


গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে টানা ৪৩৯৯ দিন (১২ বছর) কুর্সিতে থেকে রেকর্ড করেছেন নরেন্দ্র মোদি। বিজেপির দাবি, নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এবার তিনি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে পিছনে ফেলে দিলেন। মোদির এই ‘সাফল্য’ উদযাপনে ঢাকঢোল নিয়ে আসরে নেমে পড়েছে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপি। সন্দেহ নেই, এ এক বিরল কৃতিত্ব। পরপর তিনটি নির্বাচনে মোদি ও তাঁর দল জনগণের আশীর্বাদ পেয়ে কেন্দ্রের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এ জন্য গেরুয়া শিবির আত্মশ্লাঘা অনুভব করতেই পারে। কারণ শুধু একটানা ১২ বছর পদে থাকাই নয়, মোদিকে সামনে রেখেই একের পর এক রাজ্য দখল করে চলেছে বিজেপি। কার্যত দক্ষিণ ভারত বাদ দিলে উত্তর, পশ্চিম কিংবা পূর্ব ভারতের বড়ো অংশেই এখন মোদির দলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। আরএসএস-এর দর্শন মেনে হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে অনেকটাই সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছেন মোদি। বিজেপির ভিত আরও পোক্ত করতে সংবিধান সংশোধন করে লোকসভার আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং ‘এক দেশ, এক ভোট’-এর ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে যে কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে পদ্মশিবির, তা সফল হলে মোদিজির ৫৬ ইঞ্চি ছাতি যে আরও ফুলেফেঁপে উঠবে— তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়াও তাঁর গরিমা প্রচারের জন্য স্তাবককুল তো আছেই।
কিন্তু আরও অনেক দাবির মতোই মোদির একটানা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কুর্সিতে থাকার রেকর্ডের দাবিটিও কতটা যুক্তিসঙ্গত, তাই নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে! ইতিহাস বলছে, ১৯৫২ সালে দেশের প্রথম নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু। সেই থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত টানা ৪৩৯৮ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। গত ১০ জুন, বুধবার সেই সংখ্যাটি অতিক্রম করেছেন মোদি। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ’৫২ সালে নির্বাচিত সরকার গঠনের মধ্যবর্তী পাঁচ বছরও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেহরু। যদিও সেই সরকার নির্বাচিত ছিল না। বিরোধীদের অভিযোগ, ‘একটানা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী’— এই শব্দবন্ধকে ব্যবহার করে নেহরুর প্রথম পাঁচ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বকে অস্বীকার করতে চাইছে বিজেপি। অথচ নেহরুর সেই মন্ত্রিসভায় ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও। বিরোধীদের প্রশ্ন, স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নেহরুর সময়কালকে অস্বীকার করলে সেই আমলে নেওয়া যাবতীয় সরকারি সিদ্ধান্তও ‘অবৈধ’ বলে ঘোষণা করতে হয়। বিজেপি কি তাতে রাজি হবে? তাছাড়া ২০২৪-এ জিতে মোদিজি প্রধানমন্ত্রী হলেও বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। নেহরুকে কারও সাহায্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে হয়নি। একটানা না হলেও ইন্দিরা গান্ধীও ৪৩৯৯ দিনের বেশি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এই বিতর্কের পিছনে যথেষ্ট যুক্তি থাকলেও মোদিজির কৃতিত্ব কোনোমতেই ছোটো হয়ে যায় না।
কিন্তু এই বিতর্ককে দূরে সরিয়ে রাখলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল, একজন রাষ্ট্রনায়ককে তাঁর পদে থাকার মেয়াদ দিয়ে বিচার করা কি যুক্তিসঙ্গত হবে? নাকি দেশ ও দেশের আপামর জনগণের কল্যাণে তিনি কতটা সফল হলেন— তা দিয়ে বিচার করা হবে? এককথায়, সাফল্যের মাপকাঠি কী হবে? কোনো সন্দেহ নেই, মোদি জমানায় যে দিকেই তাকানো যাক, দাঁড়িপাল্লায় ব্যর্থতার ওজন অনেক বেশি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একাধিক ব্যর্থতার নজির গড়েছে মোদির সরকার। এই জমানায় ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য গত একশো বছরে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। দেশে বিপুল জনসংখ্যার কারণে জিডিপির হার বেশি হলেও মাথাপিছু আয়ে ভারত রয়েছে পিছনের সারিতে। সবচেয়ে করুণ অবস্থা বেকারত্ব ও মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে। দেশে শিক্ষিত তরুণ সম্প্রদায়ের যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনও সেভাবে নেই। গ্যাস, জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা আকাশ ছুঁয়েছে। নিদারুণ সমস্যার মধ্যে রয়েছেন দেশের কৃষক ও শ্রমিকরা। আবার এই আমলে ধর্মীয় মেরুকরণ, ঘৃণার রাজনীতি, সামাজিক বিভাজন, দেশের সংহতি ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ক্ষুধা, অপুষ্টি, মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততাতে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে ভারত। আবার নারী নির্যাতনও গত এক দশকে ঝড়ের গতিতে বেড়েছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশে যেভাবে সংসদীয় ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে, তা নজিরবিহীন। এই জমানায় বিভিন্ন রাজ্যে সরকারের দখল নিতে ভাঙা-গড়ার খেলাকে যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে বিজেপি— তারও অতীত নজির নেই। উদ্বেগের বিষয় হল, প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে যে উষ্ণতার সম্পর্ক এতদিন ভারতকে ‘ডিভিডেন্ট’ দিত— তাতেও ফাটল ক্রমশ চওড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। মোদিজির বারবার বিদেশ ভ্রমণ সত্ত্বেও ভারতের বৈদেশিক নীতি ও কোনো কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও আজ নানা বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে এমন নানাবিধ জটিল সমস্যার আড়ালে থেকে যাচ্ছে এই আমলে যেসব ভালো কাজ হয়েছে সেগুলি। তাই এইসব সমস্যা সমাধানে আগামী দিনে মোদি কতটা ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারেন তার উপরেই নির্ভর করবে তাঁর সাফল্য। পদে থাকার মেয়াদ ও আত্মসর্বস্ব প্রচার দিয়ে তার বিবেচনা হবে না।