


সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে বিশ্বনাথ বসু।
• ছায়া বসু। আমার মা। সারা জীবন যিনি আক্ষরিক অর্থেই ছায়া দিচ্ছেন। বাড়ি থেকে বিয়ে ঠিক করে দিয়েছিল আমার বাবার সঙ্গে। সেই মানুষটাকে ১০০ শতাংশ মনন, চিন্তন দিয়ে দিলেন। আর আমাদের দুই ভাইয়ের জন্ম হওয়ার পর যেন পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আসল কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন মা। শিকড় খুঁজে পেয়েছিলেন। সারাক্ষণ আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আমরা সেই প্রজন্ম, যারা জানতেই পারিনি মায়ের কী পছন্দ। মা শুধু আমাদের জন্য। আসলে যে মানুষ কর্তব্য করেন, তাঁকে আমরা টেকেন ফর গ্রান্টেড নিয়ে নিই। ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় নীতাকে যেমন নেওয়া হয়েছিল।
বাবা যেদিন চলে গেলেন, সেদিন আমি ভাবলাম মাকে কী কী ছাড়তে হবে। মা মাছ, মাংস ভালোবাসেন না। ডিম খেতে ভালোবাসতেন। আর পৃথিবীর সবথেকে প্রিয় খাবার জিলিপি। আমি ভাবলাম, জিলিপি তো বন্ধ হবে না। আর মাছ, মাংস মা খান আমি চাই। কিন্তু মায়ের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। মা বললেন, আমি খাব না। ওই সময় জোর করতে নেই। কারণ ওর মধ্যেই মা শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।
আমাদের যৌথ পরিবার। দুর্গাপুজো হত। এখনও হয়। কিন্তু বাবা ছোটো চাকরি করতেন, পুজোয় কোনো টাকা দিতে পারতেন না। পুজোতে কোনোরকম কন্ট্রিবিউট করতেন না। সেজন্য আমার মা খিদে পেলেও কোনোদিন খাবার থালায় হাত দিতে পারেননি। এটা শোনার পর আমি চুপ করে গিয়েছিলাম!
আমার আর এক মা আছেন, ছোটোমা। ছোটোমার কাছে আমি বড়ো হয়েছি। বয়ঃসন্ধির সময় আমার নানা প্রশ্নের উত্তর আমার বয়সের মতো করে দিতেন ছোটোমা। কেজো কথায় বলতে গেলে ছোটোমায়েরা আমাদের বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে এসেছিলেন। আজও আমার কাছে ছোটোমা এমন একজন, যিনি কোনো অন্যায় করতে পারেন না। মা দুর্গাপুজোর সময় ছোটোমার ঘরে গিয়ে খেতেন। এটা শোনার পর আমার মনে হয়েছিল, আহা রে, এটা তো ভাবা হয়নি! বাবা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। দুর্গাপুজোয় বাড়িতে লোকজন, বন্ধুরা আসত। হইহই হতো। বাবা সেসব নিয়েই থাকতেন। আর মায়ের ছিল এই ইতিহাস...! তার মধ্যে আমি খাওয়ার লোভ সামলাতে পারতাম না। বাবার সেসব রাগ পুরোটাই গিয়ে পড়ত মায়ের উপর। বলতেন, তুমি লক্ষ করো না...। আমার উত্তরোত্তর বাড়ির বাইরে বেরনো, সিনেমা দেখার নেশা, এসব নিয়ে মায়ের উপর তর্জনগর্জন করতেন বাবা। তাঁর মনে হতো, ছেলে বিগড়ে যাচ্ছে। আমি নাটকের রিহার্সাল দিতে বেরিয়ে গিয়েছি। আর পাশবালিশের উপর বালিশ চাপা দিয়ে মা বলেছেন, ছেলে ঘুমোচ্ছে।
আসলে স্বাধীনতা উপভোগ করতে ভুলে গিয়েছেন মা। একটা জলের গ্লাস সরাতে গেলেও জিজ্ঞেস করেন। বাবার মৃত্যুর পর আমি ভাইকে বলেছিলাম, মায়ের যদি কোনো বন্ধু তৈরি হয়, বাড়িতে বয়ফ্রেন্ড আসেন, তিনি যদি মায়ের সঙ্গে গল্প করেন, তোমাকে কিন্তু বাইরে চলে যেতে হবে। কারণ ফ্ল্যাটটা মায়ের। সারা জীবন বাবার অনুমতি ছাড়া কিছু করা মানেই সবটা অন্যায় হয়ে গেল, এমন মনোভাব নিয়েই কাটিয়ে দিলেন মা।
তবে বালখিল্যপনাও আছে। আমি এত জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চাই। কিছুতেই যাবেন না। একবার মুম্বই-গোয়া গিয়েছিলাম। আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, গোয়া কি অনেক দূর? আমি বললাম, প্লেনে করে সহজে পৌঁছে যাবে। ওই ট্রিপে মা অমিতাভ বচ্চনের বাংলোর সামনে গাড়ি থেকে নেমে রাত পৌনে তিনটের সময় হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন বাড়ির গেটে। পরিষ্কার বাংলায় সিকিউরিটিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আছেন বাড়ির ভিতরে?’ আমি অবাক!
মা বলেছিলেন, একবার মিঠুন চক্রবর্তীকে দেখাস। আমি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। আর রঞ্জিত মল্লিকের অন্ধ ভক্ত। আমি অনেকবার ওঁর বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছি মাকে। কাকিমা, অর্থাৎ রঞ্জিত মল্লিকের স্ত্রী দীপা মল্লিকও আমাকে অনেকবার বলেছেন, মাকে নিয়ে এসো একদিন। কিন্তু মা লজ্জা পান। মা ভাবেন, স্বামী চলে গিয়েছে। তারপর আর একটা পুরুষ মানুষকে আমার ভালো লাগে। তাকে দেখতে যাব! তা হয় নাকি? এ একেবারে অন্য আবেগ...।