


সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: বারাবনি ব্লক অফিসের কাছে গামছাগাদা আদিবাসী পাড়া। রাতে খেয়ে সন্তানদের নিয়ে শুয়েছিলেন সুখমণি মুর্মু। রাতে বিকট আওয়াজে চোখ খুলে দেখেন, বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে দৈত্যাকার বালির লরি। বরাতজোরে তাঁরা রক্ষা পান। রাতেই তাঁদের বাড়ি ছাড়তে হয়। প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছিলেন আদিবাসীরা। যদিও টাকা দিয়ে রাতেই মুখ বন্ধ করে বালি কারবারিবা। সেই টাকায় বাড়ি সংস্কারের কাজ চলছে।
ত্রিপলে ঢাকা বাড়ির বাইরে থেকে ডাক দিতেই শিশুকন্যা শুভদ্রাকে নিয়ে বের হলেন সুখমণি। তিনি বলেন, বাড়ি সংস্কারের টাকা ওরাই দিয়েছে। শুভদ্রার জন্য চিন্তা হয়। বাড়ি গেলে বাড়ি পাব। মেয়ের কিছু হলে!
এর বেশি বলার অধিকার তাঁর নেই। টাকা পেয়েছেন যে! ওই রাস্তার পাশেই ছোট বাড়ি ও দোকানঘর রয়েছে এক প্রৌঢ়ার। ভয়ে নাম বলতে চাননি। শুধু বলেন, সারারাত ধরে বিকট আওয়াজে ১২-১৮ চাকা লরি, ডাম্পার ছোটে। সব সময় মনে হয়, এই বুঝি বাড়ি ভেঙে ঢুকে পড়ল! রাতে ঘুমাতে পারি না।
কবিতীর্থ চুরুলিয়া। জামুড়িয়াকে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি দেওয়া বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভিটে। অথচ বিদ্রোহী কবির ভিটেতেও মানুষ প্রতিবাদের ভাষা হারিয়েছেন।
চুরুলিয়া মোড়ে রাস্তায় একটি বড় বাঁক রয়েছে। সেটি এলাকার মূল বাজার। এখানে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত। এই রাস্তা দিয়েই অজয় নদী থেকে বালিবোঝাই লরি, ডাম্পার বেপরোয়া গতিতে ছোটে। সেখানেই চা ও মিষ্টি বিক্রি করেন এক ব্যবসায়ী। দুপুরে ফাঁকা দোকানেও সেই আতঙ্কের কথা বলতে গিয়ে আগে চারপাশটা দেখে নেন। তারপর তিনি বলেন, বালি কারবারের নিয়ন্ত্রকরা প্রবল প্রভাবশালী। সব সময় আতঙ্কে থাকি, কখন দোকানে গাড়ি ঢুকে যাবে। দোকান গড়ার টাকা ওরা দেবে। কিন্তু, প্রাণে মরলে পরিবারের কী হবে?
জেলাজুড়েই বালির রাস্তার উপর থাকা বাড়ি বা দোকানের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। ঘরবাড়ি ভাঙে। রাতারাতি টাকা দিয়ে সবার মুখে কুলুপ এঁটে দেওয়া হয়। খবর বাইরে বের হতে দেয় না প্রভাবশালীরা। প্রতিবাদীদের জন্য এমআইএসের ব্যবস্থা আছে। মাসে মাসে টাকা দিয়ে প্রতিবাদীদেরই বালি কারবারের রক্ষাকর্তা বানিয়ে দেওয়া হয়। তাতে কাজ না হলে জোটে হুমকি।
কুলটির মানিকেশ্বর মন্দিরের বহু ইতিহাস রয়েছে। দামোদরের তীরে সেই এলাকায় এখন অবাধে চলছে বালি কারবার। এলাকার বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেছিলেন। তা জানতে পেরেই এক বালি মাফিয়া ফোনে খুন করার হুমকি দেয়। শুধু বাড়িঘর ভাঙা নয়, ভারী গাড়ি চলাচল করায় অজয় ও দামোদর সংযোগকারী রাস্তাগুলির কঙ্কালসার অবস্থা।
রানিগঞ্জ থানার তিরাট পঞ্চায়েতের হাড়াভাঙা এলাকা। বালি কারবারে রাস্তার সবচেয়ে জীর্ণ দশা এই এলাকারই। তিরাট, হাড়াভাঙা নিমচা হয়ে বালি যায় রানিসায়ের মোড়ে। বালি কারবারের জেরে রাস্তার অস্তিত্বই মুছে গিয়েছে। দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণও গিয়েছে। রাস্তার উপর থাকা হাড়াভাঙা সেতু যে কোনও দিন ভেঙে পড়তে পারে। আন্দোলন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শাসক তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপি নেতৃত্বও আন্দোলন করেছে। কিন্তু, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
কান পাতলেই শোনা যায়, এখানে আন্দোলনে নামলেই কিনে নেওয়া হয়। ‘মাথা’দের টাকা দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের কড়া শাসানি জোটে। একই অবস্থা জামুড়িয়ার চুরুলিয়ায়। মধুডাঙা চেকপোস্ট থেকে চুরুলিয়া পর্যন্ত রাস্তার অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার জোগাড়। তাতেও হুঁশ নেই প্রশাসনের। বারাবনি ব্লক প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, সংকীর্ণ রাস্তায় বালির গাড়ি চালানো যাবে না। কড়া পদক্ষেপ করা হবে। (চলবে)