


সৌরাংশু দেবনাথ, কলকাতা: পাশাপাশি দাঁড়ালে চেনা মুশকিল, কে আসল আর কে নকল! বুধবার বিকেলে মধ্য কলকাতার এগারতলার ছাদে সুনীল নারিন এবং তাঁর ‘হামসকল’ এমনই বিভ্রমের জন্ম দিলেন। ভালো করে যাচাই করলে অবশ্য তফাতগুলো স্পষ্ট। আসলজন একটু লম্বা, তুলনায় পাতলা, থুতনির দাড়িতে অল্প পাকও ধরেছে। পরনে সাদা টিশার্ট। আর গুরগাঁওয়ের ‘ডুপ্লিকেট’ অজয় কাপুর পরেছেন কালো টিশার্ট। একই সময়ে যদি দুই জায়গায় যেতে হয়, তাহলে কে কোথায় যাবেন? নারিনের চটজলদি উত্তর, ‘আমি বাড়িতে যাব। ও তখন নারিন সেজে পার্টি করুক না!’
বাড়ির মতো আর একটা জায়গাতেও দরকার ‘আসল’ নারিনকে। আর তা অবশ্যই বাইশ গজ। সোনালি-বেগুনি জার্সি গায়ে এটা তাঁর ১৪ বছর। কলকাতার রসগোল্লা নাই বা মুখে তুললেন, এ শহরের হৃদস্পন্দন তাঁর ভালোই চেনা। দলের সাফল্য-ব্যর্থতায় সমর্থকদের উল্লাস-হতাশা স্পর্শ করে তাঁকেও। ক্যারিবিয়ান মহাতারকার মতে, ‘কেকেআর আমার কাছে পরিবারের মতো। চাপ থাকবেই। বিভিন্ন পরিস্থিতি, বিভিন্ন কন্ডিশনে ব্যাটে-বলে সেরাটা মেলে ধরাই লক্ষ্য।’
৩৬ বছর বয়সির জীবনে উত্থান-পতন কম নেই। বার বার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে পড়তে হয়েছে প্রশ্নের মুখে। নিজেকে বদলে ততবারই ফিরেছেন তিনি। স্পিনের রহস্য হয়তো কমেছে, কিন্তু নিঁখুত নিশানা আর নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে। তিন-তিনবারের আইপিএলজয়ী অবশ্য নিরুত্তাপ। উইকেট নেওয়ার পর যেভাবে নিজেকে মুড়ে রাখেন সংযমে, তেমনই উদাসীন ভঙ্গিতে বললেন, ‘পরিস্থিতি যাই হোক, বাড়তি আবেগ দেখাই না। লোকে যেন আমাকে এমন একজন ক্রিকেটার হিসেবে মনে রাখে, যে সাফল্যের খুশিতে ভেসে যায় না, আবার ব্যর্থতাতেও ভেঙে পড়ে না।’ কে বলবে ইনি দু’হাত উল্কিতে ভর্তি করা এক ক্যারিবিয়ান? গলায় যে ভগবতগীতার বাণীই উচ্চারিত!
গত মরশুমে কেকেআরের ট্রফি জয়ের অন্যতম কারিগর ১৭টি উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাটে করেছিলেন ৪৮৮ রান। তবু দম্ভের ছিঁটেফোটা নেই বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। এমনকী, শ্রেয়স আয়ারের ছেড়ে যাওয়া নেতৃত্বের আসনে বসার সামান্যতম ইচ্ছা নেই। ওপেন করতে চান কিনা, সেটাও বলবেন না। টিমম্যান নারিন সবেতেই দেখাচ্ছেন টিম ম্যানেজমেন্টকে। শনিবারের আরসিবি ম্যাচে বিরাট কোহলির উইকেট চাই, এমন গর্জনও ছাড়লেন না। বরং নিষ্পৃহ ভঙ্গিতে শোনালেন, ‘আমি উইকেট পাওয়ার চেয়েও বেশি জরুরি দলের জয়।’ শচীন তেন্ডুলকর নাকি কোহলি, কাকে বল করা কঠিন মনে হয়েছে? এবারও যথারীতি ধোঁয়াশা, ‘ওভাবে দেখি না। নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি। কোনও দিন আমি হাসি, কোনওদিন ব্যাটসম্যান।’ বরুণ চক্রবর্তীর প্রশংসায় অবশ্য উচ্ছ্বসিত তিনি। নারিন-বরুণের আট ওভার যে দুরন্ত ঘূর্ণিজাল হয়ে ফাঁস পরাবে প্রতিপক্ষের গলায়, সেই হুমকিও থাকছে।
বাটার চিকেনের ভক্ত নারিনের কাছে প্রথম আইপিএল জেতাই সবচেয়ে মধুর স্মৃতি। এবার কি চতুর্থ ট্রফি আসবে? দু’কানে দুল পরা মোহক চুলের মালিকের বিশ্লেষণ, ‘সবাই নিজের ভূমিকা জানে। অধিনায়ক রাহানের অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট। মেন্টর ডোয়েন ব্রাভোর আবার এই ফরম্যাটে সবচেয়ে বেশি উইকেট রয়েছে। কীভাবে জিততে হয়, ও জানে। আইপিএলে কোনও ম্যাচই সহজ নয়। ক্রমশ কঠিন হচ্ছে টুর্নামেন্ট।’ তবে সেই চ্যালেঞ্জ নিতে বরাবরের মতোই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নাইটদের তুরুপের তাস!