুতুল দিয়েই তা শুরু করতে পারেন। পুতুলের লাগলে তাকে আদর করে দিতে হবে, পশু পাখি, প্রকৃতির প্রতি তাকে আগ্রহী হতে হবে, এই ধরনের ছোটখাট শিক্ষার মাধ্যমেই বাচ্চাকে সহানুভূতির পাঠ দেওয়া সম্ভব। তাহলেই দেখবেন সে স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের মারধর করছে না বা তাদের টিফিন কেড়ে নিচ্ছে না।
বায়না নয়
আজকাল বাবা মায়েরা সকলেই কাজে বেরিয়ে যান। বাচ্চা অনেকটা সময় পরিচারিকা বা আয়ার কাছে থাকে। সেই কারণে অনেক বাবা মা অপরাধবোধ থেকে বাচ্চাকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেন। অনেক সময় ঠাকুরমা দিদিমা স্থানীয়রাও এই কাজ করে থাকেন। বাচ্চার বায়না করার প্রবণতা সেই থেকেই বৃদ্ধি পায়। সে ভাবে, যে কোনও জিনিস নিয়েই জেদ করা যায়। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে সেই জেদ বা বায়না খাটে না। ফলে শিশুমন প্রচণ্ড ধাক্কা খায় এবং সেই থেকে তার মধ্যে রাগ, আচরণগত সমস্যা ইত্যাদি তৈরি হয়। এগুলো একেবারে শিশু বয়স থেকেই কাটানো যায়। বাবা মায়ের সামান্য সচেতনতার মাধ্যমেই তা সম্ভব, জানালেন অনন্যা। তাঁর কথায়, মা এবং বাবা দু’জনকেই বাচ্চার সঙ্গে কথাবার্তার মাধ্যমে এবং নিজেদের আচরণ দিয়ে বোঝাতে হবে যে সে যা চাইবে তা-ই পাবে, এমন নয়। বাবা মা দু’জনেই প্রয়োজনে বাইরে বেরচ্ছেন এবং বাচ্চাকে সেই সময় বাড়িতে অন্যের কাছে রেখে তাঁরা কোনও অপরাধ করছেন না, এগুলো বাবা মায়ের নিজেদেরও বুঝতে হবে এবং বাচ্চাকেও বোঝাতে হবে। বাচ্চার জেদ বা বায়নাকে কোনও সময়ই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। খুব ধৈর্যের সঙ্গে বাচ্চাকে বোঝাতে হবে যে তার আচরণ ভুল। তার জন্য আবার বকাঝকা, মার ইত্যাদির আশ্রয় নেওয়া যাবে না কখনওই। তাহলেও শিশুমনে তার প্রভাব পড়বে এবং তার স্বাভাবিক বাড়বৃদ্ধিতে সমস্যা
দেখা যাবে।
ঘরে বাইরে আচরণ
বাড়িতে নিজের লোকের মাঝে একরকম ব্যবহার আর বাইরে গেলে অন্য ব্যবহার করার কায়দা বাচ্চাকে একেবারে শিশু বয়স থেকেই শেখাতে হবে। এটা স্কুলে অনেকটাই শেখানো হয়, কিন্তু বাবা মাকেও এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। অর্থাৎ বাচ্চা যখন বাইরে যাচ্ছে তখন সে অতিরিক্ত কথা বলবে না, বড়দের কথার মাঝে কোনও কথা বলবে না, তাকে প্রশ্ন করলে উত্তর দেবে, শান্ত হয়ে এক জায়গায় বসে থাকবে এই ধরনের কিছু শিক্ষা বাচ্চাকে ছোট থেকেই শেখানো উচিত। অনেক শিশু বন্ধুর বাড়ি গিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, যে কোনও কথায় কথা বলে, অন্যের জিনিসে হাত দেয় এগুলো যে অনুচিত সেটা তাকে বলে দিতে হবে। কখনও রেস্তরাঁয় গেলে, কোথাও বেড়াতে গেলেও বাইরের জগতে তার আচরণ কেমন হওয়া উচিত সেই শিক্ষা বাবা মা তাকে দিয়ে দেবেন। যে কোনও জায়গায় গেলে একটা ডিসিপ্লিন মেনে চলার শিক্ষা তাকে দিতে হবে। এক জায়গায় বসা, অতিরিক্ত হুড়োহুড়ি না করা, অপ্রয়োজনে কথা না বলা এই ধরনের শিক্ষাগুলো ছোট বয়স থেকেই বাবা মা বাচ্চাকে শেখাবেন। তাহলে অকারণে অপ্রস্তুত হতে হবে না। বাচ্চাও সহবৎ শিখে যাবে।
আচরণগত শিক্ষা
একেবারে ছোট থেকেই বাচ্চাকে আচরণগত শিক্ষা দিতে হবে। এবং সেই শিক্ষা কিন্তু ঘরে এবং বাইরে দু’ক্ষেত্রেই দরকার। অনেক সময় বাচ্চা জেদ করতে করতে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। কোনও কিছু না পেলে তাই নিয়ে মন কষাকষি, রাগারাগি, চিৎকার, কান্না ইত্যাদি চলতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত বাবা মা বাধ্য হন বাচ্চার চাহিদা মেটাতে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বাচ্চাকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যে সে কান্নাকাটি, চিৎকার, জেদ কোনওটাই করবে না। তাকে ভদ্রতা শেখাতে হবে। ঘরে এবং বাইরে কিছু আচরণগত নিয়ম রয়েছে যা তাকে মেনে চলতে শেখাতে হবে। অন্য লোকের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলা, বড়দের মুখে মুখে তর্ক না করা, বয়স্কদের প্রতি উদ্ধত আচরণ না করা, এইসবই ছোট থেকে শিশুকে শেখাতে হবে। এগুলো না শিখলে কিন্তু সেই বদভ্যাস নিয়েই বাচ্চা বড় হয় এবং পরবর্তীতেও তার গুরুতর ব্যবহারিক সমস্যা দেখা যায়।
রূঢ় নয়, নম্র
বাচ্চাকে একেবারে শিশু বয়স থেকে নম্র আচরণ শেখাতে হবে। আস্তে কথা বলা, অহেতুক রেগে না যাওয়া, ভালো করে কথা বলা, হাসিমুখে উত্তর দেওয়া এই ধরনের শিক্ষাগুলো তাকে দিতে হবে। যদি বাবা মা দেখেন, বাচ্চা বাড়ির পরিচারিকা বা গাড়ি চালকের সঙ্গে খারাপভাবে কথা বলছে, তাহলে তাকে সাবধান করে দিতে হবে। কথা বলার ধরন শেখাতে হবে। যদি বাচ্চা রূঢ়ভাবে কথা বলে তাহলেও তাকে সতর্ক করতে হবে। কথা বলার ধরন বিষয়ে তাকে শিক্ষা দিতে হবে। অনেক বাচ্চা মায়ের মুখে মুখে কথা বলে, মাকে গুরুত্ব দেয় না। এগুলো যাতে তার অভ্যাসে পরিণত না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। প্রয়োজনে বাচ্চাকে শাসন করার অধিকার পরিচারিকাকেও দিতে হবে।
নিজে সংযত হন
মনে রাখবেন শিশু যা দেখে, তা-ই শেখে। ফলে নিজেদের আচরণেও সংযত হতে হবে। বাবা মা যদি সারাক্ষণ ঝগড়া করেন, বড়দের মুখে মুখে তর্ক করেন, বাড়ির পরিচারিকার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন তাহলে বাচ্চাও সেই শিক্ষা নিয়েই বড় হবে। তখন সে বাড়িতে তো বটেই, এমনকী বাড়ির বাইরেও সেই আচরণই করবে এবং অন্যের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে বাবা মায়ের দিক থেকেও আচরণগত সচেতনতা খুবই দরকার। বাবা মা যদি সব বিষয়ে নিজেদের জাহির করেন, নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে বাচ্চাও সেই শিক্ষায় বড় হয়ে সব বিষয়ে কথা বলবে। অন্যকে গুরুত্ব দিতে শিখবে না। এগুলো যাতে না হয় সেদিকে বাবা মাকে নজর রাখতে হবে।
আদর ও শাসন
বাচ্চাকে যেমন বোঝানো প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজনে বকুনিও দিতে হবে। তাকে পরিস্থিতি বিষয়ে বুঝদার করে বড় করুন। বাইরে গেলে তার আচরণ কেমন হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানান। কখন সে কথা বলবে এবং কখন চুপ করে থাকবে তা প্রয়োজনে উদাহরণ সহ তাকে বুঝিয়ে দিন। অতিরিক্ত লজ্জা পাওয়া বা অন্যের প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াও যে এককরম রূঢ় আচরণ, সেটাও তাকে বোঝান। অনেক শিশু স্কুলে গেলে সপ্রতিভ হয়ে ওঠে। যারা হয় না, তাদের সঙ্গে গল্প করে, আলোচনায় তাদের অংশীদার করে আচরণগত সপ্রতিভভাব আনতে হবে। এরপরেও যদি বাচ্চা ‘বেয়াড়া’ আচরণ করে তাহলে তাকে শাসন করতে হবে। প্রয়োজনে সবার সামনেই কড়া হতে হবে। বাবা মায়ের অনুচিত প্রশ্রয় কিন্তু শিশুর স্বাভাবিক আচরণের পথে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। এই সহজ কথাটা বাবা মাকে বুঝতে হবে এবং সেই মতো শিশুর সামাজিক ব্যবহারের প্রতি নিজেদের সচেতন নজর রাখতে হবে।
--- কমলিনী চক্রবর্তী