


ক্ষমতা দখলের উদগ্র বাসনা নিয়ে তিন সপ্তাহ আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল আমেরিকা-ইজরায়েল। এর পালটা জবাব দিচ্ছিল ইরান। দু’পক্ষের লক্ষ্যই ছিল মূলত সামরিক পরিকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলি। কিন্তু বুধ ও বৃহস্পতিবার হামলার অভিমুখ আচমকাই পালটে গিয়েছে। যুযুধান দু’পক্ষের নতুন লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি ক্ষেত্রগুলি। একদিকে আমেরিকার মদতে ইজরায়েল পশ্চিম ইরানের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস কেন্দ্র সাউথ পারসে আক্রমণ করে। পালটা ইরান ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় কাতারের গ্যাস রিফাইনারি, আবুধাবির হামশান গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র এবং সৌদি আরামকো ও এক্সনমোবিলের যৌথ মালিকানাধীন শোধনাগারে। আমেরিকা ইজরায়েলকে সমুচিত জবাব দিতে একে একে সৌদি আরব, সংযুক্ত আমিরশাহি, কুয়েত, বাহরিনের জ্বালানি কেন্দ্রগুলিতে আক্রমণ চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় এই দেশগুলি বিশ্বের এক বৃহৎ অংশের গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সেই প্রাণকেন্দ্রগুলি আক্রান্ত হওয়ায় ইওরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়া জুড়ে এক অজানা সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে অশোধিত ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলার ছুঁয়ে ফেলেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৭০ ডলারের কাছাকাছি। একদিকে সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে শেষমেশ পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে— তা বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞরাও ঠাওর করতে পারছেন না।
প্রত্যাশিতভাবেই ইরান যুদ্ধ এবং তার জেরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ভারতের উদ্বেগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনিতে রান্নার গ্যাস এলপিজি এবং প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি জোগান নিয়ে নয়াদিল্লির ঘুম ছুটেছে। এখন আরও বড়ো আশঙ্কা নিয়ে হাজির হয়েছে জ্বালানি তেল। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে অশোধিত ‘ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলে’র দাম ১৪৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশে এনে পরিশোধন করতে হয়। তার খরচ আলাদা। তাই ভারত বিভিন্ন ধরনের তেল আমদানি করে। মিলিয়ে মিশিয়ে কেনা এই তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ব্যারেল পিছু ৬৯ ডলার। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১৪৬ ডলার। শীঘ্রই তা ১৫০ ডলার ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা। তেল আমদানির এই খরচ যেভাবে দিন দিন বাড়ছে, তাতে দেশের পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একটি সূত্রের অবশ্য দাবি, এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার ভোট হতে চলেছে। তাই তার আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে ভোটে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই ভোট মিটলেই সাধারণ পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়াতে পারে কেন্দ্র, সে আশঙ্কা থাকছেই। তবে প্রিমিয়াম জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই অবস্থায় আগামী প্রায় দেড় মাস পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে নাকি কথাবার্তা শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। উদ্দেশ্য, যুদ্ধরত দেশগুলি যাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তেল আমদানির খরচ অচিরে কমবে, পেট্রল ডিজেলের দামও বাড়বে না— এমন সম্ভাবনা কম। অন্তত মোদি জমানায় সেই আশা করা বৃথা। যদিও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির চাপ সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে না দিয়ে কোনো বিশেষ নীতি গ্রহণ করাই জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব।।
একইরকম সংকট দেখা দিয়েছে গ্যাসের ক্ষেত্রেও। ভারতের প্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাসের ৯০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৫০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এর সিংহভাগই আসে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে। শুধু কাতার থেকেই ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদার ২০ শতাংশ আমদানি করা হয়। এই অবস্থায় গত তিন সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কার্যত ভারতের অধিকাংশ জাহাজ চলাচল করতে পারেনি। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো গত একদিনে গ্যাস ও জ্বালানি কেন্দ্রগুলি আক্রান্ত হওয়ায় অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো থেকে গ্যাস আমদানির চেষ্টা করছে ভারত। রান্নার গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন ৪০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি কেন্দ্রীয় সরকারের। কিন্তু বিকল্প পথে গ্যাস আনলে আমদানি খরচ আরও বাড়বে কি না এবং তার জেরে ফের গ্যাসের দাম বাড়বে কি না— সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাবে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্র কতটা বিপদে পড়বে, তা সামাল দেওয়া হবে কোন উপায়ে— তা নিয়েও বিস্তর উদ্বেগ ছড়িয়েছে। তেলের ছ্যাঁকায় শেয়ার বাজারে ধসের পাশাপাশি টাকার দরের পতনও হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা অমূলক নয়। সব মিলিয়ে তাই পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের গনগনে আঁচ সরাসরি ধাক্কা দিয়েছে ১৪৫ কোটি ভারতবাসীর অন্দরমহলে। ফলে এই যুদ্ধ শেষ হলে জিনিসের দামের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার লড়াই জারি থাকবে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতে মোদি সরকার কী কী পদক্ষেপ নেয় সেটাই এখন দেখার। ভরতুকি দিয়ে বা অন্য উপায়ে সমস্যা মোকাবিলা করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের কর্তব্য।