


যোগ কী বা যোগের মূল ভাবধারা কী? মানুষের অস্তিত্ব ত্রিভৌমিক। মানুষের স্থূল শরীর আছে আর তার নানা রকমের সমস্যাও আছে। সেসবের সমাধানও করতে হয়। মানুষের আবার মন আছে, বৌদ্ধিক সংরচনা আছে, তাই তার মানসিক সমস্যাগুলোরও সমাধান চাই। মানসিক সমস্যাগুলো সমাধানের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। এছাড়া মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনও আছে। আধ্যাত্মিক প্রগতির অন্ত্যবিন্দু হচ্ছেন পরমপুরুষ। জীবনের তিনটি স্তরেই যোগের আবশ্যকতা আছে। যদি কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক স্তরে যোগের অস্তিত্ব থাকে আর জাগতিক ও মানসিক স্তরে না থাকে, তাহলে মানুষের অস্তিত্বের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তাই জীবনের সর্বস্তরেই যোগানুশীলন বা যোগযুক্ত জীবনের প্রয়োজন আছে।
আমাদের স্থূলতম অস্তিত্ব হচ্ছে এই দেহ, আর জাগতিক অস্তিত্বগুলোর একটা অভ্যন্তরীণ প্রক্ষেপণ হচ্ছে মনের মধ্যে। তুমি বাইরের জগতে একটা হাতী দেখলে আর মনের মধ্যে তার একটা বাহ্য-অভ্যন্তরীণ প্রক্ষেপণও দেখলে। কিন্তু সৃষ্টির যে মূলীভূত কারণ-সত্তা তার বাইরে কোন কিছু নেই, তাই তাঁর ক্ষেত্রে কোন বাহ্যিক জগৎও নেই। তাঁর অস্তিত্ব অনুভূত হয় শুধু ভূমা-মানস জগতে আর আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে। কিন্তু মানুষের আছে তিন রকমের অস্তিত্ব।
মানুষের ক্ষেত্রে এই জগৎটা হচ্ছে ভূমাসত্তার চিত্তধাতু সঞ্জাত। তাই সব কাজ করবার সময় মনে রাখতে হবে যে, আমরা যা কিছু করছি বা দেখছি তা সবই তাঁর ভূমাচিত্তের মধ্যে হয়ে চলেছে। জাগতিক স্তরে এই হল এক রকমের যোগ।
ধর, সমুদ্রের মধ্যে এক বিন্দু জল। যে মুহূর্ত্তে সেই জলবিন্দু সমুদ্রের সঙ্গে তার একত্ব অনুভব করতে পারল তখন জলবিন্দুই হয়ে গেল সমুদ্র। যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্রের সঙ্গে তার পৃথকত্ব বজায় থাকে ততক্ষণ সে জলবিন্দুই থেকে যায়। তাই মানুষ যখন উপলব্ধি করে সে আর পরমপুরুষ এক, যখন সে বোঝে যে সে পরমপুরুষের কৃপাধন্য, তখন সে আর সাধারণ মানুষ থাকে না। সে তখন অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী হয়। তাই পরমপুরুষ থেকে নিজেকে দূর রাখলে তুমি ভাববে তুমি অতি সাধারণ আর তাঁর একেবারে কাছটিতে চলে এলে, তাঁর সঙ্গে মিলে এক হয়ে গেলে তুমি হয়ে যাও অসাধারণ। পরমপুরুষের সঙ্গে এই সংযোগ সংসাধিত হয় গুরুমন্ত্রের মাধ্যমে। এইটাকেই বলতে পারি জাগতিক স্তরের যোগ।
মানসিক স্তরে অণুমন হচ্ছে ভূমামনেরই প্রক্ষেপণ মাত্র। এই স্থূল জাগতিক অস্তিত্ব পরমসত্তার চিত্তধাতু সঞ্জাত। অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ-সমিতির কারণে যখন এইটি চূর্ণীভূত হয়ে যায় তখন তা মানব মনে পরিণত হয়।
শ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘আনন্দ-বচনামৃতম্’ থেকে