


শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বসিরহাট: ওপারে বাংলাদেশের গ্রাম। এপারে টাকি। মাঝখানে ইছামতী। নদীর বুকে ভাসে সময়ের গল্প। এলাকাটি বসিরহাট দক্ষিণ বিধানসভার অন্তর্গত। ভোটের বাংলায় উন্নয়নের উর্বর জমিতে দাঁড়িয়ে এখানে তৃণমূল অনেকটা এগিয়ে বলে জানাচ্ছেন এলাকার মানুষ। নীরব সমর্থনের স্রোত তৈরি হয়েছে তাদের পক্ষে। এখানে তৃণমূল প্রার্থী করেছে সুরজিৎ মিত্র ওরফে বাদলকে। এলাকার পরিচিত মুখ, যিনি উন্নয়ন ও সংগঠনের জোরে এগচ্ছেন। বিজেপির শৌর্য বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াই জমাতে চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু জনসংযোগের ধারাবাহিকতায় তৃণমূলের সঙ্গে এখনও বিস্তর ফারাক।
বিকালের আলোয় টাকি ঘাট যেন এক জীবন্ত পোস্টকার্ড। নদীর ধারে বসে পর্যটকরা ছবি তুলছেন। হাওয়ায় ভেসে আসছে ভুট্টা পোড়ানোর গন্ধ। দূরে নৌকা ভেসে যাচ্ছে ধীর গতিতে। একদা নির্জন সীমান্ত শহর এখন নতুন করে নিজের পরিচয় খুঁজে পেয়েছে। পর্যটকদের নয়া ডেস্টিনেশন টাকি। ইছামতীর পাড়ে সাজানো ঘাট, পার্ক, নদীর ধারে বসার জায়গা—সব মিলিয়ে এক নতুন চেহারা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক স্মৃতি, পুরানো জমিদারবাড়ি, সীমান্তের ইতিহাস। আগে দুর্গাপুজোর ভাসানের দিন ছাড়া টাকি থাকত অনেকটাই নিস্তব্ধ। এখন সারা বছরই এখানে উৎসবের আবহ। নদীর দিকে তাকিয়ে শ্রীবাস দে নামে এক বৃদ্ধ সেই কথাই বলছিলেন। পর্যটনকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয়েছে বহু মানুষের। ছোটো ছোটো লজ, হোটেল, টোটো পরিষেবা, খাবারের দোকান—সব মিলিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে এসেছে নতুন গতি। টোটোচালক রুদ্র দে বলছেন, ‘আগে আয়ের সুযোগ সীমিত ছিল। এখন বিকল্প আয়ের পথ খুলেছে।’ এখান থেকে রাস্তা ঘোজাডাঙার দিকে ঘুরতেই ছবিটা বদলে যায়। ট্রাকের লম্বা লাইন, কাস্টমসের ব্যস্ততা, কাগজপত্র নিয়ে দৌড়ঝাঁপ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক চলমান দৃশ্য। এই সীমান্তই বসিরহাট দক্ষিণের অর্থনীতির আর এক মুখ। সেই ব্যস্ততার আড়ালে ধরা পড়ে অন্য এক পরিবর্তন—যা অনেকটাই নীরব, অথচ গভীর। ইটিন্ডার গৃহবধূ ঝুমা সাউ বলেন, ‘আগে অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য কাজ করত। এখন বাড়িতে রেশন আসে, হাসপাতালে যাই, আলো আছে। ঝুঁকি নিতে হয় না আগের মতো।’ ঘোজাডাঙার ষষ্ঠী সাধু একটু হেসে বললেন, ‘আগে রাত মানেই অন্যরকম কাজ। এখন দিনে ব্যবসা করি, ট্রান্সপোর্টে আছি।’ এভাবেই অনিশ্চয়তার জায়গায় এসেছে স্থিরতা। বসিরহাট শহরে ঢুকতেই সেই পরিবর্তনের ছাপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পিচের রাস্তা, কোথাও সংস্কার চলছে। চলছে নিকাশির কাজও। পুরসভার একাধিক বিভাগ দেশের মধ্যে সেরার তালিকায় উঠে এসেছে। এই তথ্য এখন শুধু প্রচারে নয়, স্থানীয় গর্বের অংশ। পানীয় জলের পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। দু’টি ওয়ার্ড পিছু একটি করে হেলথ সেন্টার—এই ছোটো ছোটো উদ্যোগই বড়ো আস্থার ভিত গড়ে তুলছে। বসিরহাট সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এখন এই এলাকার বড় ভরসা। জেলা হাসপাতালের মর্যাদা পাওয়ার পর পরিষেবা আরও বিস্তৃত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রুপা মিত্র, দেবশ্রী চক্রবর্তী বলছেন, ‘আগে যেখানে সামান্য সমস্যাতেও কলকাতায় যেতে হত। এখন অনেকটাই স্থানীয়স্তরে মিটছে সেসব। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে আলোর ব্যবস্থা, যেখানে একসময় অন্ধকারই ছিল নিয়ম—এখন সেখানে রাতও অনেকটা নিরাপদ। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নির্ভরতা।’ এটাই ভোটে বড়ো ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তাদের মতে, উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতাই তৃণমূলকে এগিয়ে রাখছে। অন্যদিকে, প্রাক্তন বিজেপি বিধায়কের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি। অসম্পূর্ণ ভ্যাবলা আন্ডারপাস এখনও মাঝেমধ্যে এলাকাবাসীর আলোচনায় ফিরে আসে।
তৃণমূল প্রার্থী বাদল মিত্র বলেন, ‘এখানে ২০১৪-২০১৬ সাল পর্যন্ত বিজেপির বিধায়ক ছিলেন। কেন্দ্রেও তখন বিজেপি। প্রতিশ্রুতি দিয়েও ভ্যাবলা স্টেশনের আন্ডারপাস তৈরি করতে পারেননি তৎকালীন বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্য। মানুষ সেই বঞ্চনা কিন্তু ভোলেনি। আমাদের সরকারের উন্নয়নের কাছে ওরা ধরাশায়ী।’ পালটা বিজেপি প্রার্থী বলছেন, ‘মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে আমাদের ভোট দেবে। সত্যি যদি এত উন্নয়ন হত, তাহলে পুরসভার চেয়ারম্যান বদল হল কেন? আসলে উন্নয়ন হয়েছে কেবল খাতায়কলমে।