


দার্জিলিং বেড়াতে যাননি এরকম বাঙালি পাওয়া দুষ্কর। তবে দার্জিলিঙের কোলাহলকে বাদ রেখে একটু নির্জন-নিভৃতে শুধু প্রকৃতির বুকে কদিন কাটাতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত মংপুতে। দার্জিলিং থেকে এই স্থানের দূরত্ব মাত্র ৩৩ কিমি। পৌঁছতে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা সময় লাগে।
৩৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি গ্রামটি দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং উপরিভাগের রংলি-রংলিওট ব্লকের অন্তর্গত। দার্জিলিং থেকে পেশক রোড ধরে, তিন মাইল এবং তাকদা অতিক্রম করে সিঞ্চল বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা গিয়ে মিশেছে মংপুতে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এই যাত্রাপথ খুবই মনোমুগ্ধকর ও রোমাঞ্চকর।
সেবার আমরা মংপুর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম মে মাসের শেষের দিকে। মেঘ ও বৃষ্টির লুকোচুরিকে সামনে নিয়ে পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি চলেছে। কখনও অঝোর ধারায় বৃষ্টি তো কখনও আবার পাহাড়ের বুক চিরে মেঘের আনাগোনা। যেন এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। পাইন, ওক, মেপল, রডোডেনড্রনে ঠাসা এই পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তার প্রতিটা বাঁকে যেন রোমাঞ্চিত হতে হয়। আলোকচিত্রীরা বাধ্য হবেন রাস্তার ধারে কোথাও গাড়ি থামিয়ে এই অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দি করতে। জঙ্গলের কোথাও সূর্যের আলো প্রবেশ করছে তো কোথাও আবার খুব অন্ধকার। সমস্ত রাস্তা জুড়ে বিভিন্ন পাহাড়ি পাখিদের ডাক। দর্শন পেলাম ওয়ার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার, রেড বিলড লিওথ্রিক্স, রুফোস সিবিয়া এবং গ্রেট বার্বেট-এর মতো চেনা অচেনা পাখির। যদিও মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশে তাদের খুব একটা ভালো ছবি পেলাম না। এবং সেজন্য কিঞ্চিৎ হতাশও হলাম। এরপর আবার পথ চলতে ড্রাইভারের কাছে এই পথে যাতায়াতের অভিজ্ঞতার কথা শুনে চমৎকৃত ও রোমাঞ্চিত হলাম। শুনলাম মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি নাকি এই রাস্তায় সন্ধের দিকে হঠাৎই এক চিতাবাঘের দর্শন পেয়েছিলেন। ড্রাইভারের কথায় ও ভরসায় চিতাবাঘ দেখব বলে আশায় মনও বেঁধেছিলাম। তবে আমাদের সেই সৌভাগ্য হয়নি। চলতে চলতে ঘন ছায়াচ্ছন্ন পথ দিয়ে মেঘ কুয়াশার রাজ্য ছাড়িয়ে মংপুতে পৌঁছলাম।
জঙ্গলকে পিছনে ফেলে সিঙ্কোনা গাছের সারি দেখতে দেখতে অবশেষে এলাম আমাদের গন্তব্যস্থলে। এই স্থানের মূল আকর্ষণ হল ‘রবীন্দ্র ভবন’। জীবনসায়াহ্নে রবীন্দ্রনাথ এখানে বেশ কয়েকবার এসে থেকেছেন। মৈত্রেয়ী দেবী এবং তাঁর স্বামী মনমোহন সেনের এই বাংলোতে কবিগুরু বার চারেক পদার্পণ করেছিলেন। এখানকার শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ কবিগুরুর মতো প্রকৃতিপ্রেমিককে আকর্ষণ করবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘জন্মদিন’। বর্তমানে এই বাংলোটিকে একটি মিউজিয়ামের রূপ দিয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন।
২৫ টাকা প্রবেশমূল্য দিয়ে আমরা মিউজিয়ামটিতে প্রবেশ করলাম। ঢোকামাত্রই সেখানকার শান্ত- স্নিগ্ধ পরিবেশ এবং যত দূর চোখ যায় দিগন্তবিস্তৃত সবুজ পাহাড়ি উপত্যকায় মেঘের ঢেউ খেলে যাওয়া মনকে যেন এক মুহূর্তের জন্য কল্পনার জগতে নিয়ে চলে যায়। এটি রবিবার ছাড়া সপ্তাহের সব দিনই সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত খোলা থাকে। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতির বহু মূল্যবান জিনিস এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মংপুতে থাকাকালীন তাঁর লেখা কবিতা, গদ্য, তাঁর আঁকা ছবি, ব্যবহৃত কলম, আসবাবপত্র ইত্যাদি সবই সুন্দরভাবে রাখা রয়েছে এখানে। এমনকী, তাঁর ব্যবহৃত বিছানা ও মেহগনি কাঠের লেখার ডেস্কটিও খুব যত্নসহকারে সংরক্ষিত আছে।
রবীন্দ্র ভবনের চারপাশে মাধবীলতা, বিভিন্ন রকমের নাম না জানা অর্কিডের সঙ্গে রয়েছে সারি সারি সিঙ্কোনা গাছ। রবীন্দ্র ভবন থেকে বেরিয়ে উপরের দিকে একটু হাঁটলেই চোখে পড়বে গভর্নমেন্ট কুইনাইন ফ্যাক্টরি। আমরা অনেকেই জানি যে সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে ম্যালেরিয়ার ওষুধ কুইনাইন প্রস্তুত করা হয়। রাস্তার দু’ধারে অনেক জায়গাতেই সিঙ্কোনা গাছকে শুকিয়ে তার বাকল বা ছাল থেকে কুইনাইন এক্সট্রাকশনের নমুনা লক্ষ করা যায়। চারদিকে সিঙ্কোনা আবাদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দূরের পাহাড়ি উপত্যকার সৌন্দর্য ভোলার নয়। মংপুর মূল বাজারের সন্নিহিত স্থানে রয়েছে একটা বৌদ্ধ মঠ। নাম দিং ছেন সেরাপ ছলিং গুম্ফা। কিছুটা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয় এই মঠটি দর্শনের জন্য। মঠের ভিতর শান্ত পরিবেশ মনে এক স্নিগ্ধ প্রলেপ লাগিয়ে দিয়ে যায়। বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। মংপুর মেঘ কুয়াশার রাজ্য তখন আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
কোথায় থাকবেন: রবীন্দ্র ভবন গেস্ট হাউস মংপুতে দু’টি সুইট, দু’টি ফ্যামিলি রুম (ভাড়া ৩০০০/- প্রতি রাত্রি দু’জনের জন্য) এবং চারজনের জন্য একটি ডরমিটরি (ভাড়া ৫০০/ প্রতি রাত্রি সর্বাধিক পাঁচজনের জন্য) রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কুইনাইন হোম স্টে।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়িগামী যে কোনও ট্রেন ধরে এনজেপি। সেখান থেকে মংপু সরাসরি আসা যায়। দূরত্ব ৫৫ কিমি। সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা মতো।
শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব ৫১ কিমি। দার্জিলিং থেকেও একদিনের সাইট সিইং-এ মংপু আসতে পারেন। দূরত্ব ৩৩ কিমি। সময় লাগে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা। এছাড়াও কালিম্পং থেকে সরাসরি আসা যায়, দূরত্ব ৩৯ কিমি।
পূজা চক্রবর্তী ঘোষ
ছবি: পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন
দপ্তরের সৌজন্যে