


নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: ঈশিতা মল্লিক খুনের তদন্তে নেমে চক্ষু চড়কগাছ পুলিসের। প্রতিহিংসা, খুনের পরম্পরা, উত্তরপ্রদেশের অপরাধ জগৎ, বাহুবলী-গ্যাংস্টার, জাতপাতের সমীকরণ, ক্ষত্রিয় রাজপুতদের প্রভাব—কী নেই তাতে? কৃষ্ণনগর কাণ্ডে অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রেমিক দেশরাজ প্রতাপ সিংয়ের সন্ধানে যোগীরাজ্যে পৌঁছে বিড়ম্বনা বেড়েছে তদন্তকারীদের। কারণ তাঁরা দেখছেন, নিকট আত্মীয় কয়েকজন পুলিস, রাজনৈতিক নেতা, বাহুবলী এবং রাজপুত প্রভাব, এই সবরকম সমর্থন জুটিয়ে সেখানেই গা ঢাকা দিয়েছে রয়েছে দেশরাজ। বাহুবলী দুই ‘জিজাজি’ দঙ্গল ও মঙ্গল সিংয়ের ডেরা থেকে কীভাবে দেশরাজকে পাকড়াও করা যাবে, সেই ছকই এখন সাজাচ্ছে পুলিস। তবে একটা বিষয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তদন্তকারীরা। আর তা হল, ঈশিতা খুনের ঘটনা পরিকল্পিত। স্পষ্ট ষড়যন্ত্র। সিং পরিবারের লোকজনের তাতে যথেষ্ট ‘ভূমিকা’ রয়েছে। সেই ভূমিকা খতিয়ে দেখতেই দেশরাজের বাবা রাঘবেন্দ্র প্রতাপ সিংয়ের কর্মস্থল রাজস্থানের জয়সলমির যাচ্ছেন এ রাজ্যের তদন্তকারীরা।
আধিকারিকরা বলছেন, দেশরাজের উগ্র স্বভাব ও অপরাধ সংস্রবের কারণে বীতশ্রদ্ধ ঈশিতা গত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস নাগাদ ‘সম্পর্ক’ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি জানা মাত্রই শুরু হয় হুমকি দেওয়া। পাশাপাশি ভিডিও কলে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়েও ঈশিতাকে ভয় দেখায় দেশরাজ। এপ্রিল-মে মাস নাগাদ ফোন ও সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে দেশরাজকে ‘ব্লক’ করে দেন ঈশিতা। ওই সূত্রটি বলছে, এরপর ঈশিতাকে বাগে আনতে কৃষ্ণনগরের এক কলেজে ডিসট্যান্স লার্নিংয়ে ভর্তিও হয়ে যায় উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়ার বাসিন্দা দেশরাজ। তদন্তকারীরা জেনেছেন, কোনওভাবেই ঈশিতাকে বোঝানো যাচ্ছে না দেখে দেওরিয়ার পরিচিতদের সঙ্গে মিলে তাঁকে ‘খতম’ করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এই কাজে দেশরাজকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে সেখানকার এক বন্ধু তথা গ্যাংস্টার নীতিন প্রতাপ সিং। গত ১৯ আগস্ট কাঁচরাপাড়ায় দেশরাজদের ভাড়া বাড়ি ধরমপুর কলোনিতে এসেছিল নীতিন। পুলিস বলছে, ঈশিতা খুনে যে নাইন এমএম পিস্তলটি ব্যবহার করা হয়েছিল, উত্তরপ্রদেশ থেকে তা নিয়ে এসেছিল নীতিনই। যে টিকিটে ২৪ আগস্ট দেওরিয়া ফিরে যাওয়ার কথা ছিল দেশরাজের, সেই টিকিটে ফিরে যায় নীতিন। তদন্তকারীরা জেনেছেন, নীতিনের ভাই অনুরাগ প্রতাপ সিং মূক ও বধির। তার নামে তোলা সিম কার্ড মোবাইলে ভরে এনেছিল নীতিন। কারণ, টাওয়ার লোকেশন পেলেও একজন মূক ও বধিরকে পুলিস সন্দেহ করবে না। পুলিস বলছে, এই ষড়যন্ত্রে খতিয়ে দেখা হচ্ছে দেশরাজের মায়ের ভূমিকাও। কারণটা কী? তদন্তকারীদের দাবি, খুনের আগে নিজের পুরনো নম্বরের মোবাইলটিকে মায়ের হাত দিয়ে গত ১৩ আগস্ট উত্তরপ্রদেশে পাঠিয়ে দেয় দেশরাজ। লক্ষ্য, টাওয়ার লোকেশন দেওরিয়া দেখানো। নিজের দ্বিতীয় মোবাইলটি নিষ্ক্রিয় করে রেখে দেয় কাঁচরাপাড়ার বাড়িতে। খুনের পর তৃতীয় যে মোবাইল ব্যবহার করছিল, সেটি বরাকরের শৌচালয়ে রেখে দিয়ে যোগীরাজ্যে পালিয়ে যায় দেশরাজ। এই পর্বেই খুনের দু’-তিনদিন আগে ঈশিতার কয়েকজন বান্ধবী, নিজের কয়েকজন বন্ধু এবং স্বয়ং ঈশিতাকে কনফারেন্স কলে নিয়ে দেশরাজ জানিয়ে দেয়, সে বরাবরের মতো উত্তরপ্রদেশ ফিরে যাচ্ছে। নিখুঁত এই ষড়যন্ত্রের চিত্রনাট্য যে দেশরাজ প্রতাপ সিংয়েরই তৈরি, খুনের দিন কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা রতন ঘোষের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তার ছবি বন্দি না হলে জানাই যেত না।