


সোহম কর: কম্পিউটার সায়েন্স? না, এবার আবারও চর্চায় সেই পুরনো নামগুলো—সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, কেমিক্যাল! ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মূলধারার এই বিষয়গুলিকে এককথায় বলা হয় ‘কোর ইঞ্জিনিয়ারিং’। বহু দশক ধরে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের এই বিষয়গুলোই প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে।
হ্যাঁ, কম্পিউটার সায়েন্স এখন চরমে, কারণ এখানে রয়েছে AI, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং-এর মতো চমকপ্রদ দুনিয়া। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি—এই চাকরির বাজার এক সময় হয়ে যাবে স্যাচুরেটেড। আর তখনই বুমেরাং হয়ে ফিরবে কোর ইঞ্জিনিয়ারিং! ভবিষ্যতের ভারতে চাই বিল্ডিং, ব্রিজ, বিদ্যুৎ, মেশিন আর মেডিসিন। এসবের জন্য দরকার পড়ে ইঞ্জিনিয়ারদের—হাতেকলমে যাঁরা কাজ করেন।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং: ধনধান্য অডিটোরিয়াম হোক বা বিশ্ব বাংলা গেট—এ সবের নেপথ্যে কারা? সিভিল ইঞ্জিনিয়াররাই শহরের সিগনেচার বানাচ্ছেন! পরিকাঠামোগত উন্নয়নের রাশ তাঁদের হাতেই। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই বিষয়টি এমনই যার জুরি মেলা ভার। কারণ, বড় বড় বিল্ডিং, ব্রিজ সহ দেশের পরিকাঠামো উন্নয়ন তো আর বন্ধ হবে না। তাই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা কমবে না। আর ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে এঁদের চাহিদা একেবারেই কমার নয়। বরং দিন দিন বাড়তে থাকবে। এই শহর কলকাতার দিকেই যদি তাকানো যায়, তাহলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। ধনধান্য অডিটোরিয়ামটি বাইরে থেকে শঙ্খের মতো দেখতে। কিংবা বিশ্ব বাংলা গেট, যা ইতিমধ্যেই শহরের সিগনেচার হয়ে গিয়েছে। এটা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসছেন। কীভাবে চমত্কার দেখতে এইসব স্থাপত্য গড়ে উঠল? এইসব কিছুর পিছনে রয়েছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের মস্তিষ্ক। প্রধান ভূমিকা নিয়েছেন সিভিল বা তার শাখা বিষয় স্ট্রাকচারাল এবং কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পেশাদাররা। সারা দেশ জুড়েই বিভিন্ন পরিকাঠামোগত কর্মকাণ্ড চলছে। ভালো কাজ জানা ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা তাই থাকছেই। এই শাখার ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া দেশের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন অসম্ভব।
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং: ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র পেছনের চালিকাশক্তি। স্মার্ট মেশিন আসছে, কিন্তু তার ডেভেলপমেন্টের জন্য চাই মেকানিক্যাল ট্যালেন্ট। আর চাইলেই স্ট্রিম বদল করে এআই, ডেটা সায়েন্সেও ঢোকা যায়!
দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিল্প উত্পাদনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এখানেই দরকার হয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের। শহরের একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলছিলেন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য পড়ুয়াদের মধ্যে তুমুল চাহিদা লক্ষ করা যায়। এখন মেকানিক্যাল নিয়ে পড়লেও পরে চাকরির ক্ষেত্রে কিংবা গবেষণার ক্ষেত্রে যে কেউ চাইলেই স্ট্রিম পরিবর্তন করতে পারেন। কেউ যদি কম্পিউটার বা ডেটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করতে চান, সেদিকেও যেতে পারেন। কাজেই এই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা সবসময় তুঙ্গে থাকে। শুধু তাই নয়, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও যথেষ্ট চাকরির সুযোগ রয়েছে বলেই জানাচ্ছেন অধ্যাপকরা। চীনের মতো দেশ উৎপাদন শিল্পে এগিয়ে গিয়েছে এই ইঞ্জিনিয়ারদের হাত ধরেই। কেন্দ্রীয় সরকার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রজেক্ট ঘোষণা করেছে। এর ফলে দেশে পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলত আসবে অত্যাধুনিক টেকনিক, মেশিন হবে আরও স্মার্ট। মেশিন স্মার্ট হলে লোকবলের চাহিদা অনেকখানি কমবে বলেই আশঙ্কা করেন অনেকে। তবে, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা বাড়বে বই কমবে না।
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং: যা কিছু হয়ে যাক, ওষুধের চাহিদা কখনওই কমবে না। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে ওষুধের চাহিদা তো থাকবেই। আর সেই কারণে খোঁজ পড়বে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের। বর্তমানে ভারতের ওষুধ শিল্প ৬০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে। ভারতীয় অর্থমূল্যে তা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২০৩০ সালের মধ্যে তার দ্বিগুণেরও বেশি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ফলে বোঝাই যায়, এই ক্ষেত্রে কত ফার্মাসিউটিক্যাল এবং কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের প্রয়োজন পড়বে। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা এখানেই থেমে থাকেন না। তাঁদের চাহিদা রয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল, ব্যাটারি, খনি, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভৃতি উজ্জ্বল ক্ষেত্রগুলিতেও। ভারত পরিষেবা প্রদানকারী থেকে শীঘ্রই শিল্পোৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে চলেছে। এক্ষেত্রে যে ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা বাড়বে, তা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন: আজকের স্মার্টফোন যুগে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন ভাবাই যায় না। ভারতের লক্ষ্য— নিজেই তৈরি করবে চিপ, সার্কিট, স্মার্ট ডিভাইস। এই বিপ্লবে প্রথম সারিতে থাকবে ইসিই পড়ুয়ারা। এগুলো থাকলে আবার প্রয়োজন ওয়াইফাই-ইন্টারনেটের। অর্থাত্, ইলেকট্রনিক্স হল, তার সঙ্গে দরকার কমিউনিকেশন। এইসবকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিকল্প রোজগারের পথ। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, ইউটিউবারদের নজরকাড়া রোজগার ভারতকে অন্য আঙ্গিকে নিয়ে চলেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস দেখেই সময় কেটে যাচ্ছে মানুষের। অন্যান্য উন্নত দেশের মতোই ভারতেও এখন হাইস্পিড ইন্টারনেটের চাহিদা তুঙ্গে। এই বিপুল চাহিদার যোগান দেবে কারা? তখনই প্রয়োজন হবে ইলেকট্রনিক্স ও টেলি কমিউনিকেশন জানা পড়ুয়াদের। ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও ৭০ কোটির বেশি। প্রতিদিন সংখ্যাটা বাড়ছে। ভারত এতদিন ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, সেমিকন্ডাক্টর প্রভৃতির জন্য চীনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকত। ভবিষ্যতে ভারত নিজের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাও নিয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ কাঁচামাল (রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল) উত্তোলনের উপরও জোর দিচ্ছে ভারত সরকার। দেশে স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা অন্যান্য বৈদ্যুতিন পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে ভারত পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেলে এই ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা আরও বাড়বে। একটা সময় আসতে চলেছে যখন স্রেফ অ্যাসেম্বলিং নয়, প্রতিটি যন্ত্রাংশই ভারতে উৎপাদনের পরিবেশ তৈরি হবে। আরও চাহিদা বাড়বে এই ইঞ্জিনিয়ারদের।
ইলেকট্রিক্যাল এবং পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং: মেট্রো, বন্দে ভারত, ই-ভেহিকল—সবকিছুর চালিকা শক্তি বিদ্যুৎ। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রিনিউএবল এনার্জি বা ই-বাস যাই বলুন না কেন, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া এগোবে না দেশ। বিদ্যুত্ ছাড়া সভ্যতা চলবে কীভাবে? ঘর-গৃহস্থালি হোক কিংবা বড় মাপের শিল্প। কিংবা ধরে নেওয়া যাক হাইস্পিড মেট্রো রেল থেকে বন্দেভারত। সমস্ত কিছুতেই বিদ্যুতের চাহিদা অপরিহার্য। ফলে ইলেকট্রিক্যাল বা পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা কখনওই কমবে না। বরং দিনে দিনে তা বাড়বে। এখন পরিবেশের কথা মাথায় রেখে রাস্তায় নামছে জিরো এমিশন, একশো শতাংশ ইলেকট্রিক বাস, গাড়ি, বাইক। ফলে এই ক্ষেত্রেও পেশাদার প্রয়োজন হবে।
আইআইটি খড়্গপুর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, এনআইটি দুর্গাপুর বা আইআইইএসটি শিবপুর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম সারির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির পাশাপাশি বহু ভালো মানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও উপরিউক্ত বিষয়গুলি পড়া যায়। এছাড়াও প্রত্যক্ষভাবে রাজ্য সরকার পরিচালিত কলেজগুলিও রয়েছে। সেখানে যত্নসহকারে পড়ানো হয় কোর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়গুলি।
শেষ কথা। কম্পিউটার সায়েন্সে চাকরি মিলবে, কিন্তু ভবিষ্যতের দেশ গড়বে কোর ইঞ্জিনিয়াররাই। আর তাই আগামী দিনে এদের চাহিদা আরও বাড়বে। কারণ কোর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এড়িয়ে চলা অসম্ভব। তাই জোর দিয়ে বলা যায়, আগামী দিনে ঘটবে ‘রিভাইভাল অব দ্য কোর’।