


প্রীতম দাশগুপ্ত: ‘বাবা, একদিন তুমি আমার জন্য গর্ব করবে’। ১৮ বছরের অক্ষত সিং যাদবের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে চোখের জলে ওই কথাগুলিই মনে করছিলেন মন্তা সিং যাদব। কাঁদতে কাঁদতে অক্ষতের মা বলছিলেন, ‘যাকে ৯ মাস গর্ভে ধারণ করেছি। বড়ো করেছি। আজ তাঁর দেহ দেখতে হচ্ছে।’ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে আত্মারাম সনাতন ধর্ম কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, ১৯ বছরের অর্পিতেরও। তাঁর বাবা যখন হাসপাতালে দেহটি চিহ্নিত করলেন, তখন কাকে দোষ দেবেন। নিজের ভাগ্যকে, না মেসের মালিককে, না প্রশাসনকে? চোখের জল মুছে শুধু বললেন, ‘রাখি উৎসব ছেড়ে আজ সকালেই তো ছেলেটা দিল্লি এল। দুপুরে এই ঘটনা। ওর চোখে অনেক স্বপ্ন ছিল’। কর্নিয়া দান করে বললেন, ‘ওর চোখ দিয়েই অন্য কেউ সেই স্বপ্ন দেখুক।’ অর্পিতের মায়ের কান্না থামছে না। বলছেন, ‘এই অক্টোবরেই তো ওর জন্মদিন’।
৬ সেপ্টেম্বর, রবিবার দুপুর দেড়টা। ভাইরাল ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে, একজন হকার বসে রয়েছেন। হঠাৎ তাঁর নজরে এল কিছু একটা ভেঙে পড়ছে। মুহূর্তে ধুলোয় ঢেকে গেল এলাকাটি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে বহুতল ‘হস্টেল ডেজ’। সত্য নিকেতন এলাকা। ৭৫ জন পিজি (পেয়িং গেস্ট)-এর থাকার ব্যবস্থা ছিল ওই বহুতলে। সেই ভবনটিই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। মৃতের সংখ্যা সাত। এর মধ্যে যেমন রয়েছেন পড়ুয়ারা। তেমনি নির্মাণ শ্রমিকরা। ঘটনায় মেসের মালিক শুভম ত্যাগী, বহুতলের মালিক হরিরাম, তাঁর স্ত্রী ঊর্মিলা, ছেলে মহেশ, লেবার কনট্রাক্টর সানোজ কুমার ও সুধাংশুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন আধিকারিককে সাসপেন্ডও করা হয়েছে। কেন ভেঙে পড়েছিল ওই বহুতল? প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও প্রাথমিক তদন্তে যেটুকু উঠে এসেছে, সেটা মোটামুটি এরকম। দুর্ঘটনাগ্রস্ত পাঁচতলা বাড়িটি ৪০-৫০ বছরের পুরানো। এত পুরানো একটি কাঠামোর সঠিক ভারবহন ক্ষমতা যাচাই করাই হয়নি। তার মধ্যে আবার আরও মুনাফার লোভে বেসমেন্টে কাজ চলছিল। এর জন্য কোনো অভিজ্ঞ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নেওয়া হয়নি। অথচ ভিত খোঁড়া হচ্ছিল। দিন কয়েক ধরে দিল্লিতে বৃষ্টি হয়েছিল। সেই জল বাড়িটির গাঁথনিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছিল। শ্রমিকরা সতর্ক করলেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যার নিট ফল, ভেঙে পড়ল বহুতলটি।
এই ঘটনা কতগুলি ভয়াবহ চিত্র সামনে এনে দিয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯১টি কলেজে এক লক্ষেরও বেশি স্নাতকস্তরের শিক্ষার্থী। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্টেলের সিট রয়েছে মেরেকেটে সাড়ে চার হাজার। এর মধ্যে বেশিটাই মেয়েদের জন্য। যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেক শিক্ষার্থী দিল্লির স্থানীয় বাসিন্দা বা সেখানেই কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে থাকেন। তাহলেও বাকি অর্ধেকের জন্য হস্টেলের চিত্রটি কী দাঁড়াবে? ১০-১২ জন পড়ুয়া পিছু একটি সিট। যাঁরা জায়গা পাবেন না, তাঁদের উপায় কী আছে? বিকল্প বলতে তো ওই একটাই। চড়া দামে পিজিতে আশ্রয় নেওয়া। মনে রাখবেন, এর বাইরেও দিল্লিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আসেন লক্ষ পড়ুয়া। সেই কারণে এখন দিল্লিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে পিজি। আর এগুলির ভাড়া ক্রমাগত বাড়ছে। নিউজ লন্ড্রির একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, যে ঘরগুলির ভাড়া দু’বছর আগেও ছিল ১২ হাজার টাকা। সেটাই হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। তাও এই রিপোর্ট বছর দুই আগেকার। মনে রাখতে হবে, হস্টেল ও পিজির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। হস্টেল তৈরি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর পিজি হল ব্যক্তিগত আবাসিক বাড়ি। ফলে পিজি মানেই মুনাফায় নজর।
এবার বাস্তব চিত্রটা দেখুন। এই ‘হস্টেল ডেজে’র কথাই ধরুন। ৭৫ জনের থাকার ব্যবস্থা ছিল সেখানে। কিন্তু ওই ভবন কি সত্যিই ৭৫ জনের ধারণ ক্ষমতার উপযুক্ত ছিল? মোটেও না। মুনাফার লোভে বাড়ির মালিকরা ঘরগুলিকে পার্টিশান দিয়ে খুপরি বানিয়ে সেখানে বাড়তি পড়ুয়া রেখে দেয়। পড়ুয়ারাও খরচ বাঁচাতে সেখানে ভাগাভাগি করে থাকতে বাধ্য হয়। অথচ সেই ভবনের ধারণ ক্ষমতাই তেমন নয়। তাই পিজির ঘর ছোটো বা থাকার অনুপযুক্ত। নিম্নমানের খাবার দেওয়ার মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ নেই। মূল প্রশ্নটা হল, এই ঘরগুলি কি আদৌ নিরাপদ?
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হস্টেল সংকট নতুন নয়। প্রতিবার ছাত্র সংসদ ভোটের সময় এটি একটি ইস্যু। দিন কয়েক পরেই এখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এবারও মূল ইস্যু এই হস্টেল। বছরের পর বছর হস্টেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়েছে। কাজ হয়নি। ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্ভয়া ফান্ড থেকে ৫০০ বেডের দু’টি হস্টেল তৈরিতে ২৭২ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছিল। সাম্প্রতিক একটি আরটিআই তথ্য বলছে, দু’বছর পরে একটি পয়সাও রিলিজ করা হয়নি। হায়ার এডুকেশন ফাইনান্সিং এজেন্সির মাধ্যমে হস্টেল নির্মাণের অনুমোদন পেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কাজ একচুলও হয়নি।
আমাদের দেশে পিজি পরিচালনার জন্য কোনো সুনির্দষ্ট কেন্দ্রীয় আইন নেই। পৌর আইন, দমকল বিধি, জমি ব্যবহারের নিয়ম এসবের সমন্বয় করা হয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন শহরের ক্ষেত্রে নিয়মগুলি পালটে যায়। এই দুর্ঘটনার পর এক এমসিডি (পুর) কর্তা জানিয়েছিলেন, ওই ভবনের বেসমেন্টে কোনো পরিবর্তন আইনত বৈধ নয়। সেটা করাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানিয়েছিলেন, ভবনটির পঞ্চম তলাটি শহরের ফ্লোর এরিয়া রেশিও বিধি লঙ্ঘন করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কবে জানা গেল? প্রাণহানি না হলে কি কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে না? আর এ ধরনের অবৈধ বিষয় যে শুধু ‘হস্টেল ডেজ’-এর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তাও নয়। খুঁজলে শত শত পিজির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুঁত বেরবে। এখানেই স্পষ্ট হচ্ছে নজরদারি অভাব ছিল। অনেকদিন আগেই এই অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধ করা যেতে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। প্রশ্ন হল, কেন হয়নি?
দিল্লিতে এমন ঘটনা নতুন নয়। মাস তিনেক আগের ঘটনা। দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একটি হোটেল সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গিয়েছিল। ঘটনায় ২৩ জনের মৃত্যু হয় এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হন। ওল্ড রাজিন্দর নগরের ঘটনা আমরা ভুলে যায়নি। অবৈধ বেসমেন্টে জল ঢুকে সলিল সমাধি হয়েছিল তিন ইউপিএসসি পড়ুয়ার। এই সত্য নিকেতন এলাকাতেও এর আগে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তথ্য বলছে, দিল্লিতে ২০২০-২৪ সালের মধ্যে প্রতি ১০ লক্ষে ৫.৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এই ধরনের দুর্ঘটনায়। আর একটি তথ্যে দেখা গিয়েছে, ২০২২-২৪ সালের মধ্যে স্রেফ দিল্লিতেই হাজারের বেশি ভবন ভেঙে পড়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসন সাময়িক সিলিং ড্রাইভ বা পরিদর্শন শুরু করে। কয়েকদিন খুব আলোড়ন হয়। তারপর যে কে সেই পরিস্থিতি। সেই গা-ছাড়া মনোভাব দেখা যায়। যখনই বড়ো ধরনের কোনো ঘটনা হয়, তখন সরকার দায়ভার ঠেলে দেয় পূর্বতন সরকারের দিকে। এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না।
এখন কেন্দ্রে কারা ক্ষমতায়? বিজেপি। দিল্লিতে? বিজেপি। সাংসদ কোন দলের? বিজেপি। বিধায়ক কোন দলের? বিজেপি। কাউন্সিলার ও মেয়র কাদের? সেই একই উত্তর, বিজেপি। তাহলে এটাকে ডবল ইঞ্জিন সরকার বলা যাবে না। বলতে হবে পঞ্চ ইঞ্জিন। আমরা তো শুনেছি, ডবল ইঞ্জিন মানেই উন্নয়ন। ডবল ইঞ্জিন মানেই সুশাসন। তাহলে পঞ্চ ইঞ্জিনে এত খারাপ হাল কেন? দিল্লিতে পূর্বতন আপ সরকারের সময় প্রশাসনিক ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে আইনি লড়াই পর্যন্ত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সরকারের পক্ষেই রায় দেয়। কিন্তু কেন্দ্র অর্ডিন্যান্স জারি করে কার্যত সেই রায়কে ঠুঁটো করে দেয়। কিন্তু এখন সেই সমস্যা নেই। সবটাই একদলীয়। তাই শুধু আগের সরকারকে দোষারোপ করে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। দোষীরা সাজা পাক, কিন্তু কাউকে যেন বলির পাঁঠা না করা হয়।
এই ঘটনার পর অভিযান শুরু করেছেন পুরসভার আধিকারিকরা। হাজারের বেশি হস্টেলে অভিযান চালানো হয়েছে। ৫০টিরও বেশি বেআইনি নির্মাণ ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। সাতটি ভবন সিল করে দেওয়া হয়েছে। ৩৬টি বাড়ির মালিককে শো-কজ নোটিস ধরানো হয়েছে। এছাড়া হস্টেলগুলির ভিতরে নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখছে পুরনিগম। সবটাই ঘটনার পর। দায়িত্ব বা রেসপনসিবিলিটি হল কোনও নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা। আর জবাবদিহি বা অ্যাকাউন্টিবিলিটি হল সেই কাজের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য দায়বদ্ধ থাকা। এই অ্যকাউন্টিবিলিটি সরকারের থাকতে হবে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই বা অভিযান চালালেই হয় না। স্পষ্ট করে জনগণকে জানাতে হবে কোথায় ব্যর্থতা। কেন সেফটি অডিট এতদিন হয়নি? এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, তার জন্য প্রশাসন কী পরিকল্পনা নিচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। কারণ ধ্বংসস্তূপ তৈরির আগে বিপদ চিহ্নিত করাটাই সরকারের আসল কাজ। ছোটো থেকেই তো শুনে আসছি, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’। এটা সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সরকার বলছে, ২০ বছরের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তুলব। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর অন্যতম ভিত্তি হলো, উচ্চমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এর মধ্যে কেবল আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকসমাজই অন্তর্ভুক্ত নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করাটাও সমানভাবে জরুরি। এটাই সময়ের দাবি।
নিজের বাড়ি ও পরিবার ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে দিল্লিতে পড়তে আসেন তরুণ-তরুণীরা। চোখে থাকে বড়ো স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি লোভ আর দুর্নীতির কংক্রিটের নিচে সমাধিস্থ হয়, তবে এর চেয়ে বড়ো সামাজিক ব্যর্থতা আর কিছু হতে পারে না।