


রাজনীতির জন্ম ‘অস্বস্তি’ লগ্নে! তবে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি বিরোধী শিবির শোনায় না, সেটি শুনিয়ে দেয় ঘরের মানুষেই। মুরলীমনোহর যোশির সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকার তাই নিছক কোনো প্রবীণ বিজেপি নেতার ক্ষোভপ্রকাশ হিসাবে দেখার বিষয় নয়। তিনি দলের দুর্দিনের অন্যতম নায়ক কিন্তু বর্তমান নেতৃত্বের আর প্রতিদ্বন্দ্বী নন। সক্রিয় ক্ষমতার কেন্দ্রেও তাঁর অবস্থান নয়। বরং এই কারণেই তাঁর কথাগুলির রাজনৈতিক অভিঘাত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য: প্রত্যেক সরকারই ক্ষমতায় থাকতে চায় এবং অতীতে তাঁর নিজের দলও ক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে সেন্সাস এবং ডিলিমিটেশন পিছিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে যে ভয়াবহ বিতর্ক উপস্থিত, তাকে আরও কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাঁর এই সাহসী স্বীকারোক্তি। তবে তাঁর বক্তব্যকে এসআইআর সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ মেনে নেওয়ার অবকাশ নেই, বরং সেটি ক্ষমতা ও নির্বাচনি প্রতিষ্ঠানের ‘সম্পর্ক’ বিষয়ে প্রবল এক সতর্কসংকেত! যোশি যথার্থই বলেছেন, ‘গণতন্ত্রই হল সরকার পরিচালনার সর্বোত্তম রূপ। তবে তার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ হতে হয়। জবাবদিহি করতে হয় সরকারকে। আমলাতন্ত্রের স্বচ্ছতা জরুরি। আস্থা না-থাকলে ভালো জিনিসও মানুষ নেবে না। প্রতিবাদের আবহ তৈরি হলে তার সমাধান প্রয়োজন। লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে পড়লেই সুরাহা মেলে না।’ অর্থাৎ গণতন্ত্র তখনই সার্থক যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নিরপেক্ষভাবে, সরকার জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকে এবং আমলাতন্ত্র পরিচালিত হয়ে থাকে স্বচ্ছতার নীতিতে। হায়, এসব আমরা শেষ কবে ঠিকঠাক দেখেছি? যাবতীয় ঝামেলা অশান্তির নেপথ্যে তো শীর্ষস্তরের রকমারি বিচ্যুতি।
আর এখানেই আসল প্রশ্নটি। নির্বাচনি তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যদি নাগরিকের মনে এই সন্দেহ তৈরি করে যে, এর পিছনে সংকীর্ণ রাজনীতি রয়েছে তবে কেবল সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেই সন্দেহ নস্যাৎ করা যায় না। গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যায় নয়, জনগণের ভরসায় আস্থায় বিশ্বাসে। ভোটার তালিকায় একটি নাম বাদ পড়া বা যুক্ত হওয়ার প্রশাসনিক ঘটনা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল—নিয়মটির প্রয়োগে কোনোরকম বৈষম্য হচ্ছে কি না তা নিয়ে নাগরিক কতটা নিশ্চিত থাকবেন? যোশি সেই জায়গাটিই চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবাদের সদুত্তর দিতে হয়, ‘লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে’ তা দমানো অনুচিত। তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ প্রসঙ্গে তাঁর প্রশ্ন আরও প্রত্যক্ষ—চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোথায় সেই প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান? রাষ্ট্রের কাছে এর চেয়ে অস্বস্তিকর খোঁচা আর কী হতে পারে? যুবসমাজকে বিরাট খোয়াব দেখিয়ে পরে তার বাস্তব ভিত্তি অদৃশ্য হলে ক্ষোভ জন্মাবেই—এটি কোনো দল-বিরোধী স্লোগান নয়, শাসনের মৌলিক দায়ভারের প্রশ্ন। যোশির আপত্তি অবশ্য শুধু নির্বাচন বা চাকরিতে সীমিত নয়। উন্নয়নের নামে হিমালয়ে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করার আশঙ্কা, বদ্রীনাথের ধর্মীয় পরিবেশে বাণিজ্যিক বিনোদনের অনুপ্রবেশ এবং অযোধ্যার রামমন্দির ট্রাস্টের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দায়িত্ব ও জবাবদিহির কথা বলেছেন। রামমন্দির আন্দোলনের অন্যতম পুরানো মুখের মুখে ট্রাস্টের কার্যকলাপের দায় সরকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার বার্তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে অভিযোগ মানেই অপরাধের প্রমাণ নয়, তদন্ত ও প্রমাণের জায়গাটি অক্ষুণ্ণ রাখতেই হবে।
সবশেষে যে-কথাটি আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবায়, সেটিই যোশির তরফে সবচেয়ে বড়ো সতর্কবার্তা—‘দেশ পথ হারিয়েছে।’ এই বাক্যকে রাজনৈতিক রায় হিসাবে নয়, ক্ষমতার ভিতর থেকে উচ্চারিত এক সতর্কসংকেত হিসাবেই দেখা উচিত। তিনি একইসঙ্গে বলেছেন, ভারত অতীতে ভুল করেছে, আবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পথেও ফিরেছে। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে হতাশা যতটা, আত্মসংশোধনের প্রত্যাশা ততটাই। গণতন্ত্রে কোনো সরকার চিরস্থায়ী নয়, প্রশ্নাতীত নয় কোনো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। ক্ষমতার স্থায়িত্বের চেয়ে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা বড়ো, প্রচারের অধিক গুরুত্ব বহন করে জবাবদিহিতা আর উন্নয়নের গতির চেয়ে ‘উন্নয়নের চরিত্র’ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশয়, যুবসমাজের ক্ষোভ, পরিবেশের সংকট এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা—সবকিছুর জবাব যদি একটিই হয়—‘আমাদের উপর বিশ্বাস রাখুন’—তবে তা মোটেই যথেষ্ট নয়। বিশ্বাস অর্জনের সেরা শর্ত—প্রশ্নের সামনে শাসকের নির্ভীক অবস্থান।