


নিজেই পথ চলছে পাথর! সত্যিই এমনটা ঘটে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালিতে। তারই কারণ জানালেন কালীপদ চক্রবর্তী।
আমাদের এই পৃথিবী বিস্ময়ে ভরা। প্রকৃতির প্রতিটি কোণেই লুকিয়ে আছে এমন সব রহস্য, যা মানুষের কৌতূহলকে বারবার উসকে দেয়। কোথাও আগুন উগরে দেয় পাহাড়, কোথাও আবার হাজার বছরের পুরানো গাছ আজও দাঁড়িয়ে আছে জীবনের সাক্ষী হয়ে। তেমনই প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি হল— নিজে নিজে চলতে থাকা পাথর। প্রাণহীন, নিশ্চলতার প্রতীক হিসেবে আমরা পাথরকেই বুঝি। তাই কোনো পাথর যদি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিজের থেকেই সরে যায়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবেই এমন এক আশ্চর্য ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে চলেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত বিখ্যাত ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের একটি শুষ্ক সমতল অঞ্চল রেসট্র্যাক প্লায়া। বহু বছর ধরে এই অঞ্চল বিজ্ঞানী, গবেষক ও পর্যটকদের বিস্মিত করে আসছে। এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বড়ো ও ছোটো পাথর কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে। এ ধরনের পাথরকে সেইলিং স্টোন বলে। আশ্চর্যের বিষয় হল, পাথরগুলো যেখানে ছিল, সেখান থেকে কয়েক মিটার, কখনো বা আরও অনেক দূরে পৌঁছে যায়। আর তাদের পেছনে শুকনো মাটির ওপর তৈরি হয়ে থাকে দীর্ঘ আঁকাবাঁকা বা সোজা রেখার মতো দাগ। যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছে।
প্রথমবার এই রহস্যময় ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। তখন থেকেই শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা। কেউ কেউ মনে করতেন, হয়তো অদৃশ্য কোনো শক্তি এই পাথরগুলোকে সরিয়ে দেয়। কেউ আবার একে অলৌকিক ঘটনা বলেও প্রচার করতে শুরু করেন। স্থানীয় লোকজনের এমনও বিশ্বাস ছিল যে, গভীর রাতে অদৃশ্য আত্মারা এই পাথরগুলোকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়। তবে বিজ্ঞান অলৌকিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করে না। তাই এই রহস্যের প্রকৃত কারণ জানার জন্য বছরের পর বছর ধরে চলেছে নিবিড় গবেষণা।
গবেষকদের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে জানা যায়, পাথরগুলো প্রতিদিন বা প্রতি মাসে নড়ে এমনটা নয়। অনেক সময় দু’ থেকে তিন বছর, কখনো বা তারও বেশি সময় একটি পাথর একই জায়গায় স্থির থাকে। তারপর বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। এই অগ্রসর হওয়ার গতি এতটাই ধীর যে, খালি চোখে তা দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু পরে দেখা যায় যে পাথরটি আগের জায়গায় নেই এবং মাটিতে স্পষ্টভাবে তার চলার চিহ্ন রয়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, প্রতিটি পাথরের চলার পথ একেবারেই আলাদা। কোনো পাথর সোজা পথে এগিয়ে যায়, কোনোটা আবার বাঁক নিয়ে চলে। পাশাপাশি থাকা দু’টি পাথরও সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে অগ্রসর হতে পারে। আরও অবাক লাগে যে, যখন দেখা যায় একই সময়ে একই জায়গায় থাকা কয়েকটা পাথরের মধ্যে কোনোটা এগিয়ে যায়, আবার কোনোটা বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাই এই ঘটনাগুলোকে সকলের আরও রহস্যময় বলে মনে হয়।
বহুদিন ধরে ধারণা করা হত যে, জোরালো বাতাসই হয়তো এই বিশাল পাথরগুলোকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু পরে দেখা গিয়েছে শুধু বাতাসের শক্তি এত ভারী পাথর সরানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আধুনিক গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। শীতকালে কখনো কখনো প্লায়া অঞ্চলে মাটিতে জলের আচ্ছাদন জমে এবং রাতের ঠান্ডায় সেই জল পাতলা বরফে পরিণত হয়। দিনের বেলায় সূর্যের তাপে বরফ ভাঙতে শুরু করলে, প্রবল বাতাসের সঙ্গে সেই বরফের পাতলা চাদর পাথরগুলোকে ধীরে ধীরে ঠেলে নিয়ে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি এত ধীরগতিতে ঘটে যে, মানুষের চোখে তা ধরা পড়ে না। তবে কয়েক দিনের মধ্যে পাথর কয়েক মিটার পর্যন্ত সরে যেতে পারে।
এই ব্যাখ্যাটি বর্তমানে বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হলেও রহস্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ সব পাথর একইভাবে চলে না। একই আবহাওয়াতেও সব পাথর নড়ে না। ফলে এখনও গবেষকরা বিভিন্ন দিক নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। জলবায়ু, মাটির গঠন, বাতাসের গতি এবং বরফের প্রকৃতি— সবকিছুই এই ঘটনায় কতটা ভূমিকা রাখে, তা নিয়ে আজও গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
ডেথ ভ্যালির এই চলমান পাথরগুলো শুধু একটি প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, বরং প্রকৃতির অজানা শক্তিরও এক অসাধারণ উদাহরণ। প্রাণহীন একটি পাথর যখন নিজের চলার পথের চিহ্ন রেখে যায়, তখন তা মানুষের মনে বিস্ময় জাগায় এবং মনে করিয়ে দেয়— প্রকৃতির কাছে এখনও এমন অনেক রহস্য রয়েছে, যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা আমাদের জানা হয়নি। বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত সেই রহস্যের দুয়ার খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর সেই চেষ্টাই মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে চলেছে।