


সংবাদদাতা, তেহট্ট: একসময় শ্রাবণ মাস এলেই গ্রামের পথঘাট মুখর হয়ে উঠত ঢাকের তালে আর ঝাপান গানের সুরে। কাঁধে মা মনসার প্রতীক, হাতে ঢাক বা করতাল নিয়ে শিল্পীদের দল ঘুরে বেড়াতেন বাড়ি, বাড়ি। তাঁদের কণ্ঠে শোনা যেত বেহুলা-লখিন্দর, চাঁদ সদাগর ও মা মনসার মাহাত্ম্যের কাহিনি। সেই সুরে জেগে উঠত বাংলার লোক ঐতিহ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঝাপান গান বিস্মৃতির পথে।
জেলার বিভিন্ন গ্রামে এখনও হাতে গোনা কয়েকটি দল এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বাড়ি, বাড়ি গিয়ে তাঁরা শুধু গানই শোনান না, নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেন বাংলার প্রাচীন লোকসংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ইতিহাস। কিন্তু আগের মতো আর মানুষের ভিড় হয় না। মোবাইল ফোন, টিভি, গুচ্ছ সামাজিক মাধ্যম এবং আধুনিক বিনোদনের দরজা উন্মুক্ত হতেই লোকগানের আবেদন ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় এই শিল্পীরা গান গেয়ে যে সামান্য অর্থ সংগ্রহ করেন, তা কিন্তু নিজেদের সংসারের জন্য নয়। সেই অর্থ দিয়ে ফি-বছর মা মনসার পূজা ও ঝাপান উৎসবের আয়োজন হয়। লোকঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টাই তাঁদের এগিয়ে নিয়ে চলেছে বছরের পর বছর।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, ঝাপান গান শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য ও গ্রামীণ জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। অথচ পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, আর্থিক অনটন এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে এই শিল্প আজ বিলুপ্তির মুখে।
শিল্পী নিতাই মণ্ডল, শিবেন হালদারদের আক্ষেপ, একসময় ঝাপান গানের অপেক্ষায় বসে থাকতেন গ্রামের মানুষ। এখন অনেকেই দরজা পর্যন্ত খোলেন না। তবু ঐতিহ্যের টানেই তাঁরা রাস্তায় নামেন। কারণ তাঁদের বিশ্বাস, মা মনসার মাহাত্ম্য ও বাংলার লোক সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক আগামী প্রজন্মের মধ্যেও।