


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইউনিয়ন রুম ছিল সূচনা। তারপর জেলায় জেলায় তৃণমূলের পার্টি অফিসে হানা দিয়ে লাগাতার মিলেছে বিছানা এবং কন্ডোম। সেই তালিকায় সংযোজন হল এবার কলকাতার ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস। ওয়ার্ড অফিসে ঝাঁ চকচকে খাট, আর তার পাশের ড্রয়ারে গর্ভ নিরোধক ট্যাবলেট ও কন্ডোম। সঙ্গে কয়েকটি কার্টন। তাতে থরে থরে সাজানো টাকা। যদিও এই ‘উদ্ধারকার্য’কে পিছনের সারিতে পাঠিয়ে দিয়েছে ওয়ার্ড অফিস থেকে মেলা একটি ‘রেট চার্ট’। কোন প্রোমোটার কত টাকা ‘মান্থলি’ দেবে, বাইপাস সংলগ্ন কোন হাসপাতাল মাসে মাসে কত টাকা ওয়ার্ড অফিসে পাঠাবে, আবাসনের রেটই বা কত... এই সব যত্ন করে লেখা সেই রেট চার্টে।
অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই অফিসে প্রথমে হানা দিয়েছিল এলাকাবাসী। তাদের ক্ষোভের আঁচ বাড়তে না বাড়তেই সেখানে হাজির হয় পুলিশ। ততক্ষণে অবশ্য একদফা ‘তল্লাশি’ চালিয়ে ফেলেছে বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা। বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এই অফিস খোলেনি। কাউন্সিলারকেও সেই অর্থে দেখা যায়নি। কয়েকবার সংবাদমাধ্যমের সামনে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তারপর থেকে ‘অজ্ঞাতবাসে’ই ছিলেন ২০১৬ সালে প্রথম কাউন্সিলার হওয়া অনন্যা। ইতিউতি ক্ষোভ ছিলই। এদিন তারই বিস্ফোরণ ঘটে। এলাকাবাসীই ওয়ার্ড অফিসের তালা ভাঙে। তাতেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। ডাঁই করে রাখা নথি, কাগজপত্র। জমি-বাড়ির দলিল থেকে পুর-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাকরির সুপারিশ—কী নেই সেখানে! আরও হাতড়াতে বেরিয়ে আসে রেট চার্ট। এলাকায় পরিচিত ও বড়ো প্রোমোটারদের রেট নির্ধারিত। মাসিক হিসাব লেখা আছে খাতায়। বাকি ‘স্থানীয় প্রোমোটার’দের থেকে নির্মাণ প্রতি ১০ লক্ষ টাকা করে তোলা হত বলে অভিযোগ। বাইপাস সংলগ্ন একাধিক বেসরকারি হাসপাতালের নামও রয়েছে সেই খাতায়। ‘রেট-চার্ট’ অনুযায়ী প্রতি মাসে তাদের নামের পাশে লেখা টাকার অঙ্ক। গাড়ি পার্কিংয়েরও ‘বাঁধা রেট’। প্রতি সপ্তাহে ৪ হাজার টাকা।
তোলাবাজির পাশাপাশি পুরসভায় চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও সুপারিশ পাঠানো হত বলে অভিযোগ। তেমনই নথি হাতে এসেছে পুলিশের। সাদা কাগজে একাধিক স্থানীয় যুবকের নাম পুরসভার বিভিন্ন কাজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাজের জন্য সুপারিশের নথি মিলেছে। উদ্ধার হয়েছে প্রচুর জমির দলিল। বাড়ির দলিল কেন ওয়ার্ড অফিসে? সেই প্রশ্ন উঠছে। অন্যান্য ওয়ার্ড অফিসের মতোই এখান থেকে বিপুল পরিমাণে ত্রাণ সামগ্রী পাওয়া গিয়েছে। ত্রিপল, জামাকাপড়ের কার্টন পেয়েছেন এলাকাবাসীরা। এ প্রসঙ্গে কাউন্সিলার অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘ওয়ার্ড অফিস থেকে পুরসভার কাজ হত। তাই সেখানে ত্রাণ সামগ্রী থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। পুরসভার কাজ সংক্রান্ত নথি থাকাও অস্বাভাবিক নয়।’ কিন্তু, সেই ওয়ার্ড অফিসেই বিছানার পাশে গর্ভনিরোধক পিল ও কন্ডোম কেন? সেই উত্তর অবশ্য তিনি দেননি।