


মানুষের ইতিহাস শুধুমাত্র বইয়ে লেখা থাকে না। তা লুকিয়ে রয়েছে মাটির তলায়। সেই লুুকিয়ে থাকা ইতিহাস আবিষ্কার করার বিজ্ঞানই হল আর্কিওলজি। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো ও সিন্ধু সভ্যতা, মিশরের পিরাপিড, মমি, মেক্সিকোর মায়া সভ্যতা—এইসব ইতিহাসে মোড়া বিস্ময় আজও টানে মানুষকে। সেই আগ্রহ থেকেই বহু ছাত্রছাত্রী ঝুঁকছে আর্কিওলজি নিয়ে পড়ার দিকে। পুরাতত্ত্ববিদরা খননের মাধ্যমে প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করেন। যা থেকে সেই সময়ের জীবনযাত্রা, শিক্ষা-সংস্কার সম্বন্ধে যেমন জানা যায়, তেমনই মানবসভ্যতার ধারাবাহিকতা ও তাঁর ক্রমোন্নতি সম্বন্ধেও স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়। হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন ঐতিহ্য, সভ্যতা ও নিদর্শন খুঁজে বের করার ইচ্ছে যদি আপনার থাকে তাহলে পুরাতত্ত্ববিদের পেশা আপনি বেছে নিতেই পারেন। ইতিহাসচর্চার পর তার আরও প্রয়োগ সম্বন্ধে জানা ও কাজ করার ইচ্ছে থাকলে আর্কিওলজি নিয়ে পড়াশোনা করা যায়। এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলে স্থানীয় স্তর থেকে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। সারা পৃথিবীতে নানা গবেষণাগারে কাজের সুযোগও মেলে। পুরনোকে আবিষ্কার ও তার বিশ্লেষণের কাজ যাঁরা করেন তাঁদের বলে পুরাতত্ত্ববিদ বা আর্কিওলজিস্ট। সভ্যতার না জানা অতীত নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করতে চান, তাঁদের কিন্তু ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ দরকার পড়লে দুর্গম জায়গায় গিয়ে বিপদের মুখোমুখি হয়ে কাজ করতে হয়। জীবনে ঝুঁকিও যে পুরাতত্ত্ববিদদের থাকে না তা নয়।
কী পড়বেন, কারা পড়বেন
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগে দু’বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কোর্স পড়ানো হয়। পড়ানো হয় আর্টস এবং সায়েন্স উভয় শাখায়। ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রতিবছর জুন, জুলাই মাসে। ইতিহাস, ভুগোল, সংস্কৃত, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূ-বিদ্যা বা জিওলজি এবং অ্যানথ্রোপলজির মধ্যে যেকোনও একটি বিষয় নিয়ে স্নাতক হয়ে থাকলে আবেদনের যোগ্য।
আর্কিওলজির স্নাতকোত্তর কোর্সে পড়ানো হয় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, ভারতীয় এপিগ্রাফি, প্যালিওগ্রাফি, ভারতীয় শিল্প, স্কাল্পচার আর্ট, পেন্টিং, আইকোনোগ্রাফির মতো বিবিধ বিষয়। এছাড়াও থাকে ফিল্ড ট্রেনিং। প্রার্থী বাছাই করা হয় স্নাতক-স্তরের যোগ্যতার নিরিখে। বিশদ জানতে https://www.caluniv.ac.in ওয়েবসাইট দেখুন।
কাজের সুযোগ
শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই কয়েক হাজার মিউজিয়াম আছে যেখানে চাকরির সুযোগ থাকে। দেশের বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও আর্কিওলজিস্টদের চাহিদা থাকে। ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিতেও এই সংক্রান্ত দক্ষ লোকদের নেওয়া হয়। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণার অগ্রণী সংস্থা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ ইত্যাদি নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরে পুরাতত্ত্ববিদ নিয়োগ করে। এছাড়া প্রশিক্ষিতদের সরকারি, বেসরকারি মিউজিয়ামে চাকরির সুযোগ থাকে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশে শিক্ষকতা ও গবেষণার সুযোগ তো আছেই।
কোনও অঞ্চলকে ‘সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে কি না সেই সিদ্ধান্ত হয় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের ভিত্তিতেই। হেরিটেজ সাইট হবে না ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে, নাকি শুধুমাত্র গবেষণার কাজ হবে এ সবকিছুই কিছু কিছু পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। কোনও নিদর্শন, স্কাল্পচার, প্রাচীন মুদ্রার খোঁজ পাওয়ার পর সঠিক পদ্ধতিতে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ভারতীয় জাদুঘরের মতো দেশি বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও নিয়মিত সার্ভের কাজ হয়। সেখানে শিক্ষানবিশ যেমন নেওয়া হয়, তেমনই অনেকরকম ট্রেনিং প্রোগ্রামেও কাজের সুযোগ মেলে। তবে মাথায় রাখতে হবে আর্কিওলজি নিয়ে কেরিয়ার তৈরি করতে হলে তৈরি থাকতে হবে ঝুঁকি নিতে। কারণ দুর্গম এলাকায় খনন কার্য চালাবার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে সুগঠিত হওয়া একান্ত প্রয়োজনীয়। বিশদ জানতে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার https://www.india.gov.in ওয়েবসাইট দেখুন।
নিজস্ব প্রতিনিধি ছবি: সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে