


সমৃদ্ধ দত্ত: রাগ। বিস্ময়। হতাশা। প্রতিবাদ নয়। বরং সর্বাগ্রে একটি প্রশ্ন মনে আসে। সেটি হল, এইসব অধিকার আপনাদের ঠিক কে দিয়েছে? মানে, কখন ঠিক মনে হল যে, এই যে সিংহাসনটা পেয়েছি, এটায় একবার বসে গেলে, আমার যখন যা মন চাইবে তাই করতে পারব। যে কোনো মনের ইচ্ছাকেই মনে হবে সংবিধান আমাকে এই অধিকার দিয়েছে। সেটি তখন ঠিক না ভুল, বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত, নাকি নির্বুদ্ধিতার সিদ্ধান্ত, এসব আর মনে থাকে না। একজন সর্বোচ্চ আসনে বসা মানুষের কাছে সবথেকে কঠিন কাজ হল, নিজের জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ, সংযম এবং নৈতিকতার সীমারেখা নিজেই স্থির করে নেওয়া। নিজের লক্ষ্মণরেখা নিজেকেই টানতে হয়। যেহেতু বিরুদ্ধাচারণ করার কেউ নেই ভয়ে অথবা ভক্তিতে, তাই নিজের সীমা নিজেকেই নির্ধারণ করতে হয়। সেটি আর কেউ দেখতে পাবে না। নিজেকে দেখতে হবে।
বন্দেমাতরম নামক একটি মন্ত্রের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আনন্দমঠ, স্বাধীনতা সংগ্রাম, ব্রিটিশবিরোধী দীক্ষামন্ত্র, স্বদেশবন্দনা, সংবিধান নির্মাণের প্রক্রিয়া, স্বাধীন ভারত নির্মাণের কারিগরদের সিদ্ধান্ত, ৮০ বছর ধরে এই তাবৎ শৃঙ্খলা কোটি কোটি ভারতবাসীর মেনে চলা এবং দেশের সেজন্য কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি না হওয়া ইত্যাদি দেড়শো বছরের একটি নিরন্তর ঐতিহ্যশালী ইতিহাস জড়িত রয়েছে। প্রশ্ন হল, এই ঐতিহাসিক জার্নিকে হঠাৎ ইচ্ছানুযায়ী নস্যাৎ করে দেওয়া কখন যায়?
যখন মনের মধ্যে স্বেচ্ছাচারের পদধ্বনি হয়। বন্দেমাতরম ভারতের জাতীয় গান। সেটির প্রথম দুই স্তবক জাতীয় গান হিসেবে গাওয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধীরা গ্রহণ করেছিলেন বহু আলোচনার পর। সেটা ছিল পরাধীন ভারত। স্বাধীন ভারতে যাঁরা নতুন ভারত নির্মাণের শপথ গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরাও এই সিদ্ধান্তকেই ভবিষ্যৎ ভারতের জন্য এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। জাতীয় সঙ্গীত জনগণমন প্রথম স্তবক এবং জাতীয় গান বন্দেমাতরমের প্রথম দুই স্তবক। এটাই ৮০ বছর ধরে অনুসৃত হয়েছে ভারতে। ভারত তারপর থেকে যথারীতি নানা ঝড়ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে আজকের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পর্যবসিত হয়েছে। এজন্য জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে আধুনিক ভারতের কারিগরদের সিদ্ধান্ত বদল করার দরকার পড়েনি।
কিন্তু মোদি সরকারের হঠাৎ কেন মনে হল অন্য সব বদলের মতো বন্দেমাতরম, জনগণমন নিয়েও নিজের সিদ্ধান্ত ১৪৬ কোটি মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায়? কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার থেকে বন্দেমাতরমের ৬টি স্তবকের পুরোটাই গাইতে হবে। জনগণমনের আগে বন্দেমাতরম গাইতে হবে। অর্থাৎ জনগণমন যেন বন্দেমাতরমের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ১৯৫০ সালে সাধারণতন্ত্র গ্রহণ করার সময়ই প্রথম রাষ্ট্রপতি ডক্টর রাজেন্দ্রপ্রসাদ স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় গান কোনোটাই কারো থেকে বেশি অথবা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দুটি সমমর্যাদাসম্পন্ন।
তাহলে হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ও ক্ষমতা আমাদের আছে, এরকম মনে হওয়ার একমাত্র কারণ কী? কারণ হল, সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা। কেন্দ্রীয় সরকারের চালিকাশক্তি যারা, তারা ১১ বছরেই বুঝে গিয়েছে তাদের পক্ষে ভারত নামক এক মহাভারত শাসন করার মতো প্রশাসনিক মুন্সিয়ানা নেই। বলার মতো কিছুই করে উঠতে পারেনি তারা। গয়ংগচ্ছভাবে একটি দেশ চলেছে। বেকারত্ব চরম। চাকরি নেই। ব্যবসা নেই। শিল্প নেই।
ঠিক এইসব ব্যর্থতা আড়াল করতেই দেশের নাগরিকদের উন্নতি অথবা জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন বিষয় খুঁজে খুঁজে নানারকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত একরাশ ব্যর্থ এবং অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের কারিগর তারা। কোনো একটি ইতিবাচক অথবা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারকারী সিদ্ধান্তের জন্য এই সরকারকে ইতিহাস মনে রাখবে না। কারণ একটিও সেরকম সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এই সরকার। অথচ নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতার সরকার এবং একজন মহা প্রভাবশালী নেতা দুইই ছিল এই সরকারের কাছে। ইচ্ছা অথবা যোগ্যতা থাকলেই তাঁরা ভারতের আমূল উন্নতি করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু পারলেন না।
আর মাত্র কিছু বছর পর থেকেই এই সরকারের সময়কালের স্মৃতি ফিকে হতে থাকবে। ইতিহাস খুব নিষ্ঠুর। সে কোনো প্রচার, প্রোপাগান্ডা মনে রাখে না। কঠিন সত্যি, কঠোর তথ্য মনে রাখে। পূর্বতন প্রধানমন্ত্রীদের সম্পর্কে সচেতন নাগরিকদের মনে রয়ে গিয়েছ, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, সরকারি সংস্থা নির্মাণ, বহু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান তৈরি, পাকিস্তানকে ভেঙে দেওয়া, ব্যাংকের জাতীয়করণ, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কায়েম করা, উদার অর্থনীতির আমদানি, মিড ডে মিল চালু, ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প ইত্যাদি অন্তহীন মানুষের উন্নয়নের সিদ্ধান্ত। এই স্তরে মানুষের জীবন বদলে দেওয়া কি হয়েছে গত ১১ বছরে?
আমার হাতে ক্ষমতা আছে। আমাকে এই ক্ষমতা প্রয়োগে কেউ প্রতিহত করার নেই। আমি ক্রমেই দেখতে পাচ্ছি আমার আশপাশে যারা আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পায়, তখন আমার কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে না। সকলেই আমাকে তোষামোদ করে। খুশি করার চেষ্টা করে। কাউকে খুশি করার সবথেকে সহজ উপায় কী? তাঁকে সর্বদাই বলা যা করছেন ঠিক করছেন। যা বলছেন ঠিক বলছেন। হ্যাঁ, আপনিই ঠিক। আর এই কথাগুলি শুনতে শুনতে মনে হয় কথাগুলি সত্যি। অনেকের সন্দেহ হয় না যে, আমি সব ব্যাপারেই ঠিক এটা কীভাবে হতে পারে? আমার বিরুদ্ধাচারণ করা হয় না কেন? এরকম যাঁদের মনে হয় না, যাঁরা পারিষদবর্গ ও ভক্তদের তোষামোদকে সত্যি প্রশংসা ভাবেন, তাঁরাই সহজে স্বেচ্ছাচারী হয়ে যান। বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকবৃন্দের ঠিক সেটাই হয়েছে।
বন্দেমাতরম ব্রিটিশের বিরুদ্ধে একটি অস্ত্র। একটি অগ্নিশিখা। বন্দেমাতরম উচ্চারণ করে, বন্দেমাতরমের সম্মান রক্ষা করার জন্য, ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাঁরা বছরের পর বছর কারাবন্দি থেকেছেন, আত্মবলিদান দিয়েছেন, দেশকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, একমাত্র তাঁরাই বন্দেমাতরম নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী। ঠিক সেটাই ১৯৩৭ সালে হয়েছিল। যে বা যাঁরা বন্দেমাতরম সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাঁরা দেশের জন্য ছিলেন বলিপ্রদত্ত। তাঁরা কেউ ব্রিটিশের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মুচলেকা দিয়ে বলেননি যে, চিরকাল অনুগত থাকব, কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপ করব না, আর্মিকে যোগ দিতেও রাজি আছি। কেউ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরুদ্ধাচারণ করে সরাসরি ব্রিটিশের পক্ষে চলে যাননি।
তাহলে সেইসব প্রাতঃস্মরণীয় মানুষকে অপমান করে ১৪৬ কোটি জনগণ বন্দেমাতরমের সিদ্ধান্ত বদলের নীতি গ্রহণ করবে কেন? বরং সেই কারণেই জনসাধারণের প্রশ্ন যে, বন্দেমাতরম, জনগণমন নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলের অধিকারটা ঠিক কোথা থেকে পাওয়া গেল? কে দিল এই অধিকার? গণতন্ত্রে জনগণই শেষ কথা বলবে। তাদের কি প্রশ্ন করা হয়েছে? তারা মতামত দিয়েছে? কোনো ভোটের আগে নির্বাচনি ইস্তাহারে কি বলা হয়েছে যে, ভোটে জিতে এলে আমরা এটা করব? তাহলে হঠাৎ কী এমন হল যে, বন্দেমাতরম নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র, মহাত্মা গান্ধীদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলা হবে?
আমরা খুব শক্তিশালী, এরকম মনে করতে নেই। বরং সারাক্ষণ মনে করতে হয় যে, আমার তো ৪০০ আসন পাওয়ার কথা ছিল! তাহলে ২৪০ আসনে নেমে এলাম কেন? মনে রাখা দরকার, আমি তো একটি রাজ্যে ১৮ টি আসনে জয়ী হয়েছিলাম! মাত্র দেড় বছর আগে ১২ আসনে নেমে এলাম কেন? আমরা তো একক গরিষ্ঠ মহাশক্তিশালী ছিলাম। আজ আমরা বিহার ও অন্ধ্রপ্রদেশের দুই মুখ্যমন্ত্রীর দয়ায় সিংহাসনে বসে আছি কেন?
এই আত্মসমীক্ষাগুলি কিন্তু দেখা যায় না। কিন্তু এগুলি তো আর মিথ্যে হয়ে যাবে না! আপনারা কিন্তু শক্তিশালী হচ্ছেন না। বরং নির্বাচনের ময়দানে দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। সেটা ভেবে অগ্রসর হওয়াই কাম্য। আর এরকম বিস্ময়কর সিদ্ধান্তগুলি থেকে সন্দেহ আরো বেশি হয় যে, মানুষের মন জয় করা নিয়ে বেশ নার্ভাস হয়ে যাচ্ছেন আপনারা! তারই প্রতিফলন এইসব পদক্ষেপ! নিত্যনতুন বিভাজনকেই শক্তি ভাবা রাজনৈতিক বুদ্ধির প্রকাশ নয়। বরং বিশ্বাস হয় যে, আপনাদের ইস্যুর ভাণ্ডার ক্রমেই শূন্য হয়ে আসছে।
এই যে মনীষীদের সিদ্ধান্ত, মতামতকে নস্যাৎ করার মনোভাব, তাঁরা যে অবস্থান গ্রহণ করে গিয়েছেন, সেটা বদলে দেব আমরা! তাঁদের থেকেও নিজেদের বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবার অহং ও দম্ভ, এটাই হল সবথেকে বড়ো বিপজ্জনক প্রবণতা। দেশের জন্য বিপদ নয়। নিজেদের জন্য বিপদ। কারণ, এর নাম স্বেচ্ছাচারিতা। আর স্বেচ্ছাচারিতার হাত ধরেই আসে পতনের বীজ।