


শিক্ষার মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে এ দেশে কারও খুব একটা মাথাব্যথা নেই। স্কুলে শিক্ষক আছেন কি না, ছাত্রছাত্রীদের বসার বেঞ্চ আছে কি না, ছাদ আছে কি না, বাথরুমে যাওয়ার মতো পরিবেশ আছে কি না—এসব প্রশ্ন তাই অবান্তর। সরকারও এসব নিয়ে আদৌ ভাবিত নয়। ভোট, ধর্ম, মন্দির ইত্যাদি নিয়ে বেশ আছে সরকার। কে দেশপ্রেমিক আর কে দেশদ্রোহী, তা নিয়েও সরকারের মাথাব্যথার অন্ত নেই। এসবের সঙ্গে শিক্ষার তুলনা... ছি ছি! সদ্য ককরোচ জনতা পার্টি ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে নেমেছে। তাতেই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে সরকারি স্কুলগুলির বেহাল দশা হঠাৎ করে গোটা দেশের সামনে ব্রেআব্রু। কোথাও গোয়ালঘরে স্কুল, কোথাও আস্তাবলে ক্লাস, কোথাও স্কুলের মাথায় ছাদ নেই... সব আচমকা সংবাদ শিরোনামে। খবর হওয়া আটকাতে রাজস্থান-উত্তরপ্রদেশে স্কুলে বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। তড়িঘড়ি স্কুল সংস্কারে টাকাও বরাদ্দ হচ্ছে। অথচ এর আগে তা নিয়ে কারও তেমন মাথাব্যথা ছিল না। যেন এত দিন সব স্কুল আদর্শ ছিল, হঠাৎ এক সকালে সবাই আবিষ্কার করল—শিক্ষাব্যবস্থারও একটা শরীর আছে!
অন্যের স্কুলের ছাদ গোনার আগে অবশ্য নিজের স্কুলের বেঞ্চ গোনা ভালো। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের ছবিটাও খুব গর্বের নয়। বরং অনেক বেশি লজ্জার। ২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হওয়ায় প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি গিয়েছে গত বছর। ‘যোগ্য’ শিক্ষকরা আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশে এখনও চাকরিতে রয়েছেন। কিন্তু সেই চাকরির ভবিষ্যৎ আর কতদিন? ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চাকরি বহাল রাখার নির্দেশ রয়েছে। তারপর? আদালতের পরবর্তী শুনানি, পরবর্তী নির্দেশ, খুব বেশি হলে আর হয়তো ছ’মাস সময়। কিন্তু যে শিক্ষক জানেন তাঁর নিজের চাকরিই অনিশ্চিত, তিনি কী নিশ্চিন্তে পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ গড়বেন? রাষ্ট্রের কাছে অবশ্য তারও সমাধান আছে। শিক্ষককে পড়াতে না দিয়ে কখনো এসআইআর, কখনো ভোট, কখনো জনগণনা, কখনো অন্য প্রশাসনিক কাজে পাঠিয়ে দাও। স্কুলে শিক্ষক নেই বলে হাহাকার, আবার শিক্ষক থাকলেও ক্লাসে নেই—তার কারণ নিয়ে নীরবতা। সব কাজ হবে, শুধু শিক্ষাদানটাই যেন সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তারপর আছে মিড-ডে মিল। ডিম এল কি না, কী মেনু, কী ‘সাত্ত্বিক’ খাবার—সরকার বদলের পর ‘সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ’ এই বিষয় নিয়ে পাতার পর পাতা খবর, সাংবাদিক সম্মেলন, রাজনৈতিক প্রচার হয়েছে। অবশ্যই শিশুর পুষ্টি জরুরি। খালি পেটে শিক্ষা হয় না। কিন্তু খাওয়ানোর পর শেখাবে কে? যে স্কুলে বসার বেঞ্চ নেই, বাথরুমের অবস্থা এমন যে মাঠে যাওয়াই স্বস্তির, সেখানে পাতে ডিম দিয়ে কি শিক্ষার দায় মেটে? মিড-ডে মিল শিক্ষার সহায়ক, আসল শিক্ষা নয়।
কলকাতার চকচকে কয়েকটি স্কুল দেখিয়ে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার সার্টিফিকেট দেওয়া যায় না। শহরের বাইরের প্রাথমিক স্কুলগুলিতে একবার গিয়ে দেখা হোক। কত স্কুলে পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই, কত স্কুলে শিক্ষক সংকট, কত স্কুলে ন্যূনতম পরিকাঠামোটুকুও নেই। তারপরও প্রশ্ন করা হয়, সরকারি স্কুল থেকে পড়ুয়া সরে যাচ্ছে কেন? সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা নিজেদের সন্তানকে সরকারি স্কুলে কেন পাঠান না? যে শিক্ষক প্রতিদিন সরকারি স্কুলের বাস্তব অবস্থা নিজের চোখে দেখেন, তাঁর সিদ্ধান্তটিই তো এই ব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম রিপোর্ট কার্ড। সরকারি রিপোর্ট বলছে, দেশে প্রতি দশ জন শিশুর মধ্যে চার জনই বেসরকারি স্কুলে পড়ে। বেসরকারি স্কুল মানেই ভালো শিক্ষা নয়। কিন্তু অভিভাবক কেন নিজের কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে সেখানে সন্তানকে পাঠাতে চাইছেন, সেই প্রশ্নটাই আসল। পশ্চিমবঙ্গে এই হার কম বলে আত্মতুষ্টিরও কারণ নেই। প্রশ্ন হল—সরকারি স্কুলে থাকা শিশুটিও কি তার প্রাপ্য শিক্ষা পাচ্ছে? শিক্ষা তো কোনো রাজনৈতিক দয়া নয়! যেমন মিড-ডে মিলকে উন্নয়নের বিজ্ঞাপন বলা যায় না, কিংবা শিক্ষক নিয়োগকে ঘুষের কারবার বা দলীয় পুরস্কার বলে মানা যায় না। স্কুলের দেওয়াল রং করলেই শিক্ষা হয় না। পাতে ডিম দিলেই ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না। স্কুল ঠিক করার আগে শিক্ষাটাকেই ঠিক করতে হবে। সেটাই রাষ্ট্রের তথা সরকারের দায়িত্ব।