


আতঙ্কের গ্রাস! খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহে ‘ভেজাল’ ধরতে রাজ্যজুড়ে যে অভিযান চলছে তাতে পরিষ্কার, উদরপূর্তির জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যেসব খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন সাধারণ মানুষ, তার পরতে পরতে অনেকক্ষেত্রেই রয়েছে ‘বিষ’! থালায় পরিপাটি করে সাজানো খাবারকে সুস্বাদু ও মনোহর করে তুলতে কোনো পণ্যে মেশানো হচ্ছে রং, কোনোটায় বা রাসায়নিক। শুধু রাস্তা বা ফুটপাতের ফুড স্টল নয়, ভেজালের লম্বা হাত পৌঁছে গিয়েছে শহর ও শহরতলির বেশ কিছু বড়ো রেস্তরাঁ ও হোটেলের রান্নাঘরেও। পাঁচতারা মল থেকে হোটেল, ট্যাংরার বিখ্যাত চায়না টাউনের কোনো রেস্তরাঁ থেকে অভিজাত এলাকা পার্ক স্ট্রিট, জিভে জল আনা বিরিয়ানি থেকে মাংসের হরেক পদে দেদার মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রাণঘাতী বিষ! একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে দিচ্ছে অবলীলায়! কে না জানে, বাঙালি খাদ্যরসিক। খাওয়াদাওয়ার বিষয়টি ভোজনপ্রিয় বাঙালি সংস্কৃতি ও যাপনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই সুযোগটাই নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। তবে এক্ষেত্রে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়ের মতো পরিস্থিতি। এই ভেজাল ধরার অভিযানে গত কয়েকদিনে পচা ও বাসি মাছ-মাংস, রান্নার উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত বিভিন্ন রং ও রাসায়নিক মেশানো মশলা, সস উদ্ধার করে বাজেয়াপ্ত করেছেন সরকারি আধিকারিকরা। খাবার সংরক্ষণ ও রান্নাঘরের চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বৈধ অনুমতি ছাড়া হোটেল চলা নিয়েও অভিযোগ প্রায় সর্বত্র। রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসনের যৌথ অভিযানে কিছু হোটেল, রেস্তরাঁর লাইসেন্স-রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও গ্রেপ্তার হয়েছে, কোথাও মালিকদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। নমুনা সমীক্ষার মতো সামান্য কিছু খাবারের দোকানে এই অভিযান চালানো হলেও এর ফলাফল দেখে একটাই কথা বলা যায়, এই ভেজাল সমৃদ্ধ খাবারের কাছে ভোজনবিলাসী বাঙালির অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া হয়তো আর কোনো গতি নেই। তবু বলতেই হয়, সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজনে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে।
রাজ্যের নতুন সরকার ভেজাল ও কালোবাজারি রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকরা মূলত তৈরি খাবারের আঁতুরঘরে ভেজাল খুঁজতে অভিযান শুরু করেছেন বটে, কিন্তু ঘটনা হল, শাক-সবজি, আলু-পটলের মতো প্রায় সব ধরনের ফসল, চিনি-হলুদ-গুঁড়ো লঙ্কার মতো পণ্য সামগ্রী, দুগ্ধজাত দ্রব্যের মতো প্রায় কোনো খাদ্যবস্তুই যেন আর ভেজালমুক্ত নয়! কখনো ভেজাল ধরা পড়ে বেবি ফুডে। জীবনদায়ী ওষুধেও ভেজাল! একটা সময় শোনা যেত দুধে জল মেশানোর কথা। এখন ভেজালহীন খাদ্যবস্তু খোঁজা আর আকাশের তারা গোনা যেন সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু এসব আটকাতে চেষ্টা তো করতেই হবে। দরকার ভেজাল বিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ ও নিয়মিত বাজার মনিটরিং। অতীতেও দেখা গিয়েছে, এই ভেজাল ধরতে বছর বছর সরকারি উদ্যোগে অভিযান হয়েছে। জমানা বদলেছে কিন্তু ‘ভেজাল’ আটকানো যায়নি। আর সাধারণ মানুষও এখন যেন ভেজালে রপ্ত হয়ে উঠেছে। তবু ভেজাল বিরোধী অভিযান চলছে শুনলে আশায় বাঁচা মানুষ নড়েচড়ে বসে। ভেজালকারীরা কয়েকদিন সতর্ক থাকে। তারপর একদিন অভিযান শেষ হয়। ফের ভেজালের রমরমা শুরু হয়। ভুক্তভোগীরা আশাহত হন। তাই স্বল্পমেয়াদি এইসব ভেজাল-বিরোধী অভিযান বছরভর চালাতে না পারার কারণ হিসাবে সরকারি তরফেও উঠে আসে নানা সাফাই। ধারাবাহিক অভিযান চালানোর মতো লোকবলের অভাব, অপ্রতুল পরিকাঠামো, খাদ্যের গুণমান পরীক্ষার মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পরীক্ষা কেন্দ্রের অভাব ইত্যাদি। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে তো অনেক প্রতিবন্ধকতাই কাটানো সম্ভব। খাদ্যের সঙ্গে মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে গা-ছাড়া সেই ট্র্যাডিশন ভেঙে ভেজাল আটকাতে সেই সদিচ্ছাটা দেখাক পরিবর্তনের সরকার।
ভেজাল খাদ্যের বিপদটা কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তা একবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক সরকার ও সাধারণ নাগরিককে। বাম জমানা। বেহালার বুড়োশিবতলা এলাকার একটি দোকান থেকে কেনা ভেজাল সর্ষের তেল খেয়ে কয়েকশো মানুষ মারাত্মক অসুস্থ ও পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন। তদন্তে জানা যায়, সর্ষের তেলের সঙ্গে বিষাক্ত রাসায়নিক টিওসিপি মেশানোর ফলেই এই বিপর্যয় ঘটে। এটি মূলত ইঞ্জিন অয়েলের উপাদান, যা মিশে ছিল ভোজ্য তেলে। এই তেল খেয়ে বহু মানুষের পেরিফেরাল নার্ভ ও মেরুদণ্ডের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অনেকে সারাজীবনের মতো হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশ তখন দোকানের মালিক ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও ভেজাল তেলের ক্ষত কিন্তু থেকেই গিয়েছে। এটা একটা নজির মাত্র। তৃণমূল জমানা ভাগাড়ের মাংস ব্যবহারের ঘটনাও ছিল বহু চর্চিত বিষয়। ভেজাল বিষের ছোবলে প্রতিদিন কত মানুষের জীবনে কালো ছায়া নেমে আসছে—তার হিসাব নেই। এই ক্ষতি আটকাতেই হবে। ভেজাল প্রতিরোধ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়ে বিষাক্ত খাদ্য ধ্বংসে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে সরকারকে। না হলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিছকই কথার কথা হয়ে থাকবে। সুস্থ জীবনের প্রয়োজনে ভেজালমুক্ত খাদ্যের বিকল্প নেই।