


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: সোমবার দুপুরে এন আর এস মেডিকেল কলেজে যখন দেখা হল, বিষণ্ণ মুখে তিনি শুয়ে আছেন ফিজিওথেরাপির জন্য। আসলে সুতীর্থ (নাম পরিবর্তিত) মোটেই অতটা বিষণ্ণ তরুণ নন। উজ্জ্বল দু’টি চোখ। মাত্র ১৯ বছর বয়স। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। আর অপেক্ষায় আছেন কম বয়সে বাবার মৃত্যুর পর লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া মাকে কবে আর্থিকভাবে কিছুটা সুরাহা দিতে পারবেন।
এন আর এস-এ সুতীর্থের মতো রোগী আছে সাড়ে পাঁচশো। দু’-তিনমাসের দুধের শিশু থেকে ৪৫-৪৬ বছর বয়সিরা। তাঁদের রক্ত বন্ধ হয় না! চোট লাগুক বা না লাগুক, শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট থেকে রক্তপাত হতে থাকে মাঝেমধ্যে। হাঁটু, কনুই, গোড়ালি, দাঁত বা প্রস্রাবের জায়গা। আর একবার রক্তপাত হওয়া মানেই একেবারে ‘অ্যালার্ট পজিশনে’ চলে যেতে হয় তাঁদের, গোটা পরিবারকেই। চটজলদি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে দিতেই হবে জীবনদায়ী রক্তের উপাদান ‘ফ্যাক্টর ৮’ বা ‘ফ্যাক্টর ৯’। না দিলে? চুপচাপ মৃত্যু এসে পাশে বসবে তাঁদের। কারণ, তারা প্রত্যেকেই হিমোফিলিয়া রোগী। রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তরের নথিভুক্ত এমন রোগী আছেন ২১৭৯ জন। আর তাঁদের লক্ষ লক্ষ টাকার দামি ওষুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে রাজ্য এক বছরে খরচ করছে নিজের ওষুধ বাজটের ১০ ভাগের এক ভাগ। বছরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা! দপ্তরের এক শীর্ষকর্তার ভাষায়, ‘এখানে সংখ্যা যৎসামান্য হতে পারে, আসল প্রশ্ন হল মানবিকতার।’ এন আর এস-এর হেমাটোলজির প্রধান ডাঃ তুফানকান্তি দলুই বলেন, ‘হিমোফিলিয়া রোগীদের ওষুধ পাওয়া শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্য। না হলে জীবনসংকট হতে পারে। রাজ্য সেদিক থেকে কোনো অভাব রাখেনি।’ কেষ্টপুরের হিমোফিলিয়া রোগী সুতীর্থ বললেন, ‘ক্রিকেট, ফুটবল বা কোনো আউটডোর গেমস খেলতে পারি না। তবে ইনডোর চলতে পারে। আমাদের মতো রোগীদের এই ওষুধ ছাড়া চলবে না। রাজ্য সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই।’
জিনগত রক্তের অসুখ হিমোফিলিয়া। মূলত পুরুষদেরই হয়। মায়ের দিকে থাকলে বাচ্চাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রক্ততঞ্চনকারী দু’টি ফ্যাক্টর ৮ এবং ৯ উদ্বেগজনকভাবে কম থাকে এসব রোগীর। তাই অল্প চোটে, এমনকি চোট ছাড়াও হতে পারে রক্তপাত। রক্তপাত হতে পারে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও। শুধু রক্তপাতই নয়, জয়েন্টের চারপাশ অস্বাভাবিকরকম ফুলে যায়। সময়ে ফিজিওথেরাপি না করালে অঙ্গবিকৃতি বা চিরস্থায়ী বিকলাঙ্গতার আশঙ্কা থাকে।
ফ্যাক্টর ৮ কম থাকলে তাদের ‘হিমোফিলিয়া এ’ এবং ফ্যাক্টর ৯ কম থাকলে ‘হিমোফিলিয়া বি’ বলা হয়। তবে কিছু কিছু হিমোফিলিয়া রোগীর ফ্যাক্টর ৮-এও রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এই সমস্যাকে বলা হয় ‘ইনিবিটর’। তাঁদের দিতে হয় ফ্যাক্টর ৭ অথবা বিশেষ দামি উপাদান। চিকিৎসকরা জানান, হিমোফিলিয়া রোগীদের মাসে গড়ে চারবার রক্তপাত হতে পারে। বাইরে থেকে ওষুধ কিনলে তাতে ৫০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা খরচ হতে পারে। সেখানে রাজ্য বহন করছে ওষুধ ও চিকিৎসার গোটা খরচটাই। শুধু তাই নয়, ‘এক্সটেন্ডেড হাফ লাইফ’ বলে নতুন দামি ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া শুরু হয়েছে। এই ওষুধের ফল আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।